২৮ অগ্রহায়ণ  ১৪২৬  রবিবার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ 

Menu Logo মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও বাঁকা কথা ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

রাজনৈতিক পেশিশক্তির আস্ফালন। জলকষ্ট। বিশুদ্ধ বাতাসের অভাব। ‘ল্যায়লা’-র ডিসটোপিয়া আমাদের অনেকের কাছেই কঠোর বাস্তব। দীপা মেহতা-হুমা কুরেশির এই নেটফ্লিক্স অরিজিনাল দেখতে দেখতে তাই শিউরে উঠতে হয়। লিখছেন সোহিনী সেন।

নেটফ্লিক্স অরিজিনাল ‘ল্যায়লা’ দেখতে দেখতে বারবার ‘লায়লা এম.’-এর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। উচ্চারণগত সাযুজ্যের জন্যই হয়তো বা। দ্বিতীয় ছবিটিও নেটফ্লিক্সেই দেখা। দু’বছর আগে মিজকে দে জং পরিচালিত এই ছবিটিতে দেখানো হয়- ধর্মীয় আচার-শুদ্ধতা রক্ষার তাগিদে পশ্চিমি আধিপত্যকায়েমিকে বয়কট করে এক ডাচ-মুসলিম তরুণী। পাছে বিচ্যুত হয়ে পড়তে হয় নিজের সংস্কৃতি থেকে- এই শঙ্কায় ত্যাগ করে আমস্টারডামবাসী তার উদারমনা পরিবারকে। সেই জীবনকে। ‘শিকড়ের সন্ধানে’ বরের সঙ্গে পাড়ি জমায় জর্ডনে। বর কট্টরপন্থী সংগঠনের রিক্রুটার ও অ্যাক্টিভিস্ট। অচিরেই সুদূর পশ্চিম থেকে পূর্বে আসা মেয়েটির মোহভঙ্গ হয় কট্টরপন্থা ও পুরুষতন্ত্রের শ্বদন্ত দেখে। নিজের ভুল বুঝতে পারে সে। তারপর শুরু হয় আমস্টারডাম ফেরার কঠোর সংগ্রাম।

পশ্চিমে বসবাসকারী মুসলিম পরিবারের ক্রাইসিস স্বচ্ছভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন জং। ঘটনাটা কংক্রিট বাস্তব বলে ডিসটোপিয়ান ফিল্ড নির্মাণ করতে হয়নি তাঁকে। প্রয়োজনও ছিল না। কিন্তু দীপা মেহতা, শঙ্কর রমণ, পবন কুমার নির্দেশিত ‘ল্যায়লা’র ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্য। দেশের বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁদের অদূর ভবিষ্যতের ভাসা ভাসা ইঙ্গিত দিয়েছে। সে ইঙ্গিতের উপর ভর ও ভরসা করে তাঁরা বানিয়ে ফেলেছেন নিয়ার ফিউচার ডিসটোপিয়া। আর কে না জানে, ‘ডিসটোপিয়া’ (বা ‘ইউটোপিয়া’) যেহেতু বাস্তব হইতে হইতেও আদতে বাস্তব নহে, তাই তা নিয়ে শিল্প নির্মাণে নির্মাণকারীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় খানিক কমে যায়। কমে ঝক্কিও। ‘ল্যায়লা’ও জমিয়েছে পুঞ্জীভূত প্রশ্নের দলা। সেইসব উত্তরহীন প্রশ্নে পরে আসছি। আগে ছবিটির একটুকরো পরিচয় দিই।

এম.জে. আকবরের ছেলে প্রয়াগ আকবরের লেখা বই ‘ল্যায়লা’। তা অবলম্বনেই ওয়েব সিরিজটি। নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে গত ১৪ জুন। পটভূমি ২০৪৭ সাল। ‘আর্যবর্ত’ নামের একটি দেশ। স্থান না বলে ‘দেশ’-ই বলব যেহেতু শুরুতেই গোদা গোদা অক্ষরে ডিসক্লেমার দেওয়া- ‘Nation: Aryavarta’. স্বাধীনতার একশো বছর পর আমাদের দেশ (নাম বদলে) সম্ভাব্য কীরকম ‘হয়ে উঠতে পারে’ তার একটা পার্সপেক্টিভ দিচ্ছেন পরিচালকরা।

[ আরও পড়ুন: দুর্দান্ত ফিগার ধরে রাখবেন কী করে? যোগা দিবসের আগে টিপস শিল্পার ]

