Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Gender Discrimination

মেয়ে-জন্ম এক সামাজিক নির্মাণ! যে ভাষায় কথা বলি সেখানেও লুকিয়ে লিঙ্গবৈষম্যের শিকড়

নিত্যদিনের ব্যবহারের কিছু অতি পরিচিত শব্দই বুঝিয়ে দেয় যে-ভাষায় কথা বলি, তার পরতে পরতে কীভাবে লুকিয়ে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য।

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬, ১৬:৩৮

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬, ১৬:৩৮

options
link
মেয়ে-জন্ম এক সামাজিক নির্মাণ! যে ভাষায় কথা বলি সেখানেও লুকিয়ে লিঙ্গবৈষম্যের শিকড় zoom
প্রতীকী ছবি।
Advertisement

মেয়ে হয়ে কেউ জন্মায় না। মেয়ে-জন্ম এক ধরনের সামাজিক নির্মাণ। কিন্তু এর জোয়াল তো ঠেলতে হয় মেয়েদেরই- আমৃত্যু। প্রচলিত পারসেপশনের বিরুদ্ধে, সেট করে দেওয়া নিয়ম ও বিধির বিরুদ্ধে মেয়েদের কণ্ঠছেঁড়া প্রতিবাদ চলতেই থাকে। কিছুর নিষ্পত্তি হয়। অনেক কিছুরই হয় না। লিখছেন শুচিস্মিতা দাস।

সকালে খবরের কাগজ বা ডিজিটাল মাধ্যমে চোখ বোলানো থেকে শুরু করে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠা, কিংবা সমাজমাধ্যমের দেওয়ালে মতামত উগরে দেওয়া– সবকিছুতে রয়েছে ‘ভাষা’-র ব্যবহার। আমরা ভাবতেই পারি, ভাষা তো কেবল মনের ভাবপ্রকাশের একটি নির্দোষ মাধ্যম। কিন্তু তাই কি– শুধুই?

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

আমাদের প্রতিনিয়তের শব্দভাণ্ডারের অন্দরে যদি তাকাই, দেখতে পাব– এক অন্য দৃশ্য। ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ’ (‘Die Sprache’) প্রবন্ধে মার্টিন হাইডেগার আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণ উলটে দিয়ে দেখিয়েছিলেন যে, ‘ভাষা’ মানুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নিষ্ক্রিয় হাতিয়ার নয়; বরং এটি একটি স্বয়ংশাসিত বা স্বতন্ত্র প্রক্রিয়া, যা মানুষের মাধ্যমেই কথা বলে। ভাষার জন্ম অভিব্যক্তি প্রকাশের মাধ্যম রূপে, যা বাস্তবতাকে উন্মোচন করে, আমাদের অস্তিত্ব ও অর্থের কাঠামোকে দৃশ্যমান করে তোলে। তবে সব ক্ষেত্রেই যে মানুষ ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করে তা নয়, বরং বেশ কিছু ক্ষেত্রে ভাষাই নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে। 

নজর দেওয়া যাক নিত্যদিনের ব্যবহারের কিছু অতি পরিচিত কিছু শব্দের দিকে। ধরা যাক, ‘রমণী’ শব্দটি। আমরা হরহামেশাই অত্যন্ত ভদ্র ও মার্জিত অর্থে কোনও নারীকে বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করি। ব্যাকরণ অনুযায়ী, ‘রমণী’ শব্দের আসল অর্থ– ‘রমণে (যৌন মিলনে) সঙ্গ দেন যিনি’। নারীর অর্থ শুধুমাত্রই ‘রমণী’ হলে একজন মানুষের সামগ্রিক সত্তা, মেধা বা ব্যক্তিত্বকে লহমায় খাটো করে তার পরিচয়কে বেঁধে দেওয়া হয়– পুরুষের কামনার অনুষঙ্গ রূপে।

একইভাবে, সমাজ যখন একজন মহিলা যৌনকর্মীকে চিহ্নিত করতে ‘পতিতা’ শব্দটি ব্যবহার করে, তখন অবলীলায় ব্রাত্য থেকে যায় পুরুষের ভূমিকা। ‘পতিতা’ শব্দটির অর্থ ‘যে নারী পতিত হয়েছে’। কিন্তু প্রশ্ন হল, তাকে পতিত করল কে? এই শব্দ দীর্ঘ দিন ধরে স্বাভাবিক লাগার কারণ হল, আমরা যে-সমাজে বসবাস করি, সেখানে আমরা নারীর ‘পতন’টুকুই দেখতে অভ্যস্ত। আশ্চর্যের বিষয়, যে-পুরুষগণ এই পতনের মূল কারিগর, তাদের চিহ্নিত করার জন্য বাংলা ভাষায় পুংলিঙ্গবাচক অসম্মানজনক প্রতিশব্দ তৈরি হয়নি। এরকমভাবে যদি আমাদের আশপাশের নানা শব্দকে ধরে বিশ্লেষণ শুরু করি, অচিরে বুঝতে পারব, আমরা যে-ভাষায় কথা বলি, তার পরতে পরতে কীভাবে লুকিয়ে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য আর লিঙ্গবৈষম্যের পরাক্রমী শিকড়।

নারীর অর্থ শুধুমাত্রই ‘রমণী’ হলে একজন মানুষের সামগ্রিক সত্তা, মেধা বা ব্যক্তিত্বকে লহমায় খাটো করে তার পরিচয়কে বেঁধে দেওয়া হয়– পুরুষের কামনার অনুষঙ্গ রূপে।

এই যে ভাষাগত অবদমন, এর প্রতিফলন কিন্তু আমাদের বাংলা সাহিত্যেও অহরহ দেখা গিয়েছে। উনিশ শতকের বিশিষ্ট লেখক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ‘পালামৌ’ (‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় ১৮৮০ সালে প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল, ছদ্মনামে) ভ্রমণকাহিনির একটি উদাহরণ মনে করা যেতে পারে। পালামৌ জঙ্গলের কথা বলতে গিয়ে লেখক যখন বর্ণনা করলেন ‘কোল স্ত্রীলোকের’ কথায়, লিখলেন– ‘সকলেই আবলুসের মতো কালো, সকলেই যুবতী, সকলেরই কটিদেশে একখানি করিয়া ক্ষুদ্র কাপড় জড়ানো; সকলেরই কক্ষ, বক্ষ আবরণশূন্য। সেই নিরাবৃত বক্ষে পুঁতির সাতনরী, তাহাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আরশি ঝুলিতেছে, কর্ণে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বনফুল, মাথায় বড় বড় বনফুল।’ আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি নির্দিষ্ট জনজাতির নারীর বর্ণনা মনে হলেও, আসলে কোথাও যেন ঔপনিবেশিক এবং পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের ভাষা, যেখানে প্রান্তিক নারীদের ‘যৌন বস্তু’ রূপে দেখার অবচেতন প্রবণতা লুকিয়ে রয়েছে। বাংলা সাহিত্য বা কবিতায় এই ‘স্ত্রী জাতি’-র বর্ণনায় আবেগঘন ও স্বপ্নালোকে বিচরণকারিণীদের দেখা যায়। আড়ালে থেকে যায় তাদের রক্তমাংসের গল্প।

আসলে, ভাষা, মুহূর্তেই বদলে ফেলতে পারে সংবেদনকে। যে কোনও জাতি-শ্রেণি বা ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে যে-ভাষা আমরা ব্যবহার করি, তাতে নির্ধারিত হয় তার সামাজিক মূল্য। এই ভাষার নিরিখেই বাংলা সাহিত্যকে বিচার করতে বসলে উঠে আসবে সেই সময়ের নানা সামাজিক অভ্যাস ও সমীকরণ। হালেও এই ভাষাগত লিঙ্গবৈষম্যের বিতর্ক থিতিয়ে যায়নি, বরং তা নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক রূপ ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ ধরা যাক। এ যুগের সফলতম অভিনেত্রীদের অনেকেই এখন নিজেদের ‘অভিনেত্রী’ না বলে ‘অভিনেতা’ বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কেন? কারণ আমাদের অবচেতনে কোথাও একটা ধারণা গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে, ‘অভিনেতা’ শব্দটিই পেশাগতভাবে অধিক মর্যাদাপূর্ণ ও গুরুগম্ভীর; যেন শব্দের শেষে ‘ইকা’ বা ‘ঈ’ প্রত্যয় যোগ করলেই তার সামাজিক গুরুত্ব খানিক হালকা হয়ে যায়।

