২০১৪ সালের আগে নীতিগত অচলাবস্থা ও বিপুল অঙ্কের দুর্নীতির কারণে ভারত
বিশ্বের ‘ফ্র্যাজাইল ফাইভ’ অর্থনীতির অন্যতম রূপে বিবেচ্য হত। এমতাবস্থায় নরেন্দ্র মোদির সরকার ভারতীয় অর্থনীতির প্রতি বিশ্বের আস্থার পুনর্গঠনে জোর দেন, এবং এ দেশকে বিনিয়োগবান্ধব গন্তব্যে পরিণত করার লক্ষ্যে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ব্রিটেন-ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর সেই কৌশলেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। লিখছেন পীযূষ গোয়েল।
১৫ জুলাই থেকে কার্যকর হতে চলা ভারত-ব্রিটেন বাণিজ্য চুক্তি ভারতীয় কৃষক, এমএসএমই, মৎস্যজীবী, স্টার্ট আপ এবং কারিগরদের জন্য বিশ্ববাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে, সমৃদ্ধি নিয়ে আসবে। এই চুক্তি অসংখ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি ভারতীয়দের জন্য ন্যায্য মূল্যে সঠিক গুণমানের পণ্য নিশ্চিত করবে, যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর দিকে যাত্রাকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
এর পাশাপাশি, ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি ব্রিটেনের বাজার, বিশেষত শ্রমনির্ভর ক্ষেত্রে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে। দু’-দেশে এই চুক্তির ফলে প্রায় ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে, যা মোট বাণিজ্যমূল্যের প্রায় ১০০ শতাংশ। ফলে ভারতীয় রপ্তানির জন্য বিপুল সম্ভাবনার পথ খুলে যাবে।
গত বছর নরেন্দ্র মোদি এবং কিয়ার স্টারমারের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির সুফল সমাজের বিভিন্ন স্তরে পৌঁছবে বলে আশা। কৃষকরা তাদের দেশীয় বাজার অক্ষুণ্ণ রেখে উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। মৎস্যজীবীরা ব্রিটেনের বৃহৎ বাজারে সামুদ্রিক পণ্য রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে পারবে। শ্রমিকরা, শ্রমনির্ভর শিল্পে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভ করবে। মহিলা উদ্যোক্তা, যুবসমাজ, স্টার্ট আপ এবং এমএসএমই ক্ষেত্র বিশ্বব্যাপী মূল্যশৃঙ্খলে আরও ভালোভাবে সংযুক্ত হতে পারবে। পেশাদারেরাও আরও গতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সুযোগ পাবে।
ব্রিটেনের বিশাল বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ভারতীয় উৎপাদন শিল্পকে নতুন গতি দেবে। এর ফলে ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পী, বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং আঞ্চলিক শিল্পকেন্দ্রগুলি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন করবে।
নতুন সম্ভাবনা
সার্বিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য চুক্তি ভারতীয় কৃষকদের জন্য ব্রিটেনের উচ্চমূল্যের বাজার উন্মুক্ত করবে, যা ইউরোপের অন্যান্য দেশের কৃষকের পাওয়া সুবিধার সমতুল্য বা তার চেয়েও বেশি। হলুদ, গোলমরিচ, এলাচ এবং আমের ক্কাথ, আচার ও ডালের মতো প্রক্রিয়াজাত পণ্য
শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। কৃষিপণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি কৃষকদের আয় বাড়াবে এবং গুণমান, প্যাকেজিং ও শংসাপত্র প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও উৎসাহ জোগাবে। একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক মূল্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে বিপুল কর্মসংস্থানের সৃষ্টি নিশ্চিত করবে।
অন্যদিকে, দেশীয় কৃষকদের স্বার্থরক্ষার জন্য ভারতের সবচেয়ে সংবেদনশীল কৃষিক্ষেত্রগুলিকে এই চুক্তির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। বিশেষ করে দুগ্ধজাত পণ্য, দানাশস্য, মিলেট, আপেল, ওট্স এবং ভোজ্যতেল-সংক্রান্ত ক্ষেত্রগুলিকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। যা মোদি সরকারের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। খাদ্য নিরাপত্তা, দেশীয় বাজারে মূল্যস্থিতি এবং দুর্বল কৃষক সম্প্রদায়ের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
নতুন গতি