সেখানে হিন্দু মহিলাদের ভিন্ন জাত বা ধর্মে বিয়ে অপরাধ গণ্য হয়। সেই অপরাধই করেছিল শালিনী (হুমা কুরেশি)। শাস্তিস্বরূপ শালিনীর মুসলমান স্বামী রিজওয়ানকে (রাহুল খান্না) হত্যা করা হয়। শালিনীকে নিয়ে যাওয়া হয় এক সংশোধনাগারে। সেখানকার জীবন পরাধীনতার। বন্দিত্বের। দাসীবৃত্তির। হাতে আর্যবর্তের লোগোর ট্যাটু। পরনে লাল পোশাক। গলায় আর্যবর্তের নির্মাণপুরুষ পি.যোশির ছবিওয়ালা রুদ্রাক্ষের হার। পুরুষদের বুট পরিষ্কার, তাদের এঁটো পাতের উপর দিয়ে গড়িয়ে যাওয়ার মতো কাজ করতে দেখা যায় তাকে। আর ক্ষণে ক্ষণে ‘জয় আর্যবর্ত’ উচ্চারণ। এইভাবে বিশুদ্ধিকরণের পথে ধাপে ধাপে এগিয়ে যায় শালিনী, পূজা, কণিকারা। অন্তিম বিশুদ্ধিকরণ পরীক্ষার জন্য বাছা হয় কয়েকজনকে। তারা পাস করলে ফিরে যেতে পারে পরিবারের কাছে। ফেল করলে সে আশা সারা জীবনের মতো ভুলে যেতে হয়। ঠাঁই হয় শ্রমাগার। আর মিশ্ররক্তের সন্তানদের মতো ঘৃণ্য জীবকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ‘প্রোজেক্ট বালি’-তে। মেয়ে ল্যায়লার কী হল? তাকে খুঁজতে শালিনীর যে জার্নি, তা-ই ফুটে উঠেছে ছয় এপিসোডের ওয়েব সিরিজটিতে। সেই জার্নিতে শালিনীর সঙ্গী হয় প্রায় তার সন্তানেরই বয়সি নিচু জাতের এক অনাথ মেয়ে: রূপ।

যোশির স্বপ্নরাষ্ট্র আর্যবর্ত হিটলারের জার্মানের মতোই বিশুদ্ধতার বাণী জপে। রক্তের বিশুদ্ধতা। জাতের বিশুদ্ধতা। ধর্মের বিশুদ্ধতা। আলাদা আলাদা জাত ও ধর্মের মানুষের জন্য উচুঁ উঁচু পাঁচিল ঘেরা দেয়াল। সেখানে যে যার মতো থাকবে। নো মিক্সিং ইজ্‌ এক্সপেক্টেড অর অ্যাপ্রুভড। অনেকটা বার্লিন ওয়াল বা ‘ওয়াল অফ শেম’-এর মতো। সংশোধনাগারটিও তদনুরূপ। মনে করিয়েছে নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পকে। ‘জয় আর্যবর্ত’ মনে করিয়েছে ‘হেইল হিটলার, হেইল জার্মান’-কে (সাবটাইটেলেও তা-ই লেখা ছিল)। মোদ্দা কথা, বর্তমান রাজনৈতিক পেশিশক্তির আস্ফালনে সিঁদুরে মেঘ দেখেছেন পরিচালকরা। তার সঙ্গে রয়েছে তীব্র জলাভাব, বিশুদ্ধ বাতাসের অভাব। এইসবের ভিত্তিতে একটা ভয়াল, রক্ত ঠান্ডা করা, হাড়হিম সম্ভাব্য ভবিষ্যতের দৃশ্যকল্প তুলে ধরতে সফল হয়েছেন।

ওয়েব সিরিজটির শক্তিশালী অংশ হল: জলকষ্টে ও বিশুদ্ধ বাতাসের অভাবে ফুটে ওঠা হাহাকার, মাথা কুটে মরার দৃশ্যকল্পগুলি। ওয়েব সিরিজেও প্রকৃতির এই রোষচিত্র পারিপাট্যে বুনেছেন পরিচালকত্রয়। চড়া দামে ওয়াটার এটিএম থেকে জলের পাউচ কেনা, বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে তার ব্যবহার, কাদাবৃষ্টি, কাদাজল থেকে জলপানের চেষ্টা, শুদ্ধ বাতাসের অভাবে রেসপিরেট্রনিক-অক্সিজেন মাস্কের ব্যবহার, দোকানে দোকানে সেগুলোর ঝুলে ঝুলে থাকা- পরিবেশের এমন রণংদেহি রূপ গায়ে কাঁটা দেওয়ায়। যেন ডুম’স ডে জাগ্রত দ্বারে। এইখানটায় কোথায় যেন সূক্ষ্ম বুনটে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে বাস্তব ও ডিসটোপিয়া।

তবে এগুলো ছেড়ে দিলে কয়েকটা বিষয় ও প্রশ্ন জট লাগিয়েছে ভাবনায়। কীরকম?

১. ‘সালাম বম্বে’, ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’-এর মতো বস্তিকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা দীপার ডিসটোপিয়ান ফিউচারের আরেকটি দিক। এখনকার আর্থ-সামাজিক গতিজাড্যের বিচারে দেখতে গেলে ২০৪৭-এ তো বস্তিজীবন বিলুপ্ত হওয়ার কথা। দেশে যে-হারে বস্তি উচ্ছেদ করে, পুরনো বাড়ি ভেঙে স্কাইরাইজ উঠছে, তাতে ১৮ বছর বাদে ‘বস্তি’ শব্দটার অস্তিত্ব খানিক অবাস্তব নয় কি?

