বিশ্বদীপ দে: ম্যাকলাস্কিগঞ্জে কি এখন বৃষ্টি পড়ছে? মেঘ ঝুঁকে আসা সবুজ অরণ্যের শরীরে গড়িয়ে নামছে নগ্ন নির্জন বৃষ্টিরেখা? কে সেই হিসেব রাখবে এবার থেকে? সাতসকালে সহকর্মীর ফোনে বুদ্ধদেব গুহর (Buddhadeb Guha) মৃত্যুসংবাদ শুনে প্রথমেই এই কথাটা মনের কোণে ভেসে এল। সেই সঙ্গে মনে পড়ল মেঘাচ্ছন্ন এক গ্রীষ্মের দুপুরের কথাও। যেদিন চির রূপবান মানুষটার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। কাছ থেকে দেখেছিলাম বাঙালি রোম্যান্টিকতার মূর্ত এক চেহারাকে।
তখন তিনি উনআশিতম জন্মদিনের দোরগোড়ায়। এর কয়েক বছর আগেই দেখেছিলাম তাঁকে। শান্তিনিকেতনে। বইয়ের দোকান ‘সুবর্ণরেখা’র সামনে। তাঁকে ঘিরে পাঠিকারা। সকলের হাতে রং। সেই রং ততক্ষণে তাঁর গালেও লেগেছে। বুদ্ধদেবের মুখে এক আশ্চর্য হাসি।
[আরও পড়ুন: Buddhadeb Guha: বন্ধুর পিঠে খাওয়ার গল্প শোনালেন শীর্ষেন্দু, স্মৃতিমেদুর বাণী বসু, শংকরও]
সেই দৃশ্য থেকে জাম্প কাট টু তাঁর বেডরুম। ভিড়ের আড়াল ছিল না সেখানে। ছোটবেলার ‘গুগনোগুম্বারের দেশে’ কিংবা তারুণ্যের ‘খেলা যখন’-এর রচয়িতার একদম সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। আর অবাক হয়ে দেখেছিলাম আমার সমস্ত আড়ষ্টতা আর অস্বস্তি কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে ভেসে যাচ্ছে তাঁর সহজ, অনায়াসগম্য ব্যক্তিত্বের স্পর্শে। দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছিল প্রায় ঘণ্টা দেড়েক। কেবল তিনি আর আমি। মাঝে মাঝে কাজের লোক এসে আপেলের জুস আর নানা রকম মিষ্টি দিয়ে গিয়েছিলেন।

কেমন দেখেছিলাম তাঁকে? একটা কথা প্রথমেই মনে হয়েছিল। চেনা বাঙালির পরিচিত খোপে এই মানুষটিকে আটকানো মুশকিল। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ছবিতে শর্মিলা ঠাকুরের চরিত্রটি রুপোলি পর্দার নায়কের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল। একই সঙ্গে একজন মানুষের বহু গুণের অধিকারী হওয়া যে একটা অবাস্তব ব্যাপার সেবিষয়ে নিঃসংশয় ছিলেন তিনি। বুদ্ধদেব গুহ কিন্তু তেমনই একজন মানুষ। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, সুগায়ক, বন্দুকের নিশানা অব্যর্থ, ছবি আঁকার হাতও ঈর্ষণীয়। আর সর্বোপরি তাঁর কলমের জাদু তো রয়েছেই। সেই সঙ্গে ওই রূপ। সব মিলিয়ে এমন এক প্যাকেজ, যা চিত্রনাট্যেই মানায়। বাস্তব জীবনে অবিশ্বাস্য মনে হয়।
[আরও পড়ুন: চালকের আসনে বসে চরম গাফিলতি! ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলেন Madhumita Sarcar]
এমন এক নায়কোচিত জীবন। অথচ স্ত্রী ঋতু গুহর মৃত্যুর পর সেই বিজয়ী চরিত্রেও এসে লেগেছিল ট্র্যাজিক রং। দেখেছিলাম স্ত্রীর কথা বলার সময় বারবারই তাঁর চোখ চলে যাচ্ছে দেওয়ালে টাঙানো বিরাট ছবিটার দিকে। বলেছিলেন, ”জন্মদিনে কত উপহারই তো পেয়েছি। কিন্তু বিয়ের আগে ঋতু একবার একটা মোজা উপহার দিয়েছিল। চমৎকার মোজা! যেমন সুরুচি সম্পন্ন রং, তেমনই লাইল্যাকের উপরে কালো স্কোয়ার নকশার অসাধারণ রং। তখন ওদের বাড়ির অবস্থা তেমন ভাল নয়। মোজাটাও তাই খুব দামি ছিল না। কিন্তু দাম না থাকলেও সেই উপহারের ভার ছিল। ওটা মাথায় রেখেই লিখেছিলাম ‘উপহার ভরে ভরিয়ে দিয়েছ তুমি, বারণ না মেনে আমার জন্মদিনে, সাধ্য কী আছে প্রতিদানে কিছু দেব, আকণ্ঠ আমি নিমগ্ন তব ঋণে। আমার ‘ঋভু’ উপন্যাসে আছে।”
