Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ৫ জুন ২০২৬
Nandigram

সম্পাদকীয়: পয়লা এপ্রিলের নন্দীগ্রাম

এখনও গোধরা হয়ে যায়নি বাংলা।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ৭, ২০২১, ১৪:৩৮

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ৭, ২০২১, ১৪:৩৮

options
link
সম্পাদকীয়: পয়লা এপ্রিলের নন্দীগ্রাম zoom

কিংশুক প্রামাণিক: বয়াল মক্তব প্রাথমিক স্কুলটি স্বাধীনতার আগের। স্থাপিত হয় ১৯২৫ সালে। নন্দীগ্রামের গ্রামান্তরে পড়াশোনার চল যে বহুকাল ধরে ছিল, তা এই স্কুলের সময়কাল দেখলেই বোঝা যায়। হবে নাই-বা কেন, একে বিদ্যাসাগরের জেলা, মাতঙ্গিনী-ক্ষুদিরামের মাটি, তার উপর ব্রিটিশ রাজশক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্বাধীন তাম্রলিপ্ত সরকার গঠিত হয়েছিল এই মাটিতেই। আর কী পরিচয় হতে পারে একটি এলাকার? শুধু লড়াই দিয়ে এই সাফল্য অর্জন হয় না, সাহসী হতে হয়, পেটে বিদ্যা থাকা চাই।

[আরও পড়ুন: সম্পাদকীয়: রামকে কেন ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম’ বলা হয়]

সেই অর্থে নন্দীগ্রাম গর্ব করতেই পারে। বড়াই করতে পারে নিজেদের কৌলীন্য ও স্বাতন্ত্র্যের। জমি আন্দোলনের সময় জাত-ধর্ম ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে। ভরতের দেহ পুড়েছে শ্মশানে, সেলিম গিয়েছে কবরে। তদুপরি সেই মাটির বয়াল গ্রামে পয়লা এপ্রিল যা দেখলাম, সেটা পশ্চিমবঙ্গের ছবি নয়। দুই দশক আগে বিধানসভা নির্বাচনের দিন গুজরাটের গোধরায় ছিলাম। সেই গোধরা, যেখানে জ্বলন্ত ট্রেনে ভয়ংকরভাবে পুড়ে বহু মানুষের মৃত্যু হওয়ার পর গুজরাট জুড়ে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। ক্রোধের ধর্মীয় আগুনে ছারখার হয়ে যায় মহাত্মা গান্ধীর মাটির ঐক্য-ভ্রাতৃত্ব, সংহতি-সম্প্রীতি। সমাজ আড়াআড়িভাবে বিভক্ত হয় দুই ধর্মে।

Advertisement

গোধরা আসনটিতে প্রচুর আদিবাসী ভোট রয়েছে। বরাবর কংগ্রেসই জিতে এসেছে। কিন্তু ২০০২—এর বিধানসভা নির্বাচনে ধর্মীয় আবহে পট পরিবর্তন হয়ে যায়। ভোটের দিন দেখলাম, মুসলিম মহল্লায় বিজেপির কোনও পতাকা নেই, এজেন্টও নেই। একইভাবে হিন্দু এলাকায় কংগ্রেসের কোনও পতাকা নেই, বুথে নেই এজেন্ট। স্পষ্ট এই বিভাজন যে দাঙ্গার ফল- সেটা বুঝতে বাকি রইল না। রাতে আহমেদাবাদ ফিরে এসে অফিসে কপি ফাইল করলাম। তথ্য দিয়েই লিখলাম, গেরুয়া শিবিরের হাতেই যাচ্ছে গোধরা। ফলাফল বেরনোর পর আমার পর্যবেক্ষণ সত্য হল। ভোটের এত সোজা অঙ্ক বোধহয় জীবনে কষতে হয়নি। কে জিতবে, দুই শিবিরে উঁকি দিয়েই বুঝেছিলাম। তা নির্ধারণ করতে সাংবাদিক হওয়ার প্রয়োজন ছিল না।

এরপর গুজরাটে গত কুড়ি বছর সব স্তরের ভোটেই অধিকাংশ আসনে মেরুকরণের ধারা অব্যাহত রয়েছে। হিন্দুদের বড় অংশ একদিকেই ভোট দিচ্ছেন। শাসকের কাজ ভাল না খারাপ- তা বিচার্য হচ্ছে না। ফলে বিজেপিকে হারানো যাচ্ছে না কোনও স্তরের ভোটেই। কাজ করছে না প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা। বাংলা এবার কোন পথে? তিন দফা ভোটপর্ব দেখার পর বলতে দ্বিধা নেই, এই রাজ্যে ক্ষমতা করায়ত্ত করতে মেরুকরণের আপ্রাণ চেষ্টা করেছে কেন্দ্রের শাসক দল। বাংলাকে গুজরাট বানানোর যে সংকল্প তারা ঘোষণা করেছে, তার প্রাথমিক ধাপ মেরুকরণ। তারা বুঝে গিয়েছে, মমতা সরকার দশ বছর অতিক্রম করলেও প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার হাওয়া তুলে বাংলা দখল সম্ভব নয়। মমতার সামাজিক প্রকল্পে জড়িয়ে গিয়েছে সমগ্র সমাজ। সব পরিবারে উপভোক্তা রয়েছেন। তাঁরা সুবিধা পাচ্ছেন বলেই স্থিতাবস্থার পক্ষে। মেরুকরণ ছাড়া এই রায় উলটে দেওয়া সম্ভব নয়।

বিজেপি সেই নীতি নিয়েছে। যদিও কৌশলগত কারণে প্রকাশ্যে বিজেপির শীর্ষ নেতাদের মেরুকরণের প্রচার কম। নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ-র মতো সিনিয়ররা একেবারেই এ নিয়ে কিছু বলছেন না। তাঁদের মুখে বরং রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার বাংলা’ স্লোগান। বঙ্গ-আবেগ উসকে নিজেদের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা। কিন্তু স্থানীয় স্তরে খুব সন্তর্পণে হিন্দুত্বের প্রচার চালানো হচ্ছে। এবং তাতে কাজ হচ্ছে না, সেটা বলা যাবে না। দেশভাগের যন্ত্রণা বুকে নিয়ে থাকা মানুষকে উসকে দেওয়া খুব শক্ত কাজ নয়। হিন্দু-মুসলমান বিভাজন খুব সহজ ইস্যু।

লোকসভা ভোটের সময় মেরুকরণের সুফল অনেকটা ঘরে তু্‌লেছিল বিজেপি। নরেন্দ্র মোদিকে প্রধানমন্ত্রী করার ভোট ছিল বলে তাদের আরও সুবিধা হয়। উদ্বাস্তু, আদিবাসী, রাজবংশী ইত্যাদি নানা স্তরের ভোট বিজেপি প্রার্থীরা পেয়েছিলেন। কিন্তু লোকসভার সঙ্গে বিধানসভা ভোটের বেসিক ফারাক আছে। এই ভোট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুখ্যমন্ত্রী করা অথবা না করার যুদ্ধ। ‘হয় মমতা, নয় মমতা’-র মেরুকরণ অনেকে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে ভোটের প্রচারেও। মমতা খুব ভাল করে জানেন সেটা। তাই তিনি নিজেকে তুলে ধরছেন। সব সভায় দু’টি কথা খুব জোর দিয়ে বলছেন- এক) কন্যাশ্রী চান, সাইকেল চান, ট্যাব চান, বিনা পয়সায় চাল চান, দুয়ারে রেশন চান, পাঁচ লক্ষ টাকার স্বাস্থ্যসাথীর কার্ড চান, ৬০টির বেশি সামাজিক প্রকল্প চান, তবে আমাকে ভোট দিন। আমাদের সরকার না এলে এই সুবিধাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। দুই) কে প্রার্থী ভুলে যান, তার কিছু সমস্যা থাকলেও মাথায় রাখবেন না। আমি প্রার্থী। আমাকে যদি মুখ্যমন্ত্রী চান, চোখ বন্ধ করে জোড়াফুলে ভোট দিন। যদি স্থানীয় প্রার্থীকে না জেতান, আমি সরকারটা গড়ব কীভাবে?

তাই ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’ প্রচার। এই দুর্দান্ত থিমে মমতা কতটা সাড়া পেলেন, সেটা ভোটবাক্স খুললে বোঝা যাবে। তবে সন্দেহ নেই, নানা কারণে মহিলা ভোটের সিংহভাগ তিনি পেতে চলেছেন। তফসিলি-আদিবাসী ভোটব্যাংক অনেকটা এবার তিনি ফেরাতে পারবেন বলে তৃণমূল শিবির আশাবাদী।

তবে মেরুকরণের প্রচার যেভাবে চলছে, তাতে আগামী দিনে কাজের ভিত্তিতে ভোট হবে, না কি হিন্দু-মুসলমানে বিভাজন করে ভোট হবে বাংলায়- তা নিয়ে প্রশ্ন সামনে এসে গিয়েছে।
নন্দীগ্রামে মেরুকরণের প্রচার তুঙ্গে তুলেছিল বিজেপি। পদ্মফুল-প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্যেই ৭০:৩০-এর তত্ত্ব সামনে এনেছিলেন। তাতে তিনি সফল হয়েছেন বলেও দাবি করেছেন। মেগা ভোটপর্ব যখন মধ্যগগনে, তখন নিজের পক্ষেই তিনি বলবেন- সেটাই স্বাভাবিক।

সেদিন বয়ালে ভোট চলাকালীন স্পষ্টতই দু’টি সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিতণ্ডা দেখেছে দেশ। এক সময় মনে হচ্ছিল, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বড় কিছু হয়নি। শুনছিলাম, দু’টি গ্রামের রাজনৈতিক বিরোধ বহুদিনের। এখন সেটায় ধর্মীয় রং এসে গিয়েছে। মেরুকরণ ঘটেছে। বিজেপি সমর্থকরা ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিচ্ছিলেন, ততোধিক জোরে তৃণমূল সমর্থকরা বলছিলেন ‘জয় বাংলা’। মমতা কেন ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি নতুনভাবে তুলে ধরেছেন, এতদিনে আমার বোধগম্য হল। একই সঙ্গে ভাল লাগছিল এটাই যে, ওপাশ থেকে হিন্দুত্বের স্লোগান শুনেও ধর্মীয় কোনও স্লোগান দেননি এপাশের লোকেরা। ব্রাহ্মণ-কন্যা হয়েও মমতা জয়ধ্বনি পাচ্ছিলেন মুসলিমদের থেকে।

পুলিশের মধ্যস্থতায় দু’পক্ষ দু’দিকে সরে যাওয়ার পর পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে মমতা স্কুল থেকে বেরিয়ে এগিয়ে যান প্রায় হাফ কিলোমিটার দূরে তাঁর গাড়ির দিকে। সেই গ্রামের ভিতর দিয়ে তিনি এলেন, যেখান থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উঠছিল। তখনও স্লোগান দিচ্ছিলেন সংখ্যালঘুরা। কিন্তু মমতা গাড়ির কাছে আসতে সেই স্লোগানে শামিল ওই গ্রামের হিন্দুরাও। পুকুরপাড়ে উপচে পড়ল সব ধর্মের মানুষ। শাঁখ বাজল, উলুও পড়ল। হুইলচেয়ারে বসা মুখ্যমন্ত্রীকে দেখতেই আট থেকে আশি সবার হুড়োহুড়ি। ভাবছিলাম, তাহলে মেরুকরণ কোথায়? কিছু মহল্লায় বিভাজন হয়েছে ঠিকই। কিন্তু ‘গোধরা’ হয়ে যায়নি বাংলা। নিজের গর্বিত পরম্পরা হয়তো রক্ষা করেছে নন্দীগ্রাম।

[আরও পড়ুন: সম্পাদকীয়: খেলা ভাঙার খেলা]

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.