আজ রাহুল গান্ধী শুরু করছেন তাঁর বহুচর্চিত ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’। অনেক দিন পর কংগ্রেস কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে। সেটা কতটা আন্তরিক, কতটা বাধ্যবাধকতামূলক, কতটা প্রকৃত তাগিদ, কতটা ফাঁকিবাজির রাজনীতি- বলা কঠিন। বারবার রাহুল ব্যর্থ হয়েছেন, বারবার তাঁকে নতুন মোড়কে উপস্থাপনের চেষ্টা হয়েছে। এটাও তেমনই আর-একটা প্রচেষ্টা কি না, তা এখনও অজানা। কলম ধরছেন সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়।
কালীপুজো উপলক্ষে কলকাতা বা শহরতলিতে এখনও কোথাও কোথাও নিশ্চয়ই তুবড়ি প্রতিযোগিতা হয়। কিছু কিছু তুবড়ি থাকে, যেগুলো ভুশভুশ করে রংবেরঙের ফুলঝুরি ছুড়েও প্রত্যাশামতো তিনতলা সমান উঁচু বাঁশের মাথা ছোঁয়ার আগেই নেতিয়ে যায়। আশা জাগিয়েও ব্যর্থ হয়। কংগ্রেসের কান্ডারি হিসাবে রাহুল গান্ধীর অতীত ও বর্তমান কেন যেন সেই নিস্তেজ তুবড়ির মতো মনে হয়। তিনি বারবার প্রত্যাশা জাগান, বারবার ব্যর্থ হন।
গত রোববার দিল্লির রামলীলা ময়দানে রাহুল (Rahul Gandhi) আরও একবার হতোদ্যম কংগ্রেসিদের মনে কিছুটা প্রত্যাশা জাগালেন কি? প্রশ্নটা করতে হল সমাবেশের ব্যাপ্তি ও ‘জোশ’ দেখে। অনেক দিন ধরে চারদিকের নানা চাপে পিষ্ট কংগ্রেস এমন একটা জমকালো আয়োজন করতে পারে, সেই বিশ্বাস অনেকের নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। রোববার থেকে সম্ভবত তারা আবার এক নতুন আশায় বুক বাঁধতে শুরু করেছে। হয়তো ভাবছে, ভাগ্যের ফের- বারবার তিনবার একই রকম হতে পারে না। ২০২৪ সালে পাশার দান না-উলটালেও শাসকের এমন দোর্দণ্ডপ্রতাপ নিশ্চিত খর্ব হবে। সরকারের মেজাজ-মরজি আজকের মতো এমন ‘ডোন্ট কেয়ার’ থাকবে না।
[আরও পড়ুন: জয় ইউনেস্কোর জয়, বাংলায় যা পুজো হয়, দেশের কোথাও হয় না]
অন্তত সেইটুকুও যাতে হয়, সেই লক্ষ্যে আজ, বুধবার থেকে রাহুল শুরু করছেন তাঁর বহুচর্চিত ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’। কংগ্রেসের (Congress) ঘোষণা ঠিক থাকলে এবং নেতাদের দাবির অন্যথা না হলে পাঁচমাস ধরে রাহুল হাঁটবেন ৩,৫০০ কিলোমিটার পথ। কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত ১২ টি রাজ্য ও দু’টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পাড়ি দেওয়ার মধ্য দিয়ে ভারত-দর্শনের পাশাপাশি তিনি ঘোচাতে চাইবেন ‘বিভেদ ও ঘৃণার রাজনীতি’, যা নরেন্দ্র মোদির বিজেপি ভারতে পাকাপাকিভাবে প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট।
যাত্রাপথ কারা ঠিক করেছেন এবং কোন যুক্তিতে- সেটা অবশ্য এক স্বতন্ত্র প্রশ্ন। কেননা, দেশের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বুড়ি ছোঁয়ার মতো হলেও যাত্রীদের পদচিহ্নই পড়বে না। যেমন, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার-সহ পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চল। প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি এই রাজ্যগুলোকে কংগ্রেস এখন থেকেই খরচের খাতায় ফেলে দিল? না কি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য জোটসঙ্গীদের করুণা ও বদান্যতার প্রতি আস্থা রেখে নিজেদের আবডালে রাখার এ এক ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা? উত্তর নেই। ছত্তিশগড়েও রাহুল যাচ্ছেন না। ওই রাজ্যে দলের অবস্থান নিয়ে তাহলে তিনি কি এতটাই নিশ্চিন্ত যে, মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেলের কাঁধে হাত রাখার দরকার নেই মনে করছেন? কিন্তু সেটাই বা কেমন যুক্তি? বোধগম্য হচ্ছে না। সবচেয়ে বড় বিস্ময়, যাত্রী হিসাবে রাহুল গুজরাত যাচ্ছেন না! অথচ, ঘৃণা ও ভয়ের আবহ সৃষ্টির আঁতুড় তো ওটাই? তিনি যাচ্ছেন না হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডে। এই দুই রাজ্যও বিজেপির দখলে, যেখানে এখনও একনম্বর বিরোধী-শক্তি কংগ্রেস! এই রাজ্যগুলো থেকে ঘৃণার বিরামহীন উদ্গিরণ হয়েই চলেছে। গুজরাত ও হিমাচল প্রদেশে আবার বছর-শেষে ভোট। এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যকে ছাড় দিয়ে ভারত কি জোড়া যাবে? এই প্রশ্নের জুতসই জবাব কেউ দিতে পারছে না। অথচ চিরন্তন সত্য এটাই, ফাঁকিবাজিতে মহৎ কাজ হয় না। উলটে নিজেকেই ফাঁদে পড়তে হয়।
এত কিছু বিবেচনা সত্ত্বেও বলা দরকার, অনেক দিন পর রাহুল কংগ্রেসকে কিছুটা নড়তে-চড়তে বাধ্য করেছেন। সেটা কতটা আন্তরিক, কতটা বাধ্যবাধকতামূলক, কতটা প্রকৃত তাগিদ, কতটা ফঁাকিবাজির রাজনীতি, কতটা নিছকই নিজেকে সক্রিয় দেখানোর ‘অপটিক্স’, বলা কঠিন। বারবার রাহুল ব্যর্থ হয়েছেন, বারবার তাঁকে নতুন মোড়কে উপস্থাপনের চেষ্টা হয়েছে। এটাও তেমনই আর-একটা প্রচেষ্টা কি না, বলা কঠিন। যদিও বিজেপির দৃঢ় অভিমত তেমনই।
মধ্য ভাদ্রের ভ্যাপসা গরমে রামলীলা ময়দানের রবিবাসরীয় চালচিত্র দেখে মনে হচ্ছিল, উপস্থিত সবাই রাহুলকে সভাপতি দেখতে মুখিয়ে আছে। আয়োজন যেন তারই নান্দীমুখ। অনুমানটুকু ভ্রান্ত ছিল না। কেননা, গোটা তল্লাট জুড়ে সেই দাবি ও আরজি পোস্টারে, ব্যানারে, প্ল্যাকার্ডে, ফ্লেক্সে নানাভাবে ঘোষিত। রাহুল তবুও নিজেকে হেঁয়ালিতে মুড়ে রেখেছেন। এতে তাঁর সম্পর্কে সাধারণের তো অবশ্যই- দলেরও এক বড় অংশের মনে নানা ধরনের প্রশ্ন ও সন্দেহ জন্ম নিচ্ছে। তাঁর এই ‘জলে আছি জলে নেই’ গোছের ‘ফিফটি-ফিফটি’ অবস্থান বিজেপিকে নিশ্চিন্ত নিশিযাপনে সাহায্য করছে। তিনি অবুঝ ও বুদ্ধিহীন তো নন। কিন্তু তা সত্ত্বেও সভাপতিত্বের প্রশ্নে কেন স্পষ্ট করে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলছেন না, সেই বিস্ময় কংগ্রেস তো বটেই, সমগ্র বিরোধী অবস্থানকেই দুর্বল করছে।
রামলীলা ময়দানে রাহুলের ভাষণও আমাকে অবাক করল। গত লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকে যে-যে বিষয়ে, যে-ঢঙে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, তাঁর নেতৃত্বাধীন বিজেপি এবং সংঘ পরিবারকে আক্রমণ করে আসছেন, রোববারেও দেখা গেল সেই এক কথা, এক যুক্তি, এক অভিব্যক্তির পুনরুক্তি। মোদি ও তাঁর সরকারকে বারবার ‘হাম দো, হামারা দো’ বলে ঠোকা দেওয়া, আম্বানি-আদানিদের ভিলেন খাড়া করা, প্রধানমন্ত্রীকে শিল্পবান্ধব ও কৃষক-শ্রমিক বিরোধী