দেখেছিলাম বলতে বলতে তাঁর চোখে যেন ছলছলে একটা ভাব। বললেন, ”আজ থেকে তিপ্পান্ন-চুয়ান্ন বছর আগের কথা। তখনও আমাদের বিয়ে হয়নি। সেই সময়ই আমার জন্মদিনে এই উপহারটা দিয়েছিল।” পরক্ষণেই যেন বিষণ্ণতা পেরিয়ে পুরনো সময়ের হাসি-আলো ছুঁয়ে বললেন, ”জানো তো, সবাইকে দেখতাম গড়ের মাঠে প্রেম করতে যায়। তা আমিও ওকে নিয়ে গড়ের মাঠে গিয়েছি। গিয়ে দেখি জলেকাদায় মাঠ ভরে রয়েছে। যাও বা একটা জায়গা খুঁজে নিয়ে বসলাম, দেখি কোথা থেকে একটা ষাঁড় চলে এল।”
বলছিলেন তিনি। আর হাসছিলেন। বুঝতে পারছিলাম, সেই মুহূর্তে আমার সঙ্গে নয়, তিনি আসলে কথা বলছেন নিজের সঙ্গে। আর সেভাবেই তিনি বলেছিলেন তাঁর আরও এক প্রেমিকার কথা। সেই প্রেমিকার নাম অরণ্য। বলেছিলেন, ”অরণ্যের মতো সুগন্ধী নারী আর দেখিনি। মেয়েরা যেমন শ্যাম্পু করে, জঙ্গলও করে। এ আমার নিজের চোখে দেখা। নিত্যনতুন প্রসাধনে সে একেক ঋতুতে একেক রকম ভাবে সুন্দরী হয়ে ওঠে, মোহময়ী হয়ে ওঠে।”
কথায় কথায় উঠে এসেছিল বিভূতিভূষণের অরণ্যপ্রেমের প্রসঙ্গ। অকপটে বলেছিলেন, ”তাঁর সঙ্গে আমার দেখার ফারাক আছে। তাঁর কাছে জঙ্গলকে দেখা হল কোনও এক নারীর দিকে মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা। আর আমার ব্যাপারটা হল, আমি সেই মেয়েটার সঙ্গে শুয়েছি।” শুনতে শুনতে মনে হয়েছিল এভাবে বলতে বা ভাবতে পারার কারণেই তাঁর লেখালেখির কোনও পূর্বসূরী বা উত্তরসূরী নেই। তিনি একক। নিজের মতো করে অনন্য। মৃত্যু এসে একদিন সবকিছু থামিয়ে দেয়। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে তাঁর জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থান যে চিরকালীন রিজার্ভেশন পেয়ে গিয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আরেকটু বিস্তৃত ভাবে ভাবলে কেবল লেখক নয়, বুদ্ধদেব গুহ আসলে রোম্যান্টিক বাঙালির সেই প্রজন্মের অন্যতম শেষ প্রতিভূ। এখন বাঙালি বেড়াতে গিয়ে একের পর এক সাইট সিয়িং সেরে এসে কাগজে টিক মারে। বৃষ্টির অঝোরধারা কিংবা শীতের কুয়াশামাখা অরণ্যের রূপ দেখে তন্ময় হওয়ার সেই দিন বুঝি গিয়েছে। বুদ্ধদেব চলে গেলেন। ম্যাকলাস্কিগঞ্জে হয়তো এখন বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু সেই বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আর কে মনের মধ্যে ধরে রাখবে প্রকৃতির নির্যাস?
সর্বশেষ খবর
-
এবার ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ, ফের জেল হেফাজতে প্রাক্তন বিধায়ক অসিত মজুমদার
-
‘ভারত-চিন সম্পর্কে নাক গলাবে না রুশ’, ত্রিকোণ বন্ধুত্বের সমীকরণে স্পষ্ট বার্তা পুতিনের
-
কাটমানি না দিলে বাড়ি নয়, বড়ঞায় গ্রেপ্তার তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্যের স্বামী-সহ ৪
-
আমেরিকার বিশ্বকাপে শোনা যাবে না ভুভুজেলার শব্দ, নিষেধাজ্ঞা ‘রিইউজেবল’ জলের বোতলেও
-
বাড়িতে অন্ত্যেষ্টির তোড়জোড়, ৫ দিন পর এভারেস্টের ‘ডেথ জোন’ থেকে সশরীরে ফিরলেন শেরপা