২. এক হয় শালিনীদের মতো উচ্চবিত্ত পরিবার, নয় বস্তি-খুপরি। মধ্যবর্তী কোনও শ্রেণি নেই। মানে, একটা ক্লাস পুরোটাই অবসোলিট। এটা আদতে সম্ভব?

৩. যে রাষ্ট্রে টাকা ফেলে ওয়াটার এটিএম থেকে জলের পাউচ নিতে হচ্ছে, সব কিছুতে এত কঠোরতা অবলম্বন হচ্ছে, সেখানে অবৈধ জল কিনে (শালিনী-রিজওয়ানের বাড়িতে) সুইমিং পুল তৈরি করাটা কোনওভাবে ‘অন্যায়’ হিসাবে দেখানো হল না কেন?

৪. যে দেশে ‘জয় আর্যবর্ত’ স্লোগানে তাজমহল ধূলিসাৎ করা হয়, দীপার কল্পনা অনুসারে সেখানে হোর্ডিংয়ে হোর্ডিংয়ে ইংরেজি, হিন্দির পরে লেখা উর্দু ভাষাটি তো কালিমালিপ্ত হওয়া সঙ্গত। অথচ তা হয় না।

৫. শাসকবিরোধীদের ডেরায় সরকারের তরফে বোমা মারা হয়। তবে তা একেবারে গুঁড়িয়ে ফেলা হয় না। বিশ্বাস করা কষ্টসাধ্য।

৬. ‘মিশ্রিত’ সন্তানদের গন্তব্য ‘প্রোজেক্ট বালি’র মতো ভয়ংকর কিছু একটা জিনিস। কিন্তু কী? গোটা ওয়েব সিরিজ জুড়ে তার উল্লেখ নেই।

৭. সঠিক কীসের ভিত্তিতে শুদ্ধিকরণের অন্তিম পর্যায়ের জন্য নির্বাচিত হয় কেউ? কোন নিক্তিতেই বা ঠিক হয় কেউ শুদ্ধিকরণের যোগ্য? গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে মারাই বা কীসের ভিত্তিতে হয়?

৮. হলোগ্রাফিক প্রোজেক্টেড টিভি, ফোন শালিনীদের বাড়িতে। মোবাইলে স্ক্যান করা যাচ্ছে হাতের ট্যাটু বা কোনও সদ্যোজাত ‘মিশ্রিত’ কি না। অর্থাৎ, বিজ্ঞান তার কাঙ্ক্ষিত জয়রথ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এদিকে বস্তিতে তার সামান্য চিহ্নটুকু নেই। সম্ভব?

[ আরও পড়ুন: ‘কৃষ্ণকলি’ শেষ হয়ে যাক ভাবতেই চাই না: তিয়াশা ]

ডিসটোপিয়া বাস্তবাশ্রিত করাল ভাবনা। ইমেজারি। তাই শিল্পী যখন আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের নিরিখে সেই ডিসটোপিয়ার গাঁথনি গাঁথছেন, তখন দর্শক নূ্যনতম বিশ্বাসযোগ্যতা দাবি করে বইকি (যেহেতু নিরিখ-টা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ও গম্ভীর বিষয়)। দীপা-শঙ্কর-পবন ছবি তো বানিয়ে ফেলেছেন তড়িঘড়ি, তবে দর্শকের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের সূত্রগুলো জোরালো করে উঠতে পারেননি। সংঘবদ্ধ তো নয়ই। ‘তারে আমি চোখে দেখিনি তার অনেক গল্প শুনেছি…’ জাতীয় ব্যাপার হয়ে রয়ে গিয়েছে ‘ল্যায়লা’।

হুমা কুরেশিকে ভাল লাগে বলেই সময় করে ‘ল্যায়লা’ দেখতে নেটফ্লিক্স খুলে বসেছিলাম। উল্লেখযোগ্য লাগল না অভিনয়। ভানু চরিত্রে সিদ্ধার্থ ঠিকঠাক, তবে আহামরি নন। গুরুমার ভূমিকায় আরিফ জাকারিয়া বরং খানিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সংশোধনাগার তথা আর্যবর্তের অন্যতম রক্ষক হিসাবে তাঁর নির্দেশ, বাচনভঙ্গি, শান্ত অথচ হিংসাত্মক চাউনি মনে থেকে যাবে। আর মনে থাকবে ল্যায়লাকে খোঁজার জার্নিতে রূপের সঙ্গে শালিনীর কাটানো মুহূর্তগুলো। রূপের চুল বেঁধে দেওয়া; ‘ল্যায়লা মুঝসে সুন্দর হ্যায় কেয়া?’– রূপের এই প্রশ্নের উত্তরে শালিনীর স্পষ্ট ‘না’ বলা; লেবার ক্যাম্পে রূপের জন্য শালিনীর চোখের জল ফেলা। ডিসটোপিয়ার কালোয় তা যেন একফোঁটা রোদ্দুর। বা রোদ্দুরের গনগনে আঁচে একছিলিম শান্তিবারি। স্থিত। সমাহিত।

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং