BREAKING NEWS

২  ভাদ্র  ১৪২৯  বৃহস্পতিবার ১৮ আগস্ট ২০২২ 

READ IN APP

Advertisement

Advertisement

‘রক্ষক-ই ভক্ষক’ প্রবাদে সুপ্রিম নিয়ন্ত্রণ

Published by: Monishankar Choudhury |    Posted: May 31, 2022 2:31 pm|    Updated: May 31, 2022 2:31 pm

The SC recommendation on flesh trade and the grey scale of interpretation | Sangbad Pratidin

যেসব সুপারিশ সুপ্রিম কোর্ট অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে, সেগুলি বাস্তবায়িত হলে যারা মনে করে, বারবনিতা-সহ যে কোনও মানুষের আইনের চোখে সমান অধিকার রয়েছে, তারা লড়াইটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আরও জোর পাবে। কিন্তু এ-ও বলার: যারা স্ব-ইচ্ছায় এই বৃত্তি নেবে, দেশের আইন তাদের রুখতে পারে না। আজ নয়, সেই ১৯৫৬ সাল থেকেই। লিখছেন শাশ্বতী ঘোষ

কটি খবর ঘিরে তৈরি হওয়া কিছু রোমাঞ্চকর শিরোনাম দিয়েই না হয় শুরু করা যাক।
“সুপ্রিম কোর্ট যৌনকর্মকে ‘পেশা’-র স্বীকৃতি দিল”। ‘সুপ্রিম কোর্ট: বারবনিতা বৃত্তি একটি বৃত্তি, প্রত্যেকের পূর্ণ আইনি সুরক্ষা রয়েছে’। ‘সুপ্রিম কোর্ট বারবনিতাবৃত্তিকে বৃত্তির স্বীকৃতি দিল’। ‘যৌনকর্ম আইনি, বলল সুপ্রিম কোর্ট, পুলিশ হস্তক্ষেপ বা অপরাধ হিসাবে ধরবে না’। এইরকমই তো ছিল যৌনপেশার মর্যাদা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশের পর অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম!

প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, যে-পেশা এ-দেশে স্বীকৃত, সে-পেশাকে কী করে নতুন রূপে স্বীকৃতি দেবে দেশের সর্বোচ্চ আদালত? তাই ভ্রান্ত শিরোনামেই পরিবেশিত হল বারবনিতাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি- তাদের প্রতি ‘মর্যাদাপূর্ণ আচরণ’-এর নির্দেশটি। বলা বাহুল্য, ভুল শিরোনামে তৈরি হয়েছে অনেক অযথা বিতর্ক। যারা ‘পেশার স্বীকৃতি’-র (যদিও এই কথাটার অর্থ ওই কারণেই খুব স্পষ্ট নয়) দাবিতে লড়ছে, তারা ভাবল, দাবি তো আদায় হয়েই গেল। আর, যারা নানা কারণে বারবনিতা-বৃত্তির বিপক্ষে, তারা হইহই করে উঠল যেন সুপ্রিম কোর্ট আইনি করেছে বলেই মেয়েরা এই বৃত্তি গ্রহণের জন্য পা বাড়িয়ে বসে আছে!

[আরও পড়ুন: জ্বালানি জ্বালায় নাজেহাল আমজনতা, ধনীদের কর বাড়াচ্ছে না কেন সরকার?]

সর্বভারতীয় বহু সংবাদপত্র, সংবাদ পোর্টাল এইভাবে অপব্যাখ্যা-সমৃদ্ধ ‘খবর’ পরিবেশন করেছে। হয়তো বা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের এই অংশটির অর্থ উদ্ধার করতে গিয়েই এই ধরনের বিভ্রম- “এটা বলার প্রয়োজন পড়ে না যে, এ-দেশের প্রতিটি ব্যক্তিই পেশানির্বিশেষে ভারতীয় সংবিধানের ২১ ধারায় সম্মানজনক জীবনের অধিকারী। এই দেশের সমস্ত ব্যক্তিকে যে সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়া রয়েছে- সেগুলির কথা- ‘ইমমর‌্যাল ট্রাফিক প্রিভেনশন’ (অনৈতিক পাচার প্রতিরোধ) আইনে যাদের কোনও না কোনও দায়িত্ব দেওয়া রয়েছে, সেসব কর্তৃপক্ষকেও মনে রাখতে হবে।” মনে রাখতে বলছি, এই অনৈতিক পাচার (প্রতিরোধ) আইন বারবনিতাদের কাজকর্মের আইনি সীমানা সম্পর্কে বিধিনিষেধগুলি আরোপ করে।

