রাজ্যজুড়ে এই মুহূর্তে অভিযান চলছে রেস্তোরাঁ, বাজারে। সর্বত্রই ধরা পড়ছে বিষাক্ত রং, পচা মাংস, পোড়া তেল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার। এই হারে অসাধুতা চলতে থাকলে তো মারণ রোগ ছোঁয়াচে হয়ে যাবে! লিখছেন, সুতীর্থ চক্রবর্তী।
শৈশবেই সুকান্ত ভট্টাচার্যর ‘ভেজাল’ পড়ে আমরা চাল, ঘি, ময়দা সমেত সমস্ত খাদ্যপণ্যে ভেজালের অস্তিত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়েছি। সদ্য কবির শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে। দুর্ভাগ্যের হল, আট দশকের বেশি আগে লেখা তাঁর কবিতার এই সমাজ বাস্তবতা এখনও বদলায়নি। রাজ্যজুড়ে এই মুহূর্তে অভিযান চলছে রেস্তোরাঁ, বাজারে। ভেজালের পরিমাণ যে কবির কল্পনাকে ছাপিয়ে বহুদূর চলে গিয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আরও পড়ুন:
কিছু দিন আগেই একবার কলকাতা ও শহরতলির রেস্তোরাঁগুলিতে অভিযান চালিয়ে কুকুরের মাংস পর্যন্ত মিলেছিল। তখন বেশ কয়েক দিন এই ভেজাল খাবার নিয়ে হইচই চলে। কিন্তু মানুষের স্মৃতি খুব দুর্বল। তাই মধ্যবর্তী সময়ে কোনও রেস্তোরাঁয় খাবারের গুণমান ও ভেজাল নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠেনি। ফের অভিযান শুরু হতেই দেখা গেল– পরিস্থিতির কোনও বদলই ঘটেনি। নামী রেস্তোরাঁর ফ্রিজারে যথারীতি রয়েছে ফাঙ্গাস ধরে যাওয়া মাংস, রান্নাঘরে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে ভেজাল মশলা, কড়াইয়ে মিলেছে আগে ব্যবহৃত পোড়া তেল, বিরিয়ানিতে ও মিষ্টিতে দেওয়া হয়েছে পোশাক শিল্পের রং ইত্যাদি নানারকম ভেজাল।
এবার রেস্তোরাঁর সঙ্গে সঙ্গে পুরসভার খাদ্য সুরক্ষা বিভাগ ও স্বাস্থ্য দফতরের কর্মীরা হানা দিচ্ছেন বাজারেও। সেখানে মাছ-মাংস থেকে শুরু করে ফলমূল, শাকসবজিতে রং ও বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার আরও ব্যাপক। ফলমূল পাকানো এবং তাজা রাখার কাজে শিল্পে ব্যবহার্য কার্বাইড, ইথিন ও ফরমালিনের প্রয়োগ সম্ভবত সুকান্তর আমল থেকেই শুরু হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিষাক্ত রাসায়নিকের উপর নির্ভরতা ব্যবসায়ীদের আরও বেড়েছে। বাজারে ফরমালিনে চোবানো মাছ, মাংস বিক্রি জলভাত হয়ে গিয়েছে। ওজন বাড়াতে মুরগির খাদ্যে নানা বিষ মেশানোর সঙ্গে সঙ্গে শরীরে দেওয়া হয় রাসায়নিক মিশ্রিত জলের ইঞ্জেকশন। এমনকী, বাজারে জলের মধ্যে লাফাতে থাকা যে জ্যান্ত মাছগুলি বিক্রি হয়, সেগুলিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভেজাল। জলে এক ধরনের পাউডার মিশিয়ে মাছগুলিকে ওইভাবে জীবিত রাখা হয়। ওই পাউডারগুলি মানবদেহের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর।
ভেজাল-সহ ধরা পড়লে মোটা অঙ্কের জরিমানা, হাজতবাস, সাময়িক লাইসেন্স বাতিল এই ধরনের পদক্ষেপ দরকার। পিছু হটলে চলবে না।
কলকাতা পুরসভার অভিযানে বিভিন্ন মশলায় কাঠের গুঁড়ো, ইটের গুঁড়ো-সহ বিষাক্ত উপাদানের হদিশ তো মিলেইছে, এমনকী পোস্তা বাজারে মৌরির মধ্যেও রং পাওয়া গিয়েছে। খাওয়ার পর রেস্তোরাঁয় মুখশুদ্ধি হিসাবে মৌরি দেওয়া হয়। সেটাও শান্তিতে খাওয়ার উপায় নেই। গাঢ় সবুজ দেখাতে সেগুলিতেও রং লাগানো হয়। রেস্তোরাঁর বিরিয়ানিতে তো রঙের ব্যবহার আকছার। এই রং আবার যে-সে রং নয়। পোশাক শিল্পে ব্যবহার্য অরামিন, মেটানিল ইয়েলো, সুদান রেডের মতো রংগুলি বিরিয়ানিতে ব্যবহার করা হয়। মফস্সলে পাড়ার মিষ্টির দোকানগুলির সন্দেশেও মিলেছে এই পোশাক শিল্পের রং। ভোজ্য তেলে পোড়া মোবিল, শিয়ালকাঁটা ইত্যাদির ব্যবহারও এখনও বন্ধ হয়নি। মধ্য কলকাতার রেস্তোরাঁয় পোড়া মোবিলে ভাজা পরোটা বিক্রির চল বহু দিনের। বিষাক্ত তেল খেয়ে বহু মানুষের পঙ্গু হয়ে যাওয়ার মতো ভয়াবহ ঘটনা একবার কলকাতা দেখেছিল। কিন্তু তাতেও একাংশের ব্যবসায়ীর অসাধুতা বন্ধ করা যায়নি। অতিরিক্ত মুনাফার আশায় মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলছেই।
আমাদের শৈশবে পাটিগণিতের বইতে দুধে জল মেশানোর অঙ্ক দেখা যেত। শিক্ষাব্যবস্থার গোড়াতেই যদি ভেজালকে এইভাবে বৈধতা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে এবং ভেজালের অঙ্ক মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সুকান্তর কবিতা কীভাবে সমাজ-বাস্তবতায় বদল আনবে? ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরেই যে সমাজে শিশুর মুখে ওঠে ডিটারজেন্ট মেশানো গুঁড়ো দুধ, সেখানে তো ভেজালই একমাত্র সত্য। সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, পারদ ইত্যাদি তো শৈশবেই অামাদের খাদ্য শৃঙ্খলায় ঢুকে পড়েছে। স্বাধীনতার ৮০ বছর পরেও জনস্বাস্থ্য সেই একই কিনারায়। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের বিনিময়ে ব্যবসায়ীদের মুনাফা শুধু বাড়তেই থাকে। উদ্বেগের হল এখন বাইরে খাওয়ার চল প্রভূত পরিমাণে বেড়েছে। সুইগি, জোমাটোর দৌলতে রেস্তোরাঁর খাবার রান্নাঘরের বিকল্প হয়ে উঠছে। রেস্তোরাঁয় যদি এই হারে অসাধুতা চলতে থাকে, তাহলে খাবারের বিষে কিডনি ও লিভার বিকল হওয়া এবং ক্যানসার ক্রমশ ছোঁয়াচে রোগের মতো হয়ে দাঁড়াবে।
ইউরোপ, আমেরিকার উন্নত দেশগুলিতে ভেজাল ঠেকাতে আজকাল ‘ফার্ম টু ফর্ক’ নজরদারির ব্যবস্থা রয়েছে। খামারেই খাদ্য পণ্যের গায়ে লেগে যাচ্ছে ‘কিউ আর কোড’। হেঁশেল পর্যন্ত চলছে ট্র্যাকিং।
ইউরোপ, আমেরিকার উন্নত দেশগুলিতে ভেজাল ঠেকাতে আজকাল ‘ফার্ম টু ফর্ক’ নজরদারির ব্যবস্থা রয়েছে। খামারেই খাদ্য পণ্যের গায়ে লেগে যাচ্ছে ‘কিউ আর কোড’। হেঁশেল পর্যন্ত চলছে ট্র্যাকিং। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে কোনও খাদ্যদ্রব্য বা ফলমূল নিয়ে ঢোকাই নিষিদ্ধ। ভেজালের ছোঁয়া এড়িয়ে চলতে তারা বিশেষভাবে তৎপর। আমাদের পক্ষে এত প্রযুক্তিনির্ভর ট্র্যাকিং হয়তো এখনই সম্ভব নয়। কিন্তু প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যে থেকেই কড়া পদক্ষেপের চূড়ান্ত সময় এসে গিয়েছে। এক-একবার অভিযানেই ধরা পড়ছে যে, ভেজাল কোন স্তরে পৌঁছে গিয়েছে। এই জিনিস আরও কিছু দিন চলতে দিলে হয়তো চারপাশে বিষ ছাড়া কিছু মিলবে না। সেই দিনটা ঠেকানোর জন্য দ্রুত সব ধরনের তৎপরতা ও উদ্যোগ গ্রহণ খুবই জরুরি হয়ে পড়ছে।
রাজ্যজুড়ে কয়েকদিন ধরে যে অভিযান পুরসভা, স্বাস্থ্য দফতর ও এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের পক্ষ থেকে চলছে, তা আরও কিছুদিন চালিয়ে যাওয়া অনিবার্য। পাশাপাশি রেস্তোরাঁ, বাজার ও সরবরাহকারীদের উপর ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের জন্য পরিকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। সরবরাহ শৃঙ্খলের উৎসে গিয়ে নজরদারি না করতে পারলে ভেজাল দেওয়ার প্রবণতা কমবে না। হঠাৎ হঠাৎ পরিদর্শন ও খাবারের গুণমান যাচাইয়ের জন্য তৎক্ষণাৎ ল্যাব টেস্টের ব্যবস্থা না থাকলে আবার যে-কে-সেই। বহুজাতিক সংস্থার রেস্তোরাঁ শৃঙ্খলায় ক্রেতাদের চোখের সামনে রান্নাঘর থাকে। সেটা সব ধরনের রেস্তোরাঁয় বাধ্যতামূলক করা জরুরি। সর্বোপরি ভেজাল-সহ ধরা পড়লে মোটা অঙ্কের জরিমানা, হাজতবাস, সাময়িক লাইসেন্স বাতিল এই ধরনের পদক্ষেপ দরকার। ইউরোপ বা আমেরিকায় ভেজালের ক্ষেত্রে এত বিশাল জরিমানা হয় যে, সংস্থা অনেক সময় দেউলিয়া হয়ে যায়। এখানেও সেরকম সাজা দিতে হবে। কর্মসংস্থানের যুক্তিতে পিছু হটলে চলবে না। সবচেয়ে জরুরি অবশ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করা। ‘রক্ষক ভক্ষক’ হলে সব অভিযানই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে। আট দশক ধরে যা হয়ে এসেছে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
‘তোমার বাবার টাকায় খাই?’, ৬৭ বছর বয়সে বিয়ের কথা শুনেই রেগে আগুন নীনা গুপ্তা
-
এবার সরাসরি ‘নীতুদা’র নাম নিয়ে আক্রমণ! ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের জন্যও বিস্ফোরক বার্তা অস্কারের
-
ব্রিকসে যোগ দিতে চায় পাকিস্তানও, সমর্থন চিনের! কী পদক্ষেপ নয়াদিল্লির?
-
ঝাড়খণ্ডের ব্যবসায়ী খুনে চাঞ্চল্যকর মোড়! লোকেশনের তথ্য দিতেন কলকাতার ট্রাফিক সার্জেন্ট
-
উদয়পুর-তালসারির বনাঞ্চলে ওরাংওটাং উদ্ধারে দিঘা যোগ, হোটেল থেকে আটক ৩