ভাষা, মুহূর্তেই বদলে ফেলতে পারে সংবেদনকে। যে কোনও জাতি-শ্রেণি বা ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে যে-ভাষা আমরা ব্যবহার করি, তাতে নির্ধারিত হয় তার সামাজিক মূল্য। এই ভাষার নিরিখেই বাংলা সাহিত্যকে বিচার করতে বসলে উঠে আসবে সেই সময়ের নানা সামাজিক অভ্যাস ও সমীকরণ।

এই সেদিনের কথা, কলকাতারই একটি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক রিপোর্টে যখন ‘ছাত্রছাত্রী’ শব্দের ক্রম নিয়ে বিতর্ক তৈরি হল– কেন শুধু ‘ছাত্রছাত্রী’ বলা হবে, ‘ছাত্রীছাত্র’ কেন নয়– সে নিয়ে সমাজমাধ্যমেও কম ঝড় ওঠেনি। অনেকেই হয়তো হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন, ভেবেছেন এ কেবলই শব্দের চুলচেরা বিশ্লেষণ। কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে বোঝা যাবে, লড়াইটা আর শুধু ব্যাকরণের নিয়মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, এটি আসলে ভাষার পরিসরে নিজেদের অধিকার ও দৃশ্যমানতা বুঝে নেওয়ার লড়াই।

যদি আমরা আলোচনার পরিধিকে আরও কিছু বাড়িয়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও প্রাচীন দর্শনের দিকে তাকাই, তবে দেখব এই বৈষম্যের ইতিহাস কত প্রাচীন হতে পারে। আদিম সমাজ থেকেই মানুষ যখন প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানকে বুঝতে চেয়েছে, তখন ‘শক্তি’ বা ‘ফেটিস’-এর (fetish) ধারণার ওপর ভিত্তি করে প্রাকৃতিক উপাদানের একপ্রকার স্ত্রী ও পুংলিঙ্গগত বিভাজন করা হয়েছে। সেখানেও কিন্তু ক্ষমতার রাশটি রয়ে গিয়েছে পুরুষের হাতেই। উপনিষদে আলাদা করে নারীর স্বতন্ত্র অস্তিত্বের উদ্‌যাপন বা উল্লেখ তেমন নেই। সৃষ্টিতত্ত্ব আবর্তিত হয়েছে মূলত ‘পুরুষ’ এবং ‘প্রকৃতি’– এই দ্বৈত সত্তাকে কেন্দ্র করে, যেখানে দার্শনিক তত্ত্ব অনুযায়ী ‘প্রকৃতি’ হল জড়, নিষ্ক্রিয় বা ভোগ্যা এবং ‘পুরুষ’ হল পরম চৈতন্য ও সক্রিয় চালিকাশক্তি।

একটি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক রিপোর্টে যখন ‘ছাত্রছাত্রী’ শব্দের ক্রম নিয়ে বিতর্ক তৈরি হল– কেন শুধু ‘ছাত্রছাত্রী’ বলা হবে, ‘ছাত্রীছাত্র’ কেন নয়– সে নিয়ে সমাজমাধ্যমেও কম ঝড় ওঠেনি। অনেকেই হয়তো হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন, ভেবেছেন এ কেবলই শব্দের চুলচেরা বিশ্লেষণ।

জার্মান দার্শনিক হান্‌স জর্জ গাদামার (Hans-Georg Gadamer) লিখেছিলেন, ‘Language is always I-less’ অর্থাৎ ‘ভাষা সমষ্টিগত’। ভাষা সক্রিয় হয় পারস্পরিক ভাব-বিনিময়তায়। যৌথ সমাজস্বীকৃত চেতনাই ভাষার বিবর্তন ঘটায়, আবার ভাষাও আপন আয়নায় সেই পুরনো অভ্যাসকে ধারণ করে পরবর্তী প্রজন্মের মনে তা বঁাচিয়ে রাখে। তীব্র ক্রোধ প্রকাশে বা কুরুচিকর মজায় অবলীলায় টেনে আনা হয় স্ত্রীলিঙ্গের অহেতুক ও আকছার ব্যবহার। তথাকথিত ভদ্রবিত্তের ভাষা বদলে যায় সমাজমাধ্যমের মন্তব্যের সারিতে। বিশেষ করে, কোনও স্ত্রীলিঙ্গের মানুষের সঙ্গে তর্ক বা মতান্তর ঘটলে হঠাৎ আক্রমণ করা হয় তার লিঙ্গগত পরিচয়কে। এই একই জিনিস দেখা যায় ‘ক্যুইয়ার’ পরিচয়ের মানুষের ক্ষেত্রেও। আবার কোনও পুরুষকে ‘কাপুরুষ’ বা ‘দুর্বল’ প্রমাণ করতে হলে ‘চুড়ি পরা’-র মতো লিঙ্গভিত্তিক উপমা ব্যবহার করা এখনও সামাজিক দস্তুর। সাম্প্রতিক সময়ের দৈনন্দিন রসিকতা, ট্রোল সংস্কৃতি, বা চলিত ভাষার গালিগালাজের প্রয়োগেও এমন দস্তুর অহরহ দেখা যায়।

নিত্য যে-ভাষায় কথা বলি, স্লোগান তুলি, বা সম্বোধন করি প্রিয় মানুষকে– সেই ভাষায় লিঙ্গসাম্যের পরিসর নিয়ে ভাবতে বসলে একটু অবাকই লাগবে। যে-ভাষাকে আমরা ‘সাধারণ’ ভেবে নিই তা কি আদৌ সাধারণ? ভাষা সামাজিক। যে কোনও সামাজিক ক্ষেত্রেই লিঙ্গসাম্যের কথা ভাবতে গেলে আমাদের যেমন পুনর্বিন্যাসের কথা ভাবতে হয়, হয়তো তা সত্যিই হবে ভাষার ক্ষেত্রেও। আমাদের গান-কবিতা, ধর্মীয় আচরণ, সাহিত্য ও সিনেমা, শিল্প-সংস্কৃতি বা কর্মক্ষেত্র– সব জায়গাতেই সূক্ষ্মভাবে জড়িয়ে রয়েছে লিঙ্গবৈষম্যের আকর্ষ। এবং আমরা জানি, যে কোনও বৈষম্যই দীর্ঘ দিনের অভ্যাসে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। তখন স্বাভাবিক লাগে ‘রমণী’ বা নারীর বীরত্ববাচক সিনেমার নাম ‘মর্দানি’-কে। বাংলা ভাষার অভিধানে স্বভাবত ঢুকে পড়ে উত্তর ভারতীয় স্ত্রী-যৌনাঙ্গ বিশেষিত গালাগাল। বৈষম্য ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে অবশ্যই আমরা সোচ্চার হই– দেশে বা রাজ্যে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে।

কিন্তু এসবের গভীরে রয়েছে যৌথ সামাজিক কাঠামোয় পিতৃতন্ত্রের ক্ষমতাবিন্যাসের খেলাকে ‘স্বাভাবিক’ বলে ধরে নেওয়ার অভ্যাস। ভাষাকেও প্রসব করেছে কাঠামো। রোজের তুচ্ছ, অযাচিত অভ্যাস বদলানোর মাধ্যমে এর পরিবর্তন একটু একটু করে শুরু করতে হবে। 

(মতামত নিজস্ব)

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.