ব্রিটেনের বিশাল বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ভারতীয় উৎপাদন শিল্পকে নতুন গতি দেবে। এর ফলে ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পী, বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং আঞ্চলিক শিল্পকেন্দ্রগুলি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন করবে। ভারতীয় পণ্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলির তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন করায় ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলিও লাভবান হবে। ফুটবল ও ক্রিকেট সামগ্রী, রাগবি বল, খেলনা ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদনকারী ভারতীয় সংস্থাগুলি ব্রিটেনের বাজারে ব্যবসা উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে।
শুল্ক প্রত্যাহারের দরুন, বিশেষত শ্রমনির্ভর শিল্পে, দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা দূর হবে। এর ফলে রফতানির সক্ষমতা ও উৎপাদনের পরিসর দ্রুত বৃদ্ধি পাবে বলে আশা। তিরুপ্পুরের তঁাতশিল্প থেকে বেঙ্গালুরুর প্রযুক্তি গবেষণাগার, সুরাটের হীরেশিল্পী থেকে হায়দরাবাদের সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ– এই চুক্তির প্রভাব ভারতীয় অর্থনীতির বিস্তৃত পরিসরে অনুভূত হবে।
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলি এখন পণ্য ও পরিষেবা বাণিজ্যের পরিসরকে ছাপিয়ে গিয়ে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করছে।
পেশাদারদের জন্য সুযোগ
ব্রিটেন ভারতকে পরিষেবা ক্ষেত্রে বিস্তৃত বাজার-প্রবেশাধিকার প্রদান করেছে। এর আওতায় প্রতিটি প্রধান পরিষেবা ক্ষেত্র এবং ভারতের রফতানি-স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ১৩৭টি উপক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই উন্নত বাজার-প্রবেশাধিকার এবং নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ভারতীয় পরিষেবা প্রদানকারীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে– বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, আর্থিক, পেশাদার, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ইঞ্জিনিয়ারিং, টেলিযোগাযোগ, পরামর্শদান পরিষেবা ক্ষেত্র এর সুফল পাবে।
চুক্তিভিত্তিক পরিষেবা প্রদানকারী, ব্যবসায়িক ভ্রমণকারী, বিনিয়োগকারী, যোগ প্রশিক্ষক, সংগীতশিল্পী, পেশাদার রাঁধুনি প্রমুখ। এছাড়া ব্যবসায়িক দর্শনার্থী, বহুজাতিক সংস্থার
অভ্যন্তরীণ বদলির কর্মী, স্বাধীন পেশাজীবী এবং বিনিয়োগকারীদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। চুক্তির আওতায় প্রতি বছর ১,৮০০ জন ভারতীয় শেফ, যোগ প্রশিক্ষক এবং শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ব্রিটেনে বিশেষ কর্মসংস্থান ও পেশাগত সুযোগ লাভ করতে পারবে।

মুক্ত বাণিজ্য
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলি এখন পণ্য ও পরিষেবা বাণিজ্যের পরিসরকে ছাপিয়ে গিয়ে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করছে। ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য সংস্থা-ভুক্ত (EFTA) দেশ– যেমন: সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ড এবং লিচেনস্টাইনের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে ভারত ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি অর্জন করেছে, যা থেকে প্রায় ১০ লক্ষ প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে, নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে আগামী ১৫ বছরে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত হয়েছে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে চুক্তি ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলির দীর্ঘ দিনের দ্বৈত কর-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করেছে।
ব্রিটেনের সঙ্গে চুক্তির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল ‘ডাবল কনট্রিবিউশন কনভেনশন’। সার্বিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি কার্যকর হওয়া এই যুগান্তকারী ব্যবস্থার ফলে ব্রিটেনে অস্থায়ীভাবে কর্মরত ভারতীয় কর্মী ও তাদের নিয়োগকর্তাদের একইসঙ্গে উভয় দেশে সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলে অবদান রাখতে হবে না। এর ফলে ৭৫ হাজারেরও বেশি ভারতীয় পেশাজীবী এবং ৯০০-র বেশি ভারতীয় সংস্থা উপকৃত হবে। বিদেশে অস্থায়ী নিয়োগের সময়ও কর্মীরা তাদের সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবে, যা তাদের আর্থিক সুরক্ষা ও পেশাগত গতিশীলতাকে আরও শক্তিশালী করবে।
