×

৯ চৈত্র  ১৪২৫  সোমবার ২৫ মার্চ ২০১৯   |   শুভ দোলযাত্রা।

Menu Logo মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও #IPL12 ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

কল্যাণ চৌবে, ভারতীয় ফুটবলের এই বিশিষ্ট গোলকিপার, একটি উপন্যাস লিখেছেন: ‘অপরিণত’। বইটির পরিচিত অংশে লেখা হয়েছে এটি ‘থ্রিলার ফিকশন’। এবং ‘লেখক পরিচিতি’ জানাচ্ছে, কল্যাণ চৌবে একজন ‘মোটিভেশনাল স্পিকার’ এবং এর আগেও তাঁর অন্য একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল। শিরডি সাইবাবার জীবনী ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন তিনি ‘সৎ চরিত্র’ (২০০৬) নামে। ‘অপরিণত’ সেদিক থেকে তাঁর মৌলিক সাহিত্যচর্চার প্রথম স্ফূরণ।

কেমন লিখেছেন কল্যাণ চৌবে?

এর উত্তরে প্রথমেই একটু ভূমিকা করে বলতে হয়, যেসব উপন্যাস ‘থ্রিলার ফিকশন’ ধরনের, সেসব উপন্যাসের গল্পটি ভেঙে পুরো বলতে নেই। তাহলে উত্তেজনা ও রহস্যের মিনারটি নষ্ট হয়ে যায়। একদমে কাহিনিটি বলে দিলে যেসব বাঁক ও মোচড়ে ঔপন্যাসিক তাঁর চিন্তাকে বৈচিত্রবহ করে তোলেন এবং ঘন আয়তন দেন, তার মেজাজও হয়ে যায় লঘু।

উপন্যাস লিখতে এসেই একজন লেখক উপন্যাসের নাম দিচ্ছেন ‘অপরিণত’ এবং বেছে নিচ্ছেন থ্রিলারের আঙ্গিক, এ সচরাচর দেখা যায় না। এতেই প্রমাণিত, কল্যাণ চৌবে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী কী লিখবেন, কীভাবে লিখবেন তা নিয়ে। বিপুল পরিমাণ শব্দ, প্রচুর চরিত্র, অশেষ অবকাশ– এমন চেনা ঢং এড়িয়ে তিনি উপন্যাসের কেন্দ্র তৈরি করেছেন ‘আখ্যায়িকা’ বা নভলেট লেখার চালে। চারজন যুগল। অর্ণব ও অন্তরা। দুই যুবক-যুবতী। এবং অন্তরার মা-বাবার বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক। এটুকুই ক্যানভাস। অন্য চরিত্রদের আনাগোনা ক্যানভাসটিকে রঙে-রেখায় ফলন্ত করে তুলতে।

কল্যাণ চৌবের সবথেকে বড় গুণ: তিনি সেই জীবনের বৃত্তে গল্পটাকে বেঁধে রেখেছেন, বিস্তৃতি দিয়েছেন– যে জীবন তাঁর চেনা। চরিত্র সৃজনের লোভে, উপন্যাসে গতি আনতে তিনি এমন জীবনের দিকে তাকাননি, সমাজের এমন অচেনা স্তরে ঝুঁকে পড়েননি, যা নিজের উপলব্ধিতে নেই। ফলে গল্পের বুননে অসততা নেই। নেই ফাঁক বা ফাঁকি।

আরও একটি বিষয় না বললেই নয়। তা হল, পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্য বাড়তি মেদ সঞ্চয় করেননি। অভিজ্ঞতা ও কল্পনার মিশেলেই যে কোনও লেখক চরিত্রদের গড়ে তোলেন। কিন্তু সে কাজে নিয়োজিত হয়ে ‘পাঠক কোনটা ভাল পড়বে’ এই সমীকরণ কষতে তিনি ব্যস্ত হননি। যার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর বলার ভঙ্গিতে। কল্যাণের লেখার ভাষাটি ঝরঝরে। ছিমছাম। অযথা ভারিক্কি শব্দ নেই। আবার, অপ্রয়োজনে বুলির ব্যবহার ঘটাননি। তাঁর আরও একটি গুণ, সুন্দর সংলাপ তৈরি করেন। আধুনিক সময়ের দু’জন শিক্ষিত শহুরে যুবক-যুবতীর প্রেমের রোমান্টিক ভাষা তিনি অবিকল উদ্ধার করেছেন। আবার, বাবা ও মেয়ের মধুর নির্ভরতার সম্পর্কটি উন্মুক্ত করেছেন বিশ্বস্ততার সঙ্গে। বাবাদের প্রতি মেয়েদের অধিকারবোধ ও প্রীতি সবসময়ই বেশি। তেমনই যে কোনও বাবা-ই আপন মেয়ের প্রতিটি আবদারে সাড়া দেয়। উপন্যাসের চরিত্র অন্তরা অনেক দিন পরে তার বাবা কৌশিককে দেখেই প্রশ্ন করে– ‘তুমি কত রোগা হয়ে গেছ?’ কৌশিক তখন মেয়েকে বলে: ‘তুই নেই আর কে যত্ন করবে বল?’ এই সংলাপ আমাদের চারপাশের দেখা বাঙালি পরিবারের ড্রয়িং রুম থেকে ছেঁকে তুলে আনা যেন!

কল্যাণ চৌবে সবথেকে দুঃসাহসিকতার স্বাক্ষর রেখেছেন উপন্যাসের অন্তিমে পৌঁছে। ঘটনাপ্রবাহ এমনভাবে রচনা করেছেন যে উপন্যাসের প্রধান একটি চরিত্র অর্ণব জেলে চলে যায়। আর, নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে মানসিক অবসাদে কুঁকড়ে গিয়ে একদিন জেলেই আত্মহত্যা করে। বিষাদ আর বিয়োগান্তক পরিণতি সমান্তরাল সরলরেখার মতো ছুটতে থাকে উপন্যাসটি শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও। এত স্মার্ট ধরতাই প্রথম লেখায় একজন তুলে ধরছেন– যাঁর পেশাগত পরিচয় লেখার দুনিয়া থেকে একদমই আলাদা– সত্যি অভাবনীয়!

দু’টি বা তিনটি অপশন থেকে একটি বিশেষ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেইমতো জীবনের জল গড়াতে থাকে। সময় ও বিবেচনার গুণে কখনও সিদ্ধান্তটি ‘পরিণত’ ও ‘ফলপ্রসূ’ সাব্যস্ত হয়। কখনও সিদ্ধান্তটি হয় ‘অপরিণত’ এবং ‘ব্যর্থ’। কিন্তু শেষ অবধি যাই হোক, কোনও সিদ্ধান্তের শরীর থেকেই মানুষের মন ও প্রবণতাকে ছাড়িয়ে নেওয়া যায় না। ইচ্ছা ও ইচ্ছার মৃতু্য, স্বপ্ন ও স্বপ্নের উড়ান, ক্ষত এবং তার ক্ষতি, নিয়তি ও তার নিষ্ঠুরতা এই উপন্যাসের চরিত্রদের ছুটিয়ে মেরেছে মরীচিকার মতো। কল্যাণ চৌবে গভীর আগ্রহে সেই উদ্‌ভ্রান্তির ছবি এঁকেছেন নিরাসক্ত কলমে। এরপরেও কেন বলব না তিনি সফল?

অপরিণত : কল্যাণ চৌবে
দেব সাহিত্য কুটীর ১০০

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং