Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ৫ জুন ২০২৬
চিরঘুমে রাহুল অরুণোদয়
Rahul Arunoday Banerjee

‘চিরদিনই তুমি যে…’ যিনি, তিনিই ‘কলোনি কল্লোলিনী’র লেখক? সূর্যাস্তে বিভ্রান্ত করে গেলেন অরুণোদয়

লেখক অরুণোদয় প্রথম থেকেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি রাজ চক্রবর্তীর মশলা ছবির নায়ক রাহুল নন। তাই পরিচিত নামের সঙ্গে পিতৃদত্ত নাম ব্যবহার। প্রথম বই ‘রাহুলের স্ক্র্যাপ বুক’ থেকেই। এই চিন্তাশীল গদ্যশিল্পী সংবাদ প্রতিদিনের নিয়মিত লেখক ছিলেন। তাঁর মণিমুক্তের মতো লেখা ছড়িয়ে রয়েছে 'রোববার' পত্রিকা, 'রোববার ডট ইন' এবং 'শারদীয়া সংবাদ প্রতিদিনে'র পাতায় পাতায়।

Advertisement
কিশোর ঘোষ
কিশোর ঘোষ

শেষ আপডেট: মার্চ ৩০, ২০২৬, ১৩:৪৭

link
কিশোর ঘোষ
কিশোর ঘোষ

শেষ আপডেট: মার্চ ৩০, ২০২৬, ১৩:৪৭

options
link
‘চিরদিনই তুমি যে…’ যিনি, তিনিই ‘কলোনি কল্লোলিনী’র লেখক? সূর্যাস্তে বিভ্রান্ত করে গেলেন অরুণোদয় zoom
আমাদের জন্য কঠিন প্রশ্ন রেখে গেলেন রাহুল।

১৯৭৭ সাল এক কান্না লিখেছিল। সেই কান্নার নাম কেয়া চক্রবর্তী। শুটিং চলাকালীন গঙ্গায় ডুবে মৃত্যু হয়েছিল তৎকালীন মঞ্চ ও চলচ্চিত্রের দাপুটে অভিনেত্রীর। প্রায় পাঁচ দশক পর নতুন কান্নার নাম রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় (Rahul Arunoday Banerjee)! ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ নামের একটি ধারাবাহিকের শুটিং করতে গিয়ে তালসারির সমুদ্রে ডুবে প্রয়াত হলেন ৪৩ বছরের অভিনেতা। সমুদ্রের যে নোনতা জলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু হল রাহুলের, তার সঙ্গে তো আশ্চর্য মিল অশ্রুর! চৈত্রর রবিবাসরীয় সন্ধ্যায় আবেগবিহ্বল তথা চিন্তাশীল বাঙালির চোখ থেকে ঝরে পড়ছে ওই— তালসারির সমুদ্রের জল! কারণ, রাহুলকে কেবল থিয়েটার-সিনেমা-সিরিয়ালের অভিনেতা বললে, সেলিব্রেটির ঝকঝকে কিন্তু স্যাঁতস্যাঁতে কুয়োতে আবদ্ধ রাখলে ভয়ংকর ভুল হবে। তবে কে ছিলেন রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়?

অনেকেই ‘স্বর্ণযুগে’র অভিনেতা অনিল চট্টোপাধ্যায়ের (চ্যাটার্জি) সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতেন রাহুলকে। চেহারার মিল দেখে। এই নিয়ে রাহুল নিজেও ঠাট্টা করতেন। এমনকী মৃত্যু নিয়েও ঠাট্টা! ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’-এর ‘নায়কে’র পছন্দের অভিনেতাদের মধ্যে ছিলেন অনিল চ্যাটার্জির সময়েরই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এঁদের অনেক দূরের সময়ের হয়েও বাঙালিয়ানায় মিল ছিল রাহুলের সঙ্গে। সত্যজিৎ রায়ের প্রিয় অভিনেতার মতোই ছোটবেলা থেকে অভিনয়ের পাশাপাশি লেখার ঝোঁক। ২০১৯ সালে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘কলোনি কল্লোলিনী’ প্রকাশের সময় মজা করে লেখক-অভিনেতা বলেছিলেন, ‘‘বাঙালির গোঁফ গজালেই কবিতা পায়। আমারও পেয়েছিল। তবে কবিতা হল না, গদ্য হল।’’

Advertisement

অনেকেই ‘স্বর্ণযুগে’র অভিনেতা অনিল চট্টোপাধ্যায়ের (চ্যাটার্জি) সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতেন রাহুলকে। চেহারার মিল দেখে! এই নিয়ে রাহুল নিজেও ঠাট্টা করতেন। এমনকী মৃত্যু নিয়েও ঠাট্টা! 

লেখক অরুণোদয় প্রথম থেকেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি রাজ চক্রবর্তীর মশলা ছবির নায়ক রাহুল নন। তাই পরিচিত নামের সঙ্গে পিতৃদত্ত নাম ব্যবহার। প্রথম বই ‘রাহুলের স্ক্র্যাপ বুক’ থেকেই। এই চিন্তাশীল গদ্যশিল্পী সংবাদ প্রতিদিনের নিয়মিত লেখক ছিলেন। তাঁর মণিমুক্তের মতো লেখা ছড়িয়ে রয়েছে ‘রোববার’ পত্রিকা, ‘রোববার ডট ইন’ এবং ‘শারদীয়া সংবাদ প্রতিদিনে’র পাতায় পাতায়। যে মানুষটা পেশার কারণে ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন, তিনিই গুরু দত্তের সুপারফ্যান, কবির সুমনকে গুরু মানতেন, বিভূতিভূষণ থেকে সত্যজিৎ রায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ছিল তাঁর জীবনপাঠের জরুরি অংশ। এবং আলগোছে তৈরি হচ্ছিল মগজধোলাই থেকে বেরিয়ে আসা চিন্তাশীল বিশুদ্ধ বাঙালি মগজ। ‘বিশুদ্ধ’ শব্দটি ভেবেচিন্তা বসানো।

Death of Rahul banerjee is a loss for bengali cinema and literature

সত্যজিৎ-উত্তমের কাল্ট ছবি ‘নায়ক’-এ কামু বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত চরিত্রটি বলেছিল, “অল্প বয়সে সকলেই একটু বাঁ দিকে ঘেঁষে কিনা…।” ১৯৮৩ সালের ১৬ অক্টোবর বিজয়গড় কলোনির হালকা লাল গোধূলী রঙের আকাশের নিচে জন্ম রাহুলের। নাকতলা হাইস্কুল, আশুতোষ কলেজের সিঁড়ি ডিঙোতে ডিঙোতে ক্রিকেটপাগল ছেলেটা বাবার নাট্যদলে প্রথম অভিনয় করে। তারপর অসংখ্য নাটক, সিনেমা, ধারাবাহিক, যাত্রা। প্রেম, বিচ্ছেদ, সম্পর্ক ভাঙা ও গড়া। মানুষের মতো সাদা-কালো, কারণ তিনি তো রোদচশমা পরা সেলিব্রেটি নন। বরং ‘সহজকথা’-এর পডকাস্টের মতো সাধাসিধে একটা জীবন। অসংখ্য প্রশ্ন আর উত্তরের অপেক্ষায় থাকা প্রাণ। যে জীবনে ভুল আছে, মাদক আছে, আবার চকলেট, প্রেম, কলোনি জীবন, নয়ের দশকের মায়াবী বেড়ে ওঠা নিয়ে পাখি ওড়ার মতো মিষ্টি গদ্যশৈলিও আছে।

এই তো ক’দিন আগে পরিচালক সুব্রত সেনের পডকাস্ট ‘মুখে মুখে’তে এসে আত্মপ্রদর্শনী সর্বস্ব সময়টাকে গাল দিচ্ছিলেন রাহুল। কীভাবে ‘ভোগবাদ’ আর ‘পুঁজিবাদ’ গিলে ফেলছে মানুষকে, যে অন্ধকার থেকে রক্ষে নেই লেখক-অভিনেতারও! সাহিত্য, সিনেমা, নাটক বাঙালির সবকিছুই বুঝি অস্তাচলে! রাজনীতিও আছে এই ক্ষয়িষ্ণু ব্রাকেটে। সেই কারণেই বামপন্থাকে সমর্থন করেও ‘জনতাকে ফাঁকি দিয়ে’ রাজনৈতিক দলে নাম লেখানো হল না তাঁর। ভাগ্যের ফেরে বাঙালির এই সূর্যাস্তকে ছুঁতে হল না রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তার আগেই তাঁর প্রিয় ক্রিকেটার লেগস্পিনের রাজা শেন ওয়ার্নের মতোই আচমকা স্টেডিয়ামে বাইরে চলে গেলেন!

কঠিন প্রশ্ন রেখে গেলেন আমাদের জন্য, পঞ্চাশ বছর পরেও নতুন কান্নার জন্ম হতে পারে টলিউডে! শুটিং চলাকালীন মৃত্যু হতে পারে একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেতার। রাজনীতি নিয়ে যতটা ব্যস্ত বঙ্গীয় চলচ্চিত্র সমাজ, ততখানি ব্যস্ততা নেই অভিনেতা-কলাকুশলীদের সুরক্ষার বিষয়ে! ফলে আচমকা মৃত্যু হতেই পারে এক বহুমুখী বাঙালি প্রতিভার! জন্ম হতে পারে এক নতুন কান্নার। যার নাম রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.