সুকৌশল
২০১৪ সাল ভারতের অর্থনীতি নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছিল, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। নীতিগত অচলাবস্থা এবং বিপুল অঙ্কের দুর্নীতির জন্য ভারতকে বিশ্বের ‘ফ্র্যাজাইল ফাইভ’ অর্থনীতির অন্যতম হিসাবে বিবেচনা করা হত। এমতাবস্থায় মোদি সরকার বিশ্বজুড়ে ভারতীয় অর্থনীতির প্রতি আস্থার পুনর্গঠন এবং এ-দেশকে বিনিয়োগবান্ধব গন্তব্যে পরিণত করার লক্ষ্যে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ‘উন্নত’ দেশগুলির সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর সে কৌশলেরই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এ ধরনের চুক্তি, বাণিজ্য নীতির অনিশ্চয়তা কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতেও সহায়ক।
ভারত-ব্রিটেন সার্বিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য চুক্তি বৃহৎ অর্থনীতিগুলির মধ্যে ন্যায়সঙ্গত, উচ্চাভিলাষী এবং ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তির এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।
সরকার সেসব উন্নত অর্থনীতির সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করেছে, যেগুলির বাজার বৃহৎ হলেও ভারতের প্রধান বাণিজ্যিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় লিপ্ত নয়। পূর্ববর্তী সরকার যেভাবে বাছবিচার না করে দরজা খুলে দিয়ে ভারতীয় শিল্পকে বিপদের মধ্যে ফেলেছিল, তার পুনরাবৃত্তি না করে মোদি সরকার উভয়পক্ষের জন্য লাভজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পেরেছে।
নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতকে বিশ্ব এক স্থিতিশীল ও সহনশীল অর্থনীতি ও বিশ্বস্ত অংশীদার হিসাবে গণ্য করে। অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যেও ভারত নিজেকে এক নির্ভরযোগ্য সহযোগী এবং আকর্ষণীয় বাজার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে– বিশ্বের দ্রুততম বিকাশশীল প্রধান অর্থনীতির অন্যতম হিসাবে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছে।
‘বিনিয়োগবান্ধব’ পরিবেশ গড়ে তুলতে গৃহীত হয়েছে বিভিন্ন যুগান্তকারী সংস্কার। এখন বিশ্বের বহু দেশ ও বিনিয়োগকারী ভারতের বিকাশযাত্রার শরিক হতে আগ্রহী, এবং সেই কারণেই ভারতের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরে আগ্রহ বাড়ছে।
এই বাণিজ্য চুক্তিগুলি ধাপে ধাপে দেশীয় বাজারকে উন্মুক্ত করেছে। ফলে ভারতীয় বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দেশীয় উৎপাদকরা আন্তর্জাতিক মানের পণ্য প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে উৎপাদনে উৎসাহিত হচ্ছে।
ভারত-ব্রিটেন সার্বিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য চুক্তি বৃহৎ অর্থনীতিগুলির মধ্যে ন্যায়সঙ্গত, উচ্চাভিলাষী এবং ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তির এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। এই চুক্তি ভারতের মৌলিক স্বার্থের সঙ্গে আপস না-করেই সমাজের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্যও আন্তর্জাতিক সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত করেছে। ‘নতুন ভারত’ কীভাবে ব্যবসা করতে পারে, এ তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
সরকারি বাসে ‘জয় রাইড’ বিজয়ের, ছবি তুললেন কন্ডাক্টরের সঙ্গেও, মুখ্যমন্ত্রীর সারল্যে মুগ্ধ জনতা
-
ট্রাম কলকাতার ‘চলনস্পদ’, পরিবহণ মন্ত্রীর ঘোষণা সাধুবাদযোগ্য
-
কতজন শ্রমিক কাজ করছিলেন তার কোনও রেজিস্টার নেই, তারাতলার তদন্তে সিটের হাতে বিস্ফোরক তথ্য
-
খুনের আগের দিন ক্যাফেতে বসে ব্লুপ্রিন্ট সাজায় সিয়া ও তাঁর প্রেমিক! প্রকাশ্যে সিসিটিভি ফুটেজ
-
খাবারের জন্য হাহাকর, নেই ওষুধ, অধিকৃত কাশ্মীরে পাক সেনার বর্বরতার করুণ ছবি!