Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ৩২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ১৬ জুন ২০২৬
Sheikh Mujibur Rahman

বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন: ইতিহাস, স্মৃতি-ধ্বংস ও সমকালীন বাংলাদেশের অস্তিত্বসংকট

যতবার বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, ততবারই বঙ্গবন্ধু আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জানুয়ারি ১০, ২০২৬, ১৫:০৩

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জানুয়ারি ১০, ২০২৬, ১৫:০৩

options
link
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন: ইতিহাস, স্মৃতি-ধ্বংস ও সমকালীন বাংলাদেশের অস্তিত্বসংকট zoom

এফ এম শাহীন: বাংলা জাতির ইতিহাসে কিছু দিন আছে, যেগুলো ক্যালেন্ডারের পাতায় আটকে থাকে না। সে দিনগুলো জাতির আত্মপরিচয়ের সঙ্গে মিশে যায়। ১০ জানুয়ারি তেমনই এক দিন। এই দিনটি কেবল একজন মানুষের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন নয়; এটি একটি জাতির আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার দিন। পাকিস্তানের কারাগারের অন্ধকার ভেদ করে স্বাধীন বাংলাদেশের আলোয় ফিরে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জিত হলেও, রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক ও নৈতিক অর্থে সেই বিজয় পূর্ণতা পায় ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতার প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে।

বঙ্গবন্ধু নিজেই তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করেছিলেন—“অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা।” এই সংক্ষিপ্ত বাক্যে যেন ধরা পড়ে একাত্তরের দীর্ঘ রক্তাক্ত ইতিহাস। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে ‘স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ’-এর ঘোষণা উচ্চারিত হওয়ার পরপরই পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। বাঙালি যখন অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তখন জাতির অবিসংবাদিত নেতা পাকিস্তানের কারাগারে প্রহসনের বিচারে ফাঁসির আসামি হিসেবে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। ইতিহাসে এমন দৃশ্য বিরল। নেতা বন্দি, অথচ জাতি অদম্য।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি বঙ্গবন্ধু জানতেন না তিনি বেঁচে ফিরবেন কিনা। কিন্তু তিনি জানতেন—বাঙালি হার মানবে না। এ যেন নজরুলের ভাষায়, ‘আমি চির বিদ্রোহী বীর।’একজন মানুষকে বন্দি করা গেলেও একটি জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে বন্দি করা যায় না। একাত্তরের চূড়ান্ত বিজয়ের পর বিশ্বজনমত দ্রুত বাঙালির পক্ষে দাঁড়ায়। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চাপ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত পরাজিত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়।

মুক্তির পর বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ-এর সঙ্গে বৈঠক করেন। এটি ছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক পথচলার এক গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। লন্ডন থেকে বিশেষ বিমানে তিনি দিল্লি পৌঁছান। ১০ জানুয়ারি সকালে দিল্লি বিমানবন্দরে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ এবং তিন বাহিনীর প্রধানরা তাঁকে গার্ড অব অনারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানান। এটি কেবল একজন নেতার সম্মান নয়,এ ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালির আত্মত্যাগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

১০ জানুয়ারি দুপুরে বিশেষ বিমানে বঙ্গবন্ধু ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে তেজগাঁও বিমানবন্দরে তাঁর অবতরণের সঙ্গে সঙ্গে পুরো দেশ যেন আবেগে বিস্ফোরিত হয়। সেদিন গ্রাম-শহর, নদী-খাল পেরিয়ে লাখ লাখ মানুষ ছুটে এসেছিলেন তাঁদের নেতাকে এক নজর দেখার জন্য। বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান(বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পর্যন্ত মানুষের ঢল ছিল ইতিহাসের এক অনন্য দৃশ্য।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রায় দশ লক্ষ মানুষের সমাবেশে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেছিলেন, “যে মাটিকে আমি এত ভালোবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালোবাসি, আমি জানতাম না সে বাংলায় আমি ফিরে আসতে পারবো কিনা। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি—বাংলার ভাইদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।” এই ভাষণ কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; এটি ছিল স্বাধীন রাষ্ট্রের দর্শন—যেখানে জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত মালিক।

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ‘প্রত্যাবর্তন’ শব্দটি একটি গভীর অর্থবহ। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় প্রত্যাবর্তন মানে নতুন আলোর সন্ধান, জীবনানন্দের কবিতায় ফিরে আসা মানে ইতিহাসের সঙ্গে আত্মার পুনর্মিলন। বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনও তেমনি—একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ঘরে ফেরা। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, বাঙালি যে ভালোবাসা দিয়েছে, তাঁর জন্য তিনি রক্ত দিতেও প্রস্তুত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইতিহাসের নিষ্ঠুর পরিহাস, সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি ও দেশি-বিদেশি চক্রের ষড়যন্ত্রে তাঁকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।

কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে—মানুষকে হত্যা করা যায়, আদর্শকে নয়। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন—একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বেঁচে থাকে। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় সেই স্বপ্নের ধারক হিসেবে সামনে আসেন তাঁর কন্যা, জননেত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ খাদ্যঘাটতির দেশ থেকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিপ্লব ঘটে, যোগাযোগ অবকাঠামোতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান—এই পাঁচটি সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের পথে দেশ দৃঢ়ভাবে এগোয়। উন্নয়নশীল রাষ্ট্র থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের স্বপ্ন বাস্তবের কাছাকাছি চলে আসে।

ঠিক এই অগ্রযাত্রার মুহূর্তেই পুরোনো শকুনেরা আবার সক্রিয় হয়। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে পরিকল্পিত অস্থিরতা, সহিংসতা ও ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টার মধ্য দিয়ে দেশকে পেছনে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পরবর্তী সময়ে যে দৃশ্য বাংলাদেশ দেখেছে, তা কেবল রাজনৈতিক নয়—তা সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক আগ্রাসন। জাতির পিতার স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থাপনা ধানমন্ডি ৩২ ভাঙচুর, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্মারক ধ্বংস, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির প্রকাশ্য আস্ফালন—সব মিলিয়ে এটি ছিল বাঙালির ইতিহাস ও চেতনার ওপর সরাসরি আঘাত।

জঙ্গি-জেহাদি ধর্মান্ধতার উত্থান, পরিকল্পিত ইতিহাস বিকৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ মুছে ফেলার চেষ্টা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্র কেবল ভূখণ্ড নয়, রাষ্ট্র হলো স্মৃতি, চেতনা ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা। সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন, “মানুষ চিন্তায় বড়।” আর সেই চিন্তা গড়ে ওঠে ইতিহাসের আলোয়। ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা মানে জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া।

গত ১৭ মাসে যতবার বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালির ইতিহাসকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, ততবারই বঙ্গবন্ধু আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। কারণ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ কেমন হবে—সে ফয়সালা একাত্তরেই হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে”—এই একলা চলার সাহসের নামই বঙ্গবন্ধু।

আজ যখন কালো মেঘে জাতির ভাগ্যাকাশ সাময়িকভাবে ঢাকা পড়ে, তখনও ইতিহাস আমাদের আশ্বাস দেয়—অন্ধকার চিরস্থায়ী নয়। সূর্য উঠবেই। বাংলার আকাশের গৌরবের একমাত্র সূর্যের নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর প্রত্যাবর্তন যেমন একদিন বিজয়কে পূর্ণতা দিয়েছিল, তেমনি তাঁর আদর্শে প্রত্যাবর্তনই পারে আজকের সংকট থেকে বাংলাদেশকে আবার আলোর পথে ফিরিয়ে নিতে।

(লেখক পেশায় সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা)

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.