BREAKING NEWS

৯ আশ্বিন  ১৪২৭  রবিবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ 

Advertisement

হারিয়ে যাওয়া পাসপোর্ট আর খুঁজে পাওয়া পতাকা

Published by: Sangbad Pratidin Digital |    Posted: August 12, 2016 1:24 pm|    Updated: August 12, 2016 1:24 pm

An Images

কাশীনাথ ভট্টাচার্য: যাঁদের স্থায়ী ঠিকানা নেই, ভিটেমাটিছাড়া, যাঁদের গায়ে অভিধান লেবেল সেঁটেছিল শরণার্থী বলে, তাঁদের এখন দেশ আছে, সব দেশে৷ তাঁরা ওলিম্পিক রাষ্ট্রের নাগরিক৷ পঞ্চবলয়ের পতাকাই তাঁদের পরিচয়৷ ‘টিম অফ রিফিউজি ওলিম্পিক অ্যাথলিটস’-এ গোটা বিশ্বের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন ওঁরা৷  

শব্দের গায়েই কি লেগে থাকে তাচ্ছিল্য, কুণ্ঠা?

কিছু কিছু শব্দ থাকে এমন৷ যেমন ‘রিফিউজি’৷ যাদের কোনও বাসস্থান নেই, ভিটেমাটিছাড়া৷ যে আশ্রিত৷ আশ্রয় দিতে হয়েছে, মানে, তার আশ্রয় ছিল না৷ সুতরাং, তাচ্ছিল্যের পাত্র৷ যে আশ্রয় দিয়েছে, তুলনায় বড়৷ যে পেয়েছে, ছোট৷ তাকে থাকতে হবে কুঁকড়ে৷ দাতা আর গ্রহীতা৷ দ্বিতীয়জন সর্বদা যেন মনে রাখে উপকারীর উপকার৷ কোন পরিস্থিতিতে, কীভাবে তাকে ছেড়ে আসতে হয়েছে ঘর-পরিজন, উপন্যাস হতে পারে৷ তা পড়ে কারও কারও চোখে জলের ধারা৷ কিন্তু রিফিউজির চোখের জল মোছে না৷ অপাংক্তেয় সে৷ তাকে আদর করে ডেকে নেয়নি কেউ৷ শব্দটাই মনে করিয়ে দেয় সব৷ বড় কুণ্ঠা জড়ানো এ-শব্দের সর্বাঙ্গে৷

মানুষ ব্যস্ত যু‌দ্ধে৷ জীবনযাপনের যু‌দ্ধে নয়৷ এ-যুদ্ধ অহমিকার৷ আমার দেশ, আমার ধর্ম, আমার মতবাদ৷ আমার, তাই শ্রেষ্ঠ৷ অন্যের হলে কিছুতেই নয়৷ সেই যুরে আগুনে পুড়ে যায় সব৷ ঘর, আত্মীয়স্বজন, দেশ৷ পড়ে থাকে ছাই৷ আর ছাইমাখা কিছু মানুষ৷ কোনওরকমে বেঁচে গিয়েছে যাঁরা৷ বেঁচে আসলে গিয়েছে মরে!

এই মুহূর্তে বিশ্বে এমন মানুষের সংখ্যা সাড়ে ছ’কোটি, সরকারি খাতায়৷ বেসরকারি হিসাব রাখবে কে? তা-ও আবার অদরকারিদের! উদ্বাস্তু তাঁরা, শরণার্থী কোনও না কোনও দেশের৷ কারণ গৌণ, শরণ মুখ্য৷ শরমে মরে-মরে বেঁচে থাকতে হবে তাই৷