বলে জাহির করা, ঘৃণার উৎসমুখ বলে অভিহিত করা, সমাজকে হিন্দু-মুসলমানে বিভক্ত করার অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এতদিন কংগ্রেসকে রাজনৈতিক লাভের মুখ দেখায়নি। সেই এক অস্ত্রের প্রয়োগ পরবর্তী ভোটে কেন ফলদায়ী হবে, তার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা কিন্তু রাহুল শোনাতে পারেননি। তাঁর ভাষণে নতুনত্ব শুধু একটাই। দুই ভিন্নমুখী বিচারধারার লড়াইয়ে এই প্রথমবার তাঁকে বলতে শুনলাম- ‘সব বিরোধীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমরা বিজেপিকে হারাব।’ সবাইকে নিয়ে চলার এই আহ্বান এতদিন এভাবে অনুচ্চারিত ছিল।
লক্ষণীয়, ইউপিএ আমলে নাগরিক সমাজের যারা সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির বিরোধিতা করেছিল, যেসব মানবাধিকার রক্ষাকারী সংগঠন প্রতিবাদী হয়েছিল, বেসরকারি সংগঠন সরকারের কাজেকর্মে অসন্তুষ্ট ছিল, দুর্নীতি-বিরোধী আন্দোলনের শরিক হয়েছিল- তাদের অনেকে পরবর্তী শাসকের আদর্শ, নীতি ও বিভাজনের রাজনীতিতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’ সফল করতে রাহুলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে! বিপদ কী কঠিন, সমস্যা কত তীব্র, আশঙ্কা কতখানি প্রবল, প্রতিপক্ষ কী বিপুল শক্তিধর- সেই বোধোদয় তাদের হয়েছে বলেই দেশের ছোট-বড় প্রায় ১৫০ ব্যক্তি, বুদ্ধিজীবী, সংগঠন ও ইউনিয়ন রাহুলের পাশে সমর্থনের ডালি নিয়ে উপস্থিত।
অরুণা রায়, মেধা পাটকর, সইদা হামিদ, শরদ বেহর, পি. ভি. রাজাগোপাল, বেজওয়াদা উইলসন, দেবানুর মহাদেব, জি. এন. ডেভি কিংবা যোগেন্দ্র যাদবরা সময়ের প্রয়োজন মেনে ‘একদর্শী কর্তৃত্ববাদ ও স্বৈরতান্ত্রিকতা’-র বিরুদ্ধে এক হয়ে গড়ে তুলতে চাইছেন এক রামধনু আন্দোলন। এঁরা জানেন, বোঝেন ও উপলব্ধি করেছেন, একা পথ চলার দিন শেষ। এখন প্রয়োজন সমষ্টিগত ভাবনার। সেই বিশ্বাস নিয়ে এগোলে সাফল্য এলেও আসতে পারে।
মজরুহ সুলতানপুরীর অমর হয়ে যাওয়া শায়রির সেই প্রথম দু’টি লাইন কি মনে পড়ছে? ‘ম্যায় আকেলা হি চলা থা/ জানিব-এ-মঞ্জিল মগর/ লোগ সাথ আতে গ্যয়ে/ অউর কারবাঁ বনতা গ্যয়া।’ এই কথাই রবীন্দ্রনাথ অন্যভাবে শুনিয়েছিলেন‘একলা চলো রে’ আহ্বানে। ‘ভাঙা’-র বিরুদ্ধে ‘গড়া’-র এই নতুন পথ চলায় রাহুল আজ একা নন। দেখা যাক, সঙ্গী-সহ পদযাত্রা শেষ বিচারে ‘কারবাঁ’ হয়, না কি নিস্তেজ তুবড়ির মতো আশাহীনতায় আরও একবার মাথা নোয়ায়।
[আরও পড়ুন: এই আছি, এই নেই, ঠিক কী চাইছেন রাহুল গান্ধী?]
সর্বশেষ খবর
-
ওবিসি জটেই ঝুলে! ৩১ আগস্টের মধ্যে হচ্ছে না ২৬ হাজার শূন্যপদে নিয়োগ, জানিয়ে দিল এসএসসি
-
ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার, অভিষেকের ক্রিকেট কেরিয়ার কি শেষ? কী ভাবছে দিল্লি ক্যাপিটালস, সিএবি?
-
দাড়িভিটে নিহত ছাত্রদের সম্মান জানাতে উদ্যোগী এবিভিপি, ২০ সেপ্টেম্বর ভাষা দিবস পালনের ডাক
-
নিউটাউনের পর পূর্বস্থলী! ঘরে তরুণীর দেহ, জেরায় অসঙ্গতি থাকায় আটক লিভ-ইন সঙ্গী
-
FCRA বিল নিয়ে তাড়াহুড়ো নয়, দরকারে ‘ঠান্ডা ঘরে’ পাঠাতে রাজি সরকার! দাবি সূত্রের