অর্থাৎ বারবনিতা-বৃত্তি বা অর্থের বিনিময়ে যৌন পরিষেবা প্রদান আইনসম্মত। কিন্তু প্রকাশ্য স্থানে বারবনিতাদের নিযুক্ত করা, বারবনিতালয়ের আশপাশে ঘুরে বেড়ানো, বারবনিতালয় পরিচালনা, হোটেলে বারবনিতাবৃত্তি চালানো, বারবনিতা বৃত্তিতে কোনও শিশুকে ব্যবহার করা, বারবনিতাদের দালালি করা- এগুলি আইনত অপরাধ। বারবার প্রশ্ন উঠেছে- যদি কোনও প্রাপ্তবয়স্কা স্ব-ইচ্ছায় এই বৃত্তি গ্রহণ করে, তাহলে তো আইন তাকে সেই অধিকার দিয়েই রেখেছে। কিন্তু এই ধারাগুলি পুলিশ এবং অন্যান্য আইনরক্ষকের অত্যাচার, হুমকি, ঘুষ খাওয়া, যৌন পরিষেবা নেওয়ার পথ প্রশস্ত করে রেখেছে। তাই এই বৃত্তিতে নিযুক্ত মানুষের মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের জন্যই তাদের সাংবিধানিক রক্ষাকবচ প্রয়োজন।

সেই উদ্দেশ্যে, এই আইনটির সংশোধন-পরিমার্জনের জন্য, সুপ্রিম কোর্ট নিয়োজিত কমিটিই অনেকগুলি সুপারিশ করেছিল ২০১৬ সালে। সুপারিশগুলির সবক’টির সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার একমত হতে পারেনি। ফলে, আইন সংশোধন ঝুলেই রয়েছে। যার পরিণতিতে, সুপ্রিম কোর্ট এই নির্দেশিকা দিয়েছে। যে-ক’টি সুপারিশে কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বিমত নেই, সেগুলিকে নিয়ে সমস্ত রাজ্য সরকার আর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেবে।

সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত প্যানেল বা কমিটির সভাপতি ছিলেন একজন আইনজীবী, অন্যান্য সদস্য হল যথাক্রমে ‘দুর্বার’, ‘উষা কো-অপারেটিভ’ ও ‘রোশনি’ বলে তিনটি সংগঠন, যারা বারবনিতাদের অধিকার নিয়ে কাজ করছে। এরকম সংগঠনের তিনজন প্রতিনিধি ও আরেকজন আইনজীবী, যিনি আদালতবান্ধব হিসাবে সমন্বয় রাখবেন। এরা সম্মিলিতভাবে যে-দশটি সুপারিশ করেছে, সেগুলির ছ’টি কেন্দ্রীয় সরকার গ্রহণ করেছে, চারটি করেনি। কিন্তু একটি সর্বভারতীয় পত্রিকা, যারা অন্যান্য বহু সংবাদের উৎস হিসাবে উদ্ধৃত হয়েছে, তারা দশটি সুপারিশকেই ‘গৃহীত’ হয়েছে বলে সংবাদে লিখেছে। বাস্তব হল- কোন যুক্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার ওই চারটি সুপারিশের বিরোধিতা করেছে, সুপ্রিম কোর্ট সেটিই জানাতে বলেছে আগামী ২৭ জুলাই তারিখে। এমনিতেই আদালতের ভাষা সাধারণ মানুষের কাছে বহু সময়ই দুর্বোধ্য মনে হয়। তার উপরে এরকম বিতর্কিত বিষয়ে যদি ভুল সংবাদ পরিবেশিত হয়, তাহলে সমূহ বিপদ!

স্মরণে রাখতে হবে, এটা কিন্তু ‘ফেক নিউজ’-এর গল্প নয়। সংবাদ, এবং তৎসংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের অপব্যাখ্যা। যারা সংবাদপত্র-সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত ও সম্মাননীয় সংবাদমাধ্যমকে উৎস করে এই বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের কথা ভাববে, তাদের পুনর্বিবেচনার অবকাশ রইল। যেমন, ওই কমিটির একটি সুপারিশে বলা হয়েছে- বারবনিতালয়ে যদি কোনও বারবনিতার সঙ্গে কোনও নাবালক বা নাবালিকাকে পাওয়া যায়, তাহলে পুলিশ সেই নাবালক বা নাবালিকাকে শিশু-পাচারের শিকার হওয়া অভিযোগে বিদ্ধ করে তার মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন করে হোমে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। ওই নাবালক বা নাবালিকাকে ‘পুত্র’ বা ‘কন্যা’ বলে দাবি করলে ওই বারবনিতাকে প্রয়োজনে পরীক্ষা দিতেও হবে।

এই সুপারিশ কেন্দ্রীয় সরকার মানেনি। কিন্তু কোনও অপারগ মা যদি তাঁর সন্তানকে নিজের সঙ্গে বারবনিতালয়ে রেখে দেন, এবং ওই বারবনিতালয়ে পুলিশি তল্লাশি হলে যদি সন্তানটিকে নিয়ে গিয়ে হোমে ভরে দেওয়া হয়, তাহলে কী হবে? ওই অপারগ মা-র মনের উপরে কি এর দরুন তীব্র প্রতিক্রিয়া ও যন্ত্রণা তৈরি হবে না?

যে-সুপারিশগুলোকে সুপ্রিম কোর্ট অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে, সেগুলি বাস্তবায়িত হলে যারা মনে করে, বারবনিতা-সহ যে কোনও মানুষের আইনের চোখে সমান অধিকার রয়েছে, তারা তাদের লড়াইটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আরও জোর পাবে। কিন্তু যেসব নীতিবাগীশ ‘এই রে, সুপ্রিম কোর্ট এইবার বৃত্তিটাকে আইনি করে দিল’ বলে কপাল চাপড়াতে শুরু করেছে, তাদের বলা দরকার: যে-মেয়ে স্ব-ইচ্ছায় এই বৃত্তি নেবে, দেশের কোনও আইন তাকে রুখতে পারে না। আজ নয়, সেই ১৯৫৬ সাল থেকেই। অবশ্য যখন প্রথম এই আইন আসে, প্রতিরোধের পরিবর্তে তখন বারবনিতাবৃত্তি-দমনই ছিল লক্ষ্য।

যখন বাস্তবে দেখা গেল, এই বৃত্তি দমন করা সম্ভব নয়, তখন ‘নিয়ন্ত্রণ’-এর প্রশ্ন উঠল। কিন্তু দমন বা নিয়ন্ত্রণ, যেটাই সরকারের লক্ষ্য হোক না কেন, তার জন্য আইনরক্ষকদের উপরই নির্ভর করতে হয়। আর, এই বৃত্তির সামাজিক প্রান্তিকতার সুযোগে সেই রক্ষকরাই অনেক সময়ে হয়ে ওঠে ভক্ষক। যে-দেশে কাজের লোভ দেখিয়ে, বিয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে, বারবনিতালয়ে বিক্রি করে দেয় কাছের মানুষরাও, সে-দেশে তর্কের খাতিরেই বলি, এই বৃত্তি ‘বৈধ’ না ‘অবৈধ’, তা দিয়ে কি মেয়েদের শোষণ আটকানো গিয়েছে? বরং যে-প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ স্ব-ইচ্ছায় এই বৃত্তি নেবে বলে স্থির করবে, নীতিপুলিশগিরি ছেড়ে প্রয়োজন তাদের মর্যাদা আর যথাযথ সুরক্ষার ব্যবস্থা করা। সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশ সেদিকে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

[আরও পড়ুন: রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে স্থগিতাদেশ এলেও রয়েছে আরও ভয়ঙ্কর ইউএপিএ]

Sangbad Pratidin News App: খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
নিয়মিত খবরে থাকতে লাইক করুন ফেসবুকে ও ফলো করুন টুইটারে