ওলিম্পিক মানে মিলনমেলা৷ খেলার বিশ্বে উজ্জ্বলতম আসর৷ সব দেশের সেরারা সুযোগ পান৷ তাঁরা বরেণ্য, স্মরণীয়৷ নিজেদের দক্ষতাকে আরও উঁচুতে তুলে ধরতে হাজির ওলিম্পিকে৷ যোগ্যতা অর্জন করতে হয়৷ চাইলেই টিকিট মেলে না৷ তবু থাকে রাজনীতি৷ যোগ্যকে যোগ্যতর হয়ে উঠতে অযাচিত সাহায্যের হাত বাড়ায় অনৈতিক বিজ্ঞান৷ দেশ-কাল-সমাজ, ভারী ভারী ব্যাপার৷ আনন্দের মিলনমেলার পরতে পরতে কত কিছু৷ ওলিম্পিক আদর্শ যা কোনও বর্ণ-জাতি-গোষ্ঠী মানে না, নুয়ে পড়ে সময়-সময়, রাজনৈতিক চাপে৷ তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা৷ শেষে অবশ্যই উত্থান শুভশক্তির৷ পঞ্চবলয়ের পতাকাতলে ঝলমলে দক্ষতার জয়গান৷ সেই ওলিম্পিকই আবার দেখাল নতুন পথ৷ আন্তর্জাতিক খেলায় যা বেনজির৷ দেশে-দেশে ওই অপাংক্তেয় শরণার্থীদের তুলে আনল আলোয়৷ তাঁরা এখানে যাচিত৷ আদর করে ডেকে-আনা৷ পঞ্চবলয়ের পতাকা তাঁদের পরিচয়৷ তাঁদের এখন দেশ আছে, সব দেশে৷ তাঁদের এখন পরিচয় আছে, ওলিম্পিক রাষ্ট্রের নাগরিক৷ পাসপোর্টের রং দেখছেন না কেউ৷ কী পরিস্থিতি তাঁদের বাধ্য করেছিল ভিটেমাটি ছাড়তে, আদৌ গুরুত্বপূর্ণ নয়৷ অনন্যোপায় অতীত ভুলে শুধুই সামনে তাকানো৷ নিজেদের তুলে ধরা সেই আসরে যেখানে হাজির হতে হাপিত্যেশ বিশ্বের তাবড় তারকার৷ তাঁরা এখন বাসিন্দা ওলিম্পিক ভিলেজের৷ বিশ্বের সবচেয়ে গৌরবময় বাসস্থান বললেও অত্যুক্তি হয় না৷

বিশ্বব্যাপী নিদারুণ এই উদ্বাস্তু সমস্যা সম্পর্কে বিশ্বকে সচেতন করে দেওয়ার এই ওলিম্পিক-প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য৷ ওলিম্পিক কমিটি ভেবেছিল, শুধুই আরও একটা ওলিম্পিক আয়োজনের দায়িত্ব পালন করলেই দায়িত্ব ফুরোয় না৷ যে-সংকট পৃথিবীকে ভাবাচ্ছে, খেলার আসর কেনই বা দূরে থাকবে তার থেকে? রাষ্ট্রপুঞ্জকে জানিয়েছিল সে-কথা৷ ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশনার ফর রিফিউজিস (ইউএনএইচসিআর) আগ্রহী হয়৷ খোঁজ শুরু হয় বিশ্বের বড়-বড় শরণার্থী শিবিরগুলোতে৷ জানাই ছিল, শরণার্থীদের ৫০ শতাংশেরই বয়স আঠারো বা তার আশপাশে৷ তাঁরা যে-দেশের, সেই দেশের ওলিম্পিকে যোগ্যতামান নিয়ে মাথা ঘামায়নি আন্তর্জাতিক ওলিম্পিক কমিটি৷ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শিবিরগুলিতে যাঁরা সেরা, তাঁদের বেছে নেওয়ার কথা ভাবে৷ প্রাথমিকভাবে তাতে নির্বাচিত হয়েছিলেন ৪৩ জন৷ পরে সেই ৪৩ থেকে চূড়ান্ত ১০ জন জায়গা পান ‘টিম অফ রিফিউজি ওলিম্পিক অ্যাথলিটস’-এ৷

সেই দশজনের মধ্যে পুরুষ ছ’জন, মহিলা চারজন৷ কেনিয়ার কাকুমা আর দাদাব-এ প্রায় পাঁচ লক্ষের বেশি উদ্বাস্তুর আশ্রয়৷ শুধু দাদাবেই সাড়ে তিন লক্ষের কাছাকাছি৷ কেনিয়া মানে ওলিম্পিকের আসরে লং ও মিডল-ডিসট্যান্স দৌড়৷ আর কেনিয়া থেকেই এই ওলিম্পিকে রিফিউজি দলের সদস্য পাঁচজন৷ দুই মেয়ে অ্যাঞ্জেলিনা লোহালিথ (দেশ দক্ষিণ সুদান, ১৫০০ মিটার) ও রোজ লোকোনইয়েন (দেশ দক্ষিণ সুদান, ৮০০ মিটার)৷ তিন পুরুষ প্রতিযোগীঃপাওলো লোকোরো (দেশ দক্ষিণ সুদান, ১৫০০ মিটার), জেমস চিয়েঙ্গজিয়েক (দেশ দক্ষিণ সুদান, ৪০০ মিটার), ইয়েচ বিয়েল (দেশ দক্ষিণ সুদান, ৮০০ মিটার)৷

বাকি পাঁচ সদস্যের মধ্যে জুডোকা দু’জনই কঙ্গোর, আশ্রয় পেয়েছেন ব্রাজিলে৷ পুরুষ পোপোল মিসেঙ্গা, মেয়ে বুকাসা মাবিকে৷ ম্যারাথনার ইয়োনাস কিন্ডের দেশ ছিল ইথিওপিয়া, এখন শরণার্থী লুক্সেমবুর্গে৷ আর দুই সাঁতারু৷ সিরিয়ার ছেলে ব়্যামি অ্যানিস ছিলেন সিরিয়ায়, এখন বেলজিয়ামে৷ ইউস্রা মার্দিনি সিরিয়া থেকেই আশ্রয় নিয়েছেন জার্মানিতে৷

প্রত্যেকের গল্প আলাদা, পরিণতি এক৷ মার্দিনি যেমন সিরিয়া থেকে লেবানন ও তুরস্কের ভিতর দিয়ে পৌঁছেছিলেন ইজিয়ন সাগরের ধারে৷ ওখান থেকে নিয়মিত নৌকো ছাড়ে বেআইনিভাবে, সাগরতীরের কোনও দেশের জন্য৷ মার্দিনির সঙ্গী ছিল বোন সারা৷ বাড়ির আর কেউ বেঁচে নেই৷ সর্বনাশা আগুনে সব ছারখার৷ যেখানে থাকতেন, সারাক্ষণ গুলি চলছে, উড়ে এসে পড়ছে বোমা৷ মানুষ পালিয়েছে যে যেদিকে পারে৷ বোনের হাত ধরে বেরিয়ে পড়েছিলেন মার্দিনি৷ সেই নৌকোয় সাগরপাড়ি শুরু, ইউরোপের যে কোনও ভূখণ্ডের উদ্দেশে৷ নৌকোয় ভিড় অন্তত ১৮টি দেশের একই সমস্যায় থাকা অনেকের৷

কিন্তু ‘অভাগা যে দিকে চায়, সাগর শুকায়ে যায়’৷ তীর দেখা যাচ্ছে দূরে, খারাপ হয়ে গেল নৌকোর মোটর৷ প্রাণভয়ে ঝাঁপ দিতে চেয়েছিলেন কেউ কেউ৷ মার্দিনি ও আর এক মহিলা ঝাঁপিয়ে পড়েন সাগরের জলে৷ সাঁতরে নৌকো টেনে নিয়ে যান তীরে৷ তিনঘণ্টার অমানুষিক পরিশ্রম৷ যেখানে পৌঁছন শেষপর্যন্ত, গ্রিসের লেসবস দ্বীপ৷ তারপর যে যার মতো ছড়িয়ে পড়েন ইউরোপের নানা দেশে৷ মার্দিনি চলে এসেছিলেন বার্লিনে৷ জার্মানিতে এসে মাথা গোঁজার ঠাঁই জোগাড় করে মন দিয়েছিলেন সাঁতারে৷ আর ওলিম্পিকের দলে জায়গা পেয়ে জানিয়েছিলেন, ‘একজন সাঁতারুর পক্ষে জলে ডুবে মরে যাওয়াটা লজ্জাজনক হত, তাই না!’

চেনেন না, জানেন না কাউকেই৷ আলাপ তো ওই নৌকোয় ওঠার সময়৷ কিন্তু নৌকো সাগর থেকে তীরে সাঁতরে-সাঁতরে টেনে নিয়ে যাওয়ার কাজটা করেছিলেন স্বেচছায়৷ জানতেন শুধু, সবাই এক সমস্যার নৌকোয় সওয়ার৷ জীবনের ঝুঁকি যাঁদের প্রতিপদে, এমন পরিস্থিতিতেও সহযাত্রীদের ভুলে নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর কথা ভাবেন না৷

আপনার ২১ সোনার প্রতিটিই দামি, মাইকেল ফেল্পস৷ কিন্তু, মার্দিনির এমন প্রচেষ্টা অমূল্য৷ বোধহয় বেশি কাছাকাছি ওলিম্পিক-স্পিরিটের৷ মার্দিনি আদৌ পদক পেলেন কি না, কী আসে যায়!

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement