৪ আশ্বিন  ১৪২৬  রবিবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ 

Menu Logo পুজো ২০১৯ মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও বাঁকা কথা ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

যৌনতা আর বিষাদসর্বস্ব ওয়েব সিরিজের মাঝে একপশলা ছোটবেলা নামিয়েছে সুজয় ঘোষের ‘টাইপরাইটার’। হরর থ্রিলার দেখে লিখছেন সোহিনী সেন

 

টাইপরাইটার

অভিনয়: পুরব, যিশু, পালোমি, অর্ণা, পলাশ, মিখাইল, আর্যাংশ

পরিচালনা: সুজয় ঘোষ

এপিসোড:

স্ট্রিমিং: নেটফ্লিক্স

রাতে ঘুমোতে যাচ্ছেন। অন্ধকার ঘরে আপনি একা। অথচ দ্বিতীয় কোনও সত্তার উপস্থিতি অনুভব করছেন। স্পষ্টতই। একমুহূর্ত আর সেখানে থাকতে পারছেন না। ছুট্টে বেরিয়ে আসছেন। মাথা কাজ করছে না। কিন্তু মনে মনে  জানেন, যা ভয়, যতটুকু ভয়- সবটুকুই আপনার মনের। আদতে ভূত বলে কিছু নেই। ‘ভূত ইজ ঝুট’। এবং আপনাকে ঘরে ফিরতেই হবে। এমতাবস্থায় কী করেন? গড়পড়তা হিসাবে ফের ঘরে যাওয়া হয়। নাইট বালবটা জ্বালানো হয়। নিজেকে আশ্বস্ত করার জন্য দরজার পিছনটা একবার ঝালিয়ে নেন। আলমারিটা খুলে দেখেন। এবং সবশেষে হয়তো পর্দা সরিয়ে দেখে নেন। আপনার অবচেতনে ঘুরতে থাকা কোনও ভয়াবহ অবয়ব বা বীভৎস প্রতিকৃতির দেখা না পেয়ে নিশ্চিন্ত হন। মনে বল ফেরে। ফের ঘুমোতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে খাটমুখী হন। তাই তো? কিন্তু ধরুন যদি দেখেন, খাটে বসে আছে আরেকটা আপনিই?  হুবহু। সশরীর… তাহলে?

[আরও পড়ুন: অ্যাকশনে ভরপুর ‘প্যান্থার’, জিৎময় ছবিতে ম্লান বাকি অভিনেতারা]

‘টাইপরাইটার’ কোনও বাড়াবাড়ি, কোনও অতিকথন ছাড়াই ভয় ও রহস্যের সলতেয় তেল দিতে দিতে এগিয়েছে এভাবে। সুজয় ঘোষ পরিচালিত ওয়েব সিরিজ। ৫টা এপিসোড। প্রথম সিজন সদ্য মুক্তি পেয়েছে নেটফ্লিক্সে। দেখতে গিয়ে মনে পড়ে যাচ্ছিল মার্কিন কল্পবিজ্ঞান ও রহস্যকাহিনির লেখক ফ্রেডরিক ব্রাউন-এর ‘স্পেস অন মাই হ্যান্ড’-এর সেই বহুল পরিচিত লাইন দুটো- ‘দ্য লাস্ট ম্যান অন আর্থ স্যাট অ্যালোন ইন আ রুম। দেয়ার ওয়াজ আ নক অন দ্য ডোর।’ তারপর?  তারপর থেকেই শুরু নিঃসীম অনুমানের ধোঁয়াটে মেঘ। রহস্যের ফেনিল সমুদ্র। অপার। অগাধ। অশেষ। এই রহস্যের ছড়ে টান মারতে মারতেই ‘টাইপরাইটার’-এ সুর তুলেছেন পরিচালক ও তাঁর খুদে সেনানী- অর্ণা শর্মা, পলাশ কাম্বলে, মিখাইল গান্ধী ও আর্যাংশ মালভিয়া। তথা স্যাম, বান্টি, গাবলু আর নিক। ‘ঘোস্ট ক্লাব’-এর সদস্য চতুষ্টয়।

মাধব ম্যাথিউ (কনওয়ালজিৎ সিং) ভূতের গল্প লিখতেন। প্রখ্যাত এই গল্পকারের বইয়ে রয়েছে সুলতানপুর নামে এক গ্রামের কথা। গল্পের প্রত্যন্ত গ্রামটির সঙ্গেই জড়িয়ে যায় বাস্তবের গোয়ার বার্ডেজ ভিলার ভবিতব্য। জড়িয়ে যায় সেকাল-একাল। জড়িয়ে যায় কয়েকটা মানুষের অদ্ভুত জীবন। ততোধিক অদ্ভুত মৃত্যু। আর সব কিছুর নিয়ন্ত্রীশক্তি হিসাবে নিজেকে লতাপাতার মতো জড়িয়ে নেয় একটা টাইপরাইটার। টাইপরাইটার-রহস্যের কিনারা খুঁজতেই অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটনা, আশঙ্কা ও ভয়ের চোরাস্রোত শিরশিরিয়ে বয়ে যায় দর্শকের চোখ ছুঁয়ে। তবে কাবু করতে পারে না স্যাম, বান্টি, গাবলু আর নিককে। প্যারানরমাল হরর থ্রিলারের সুতোয় ওদের গল্পই বুনেছেন সুজয়।

ভূত, প্যারনরমাল মিস্ট্রি নিয়ে কিশোর-কিশোরীদের বরাবরের কৌতূহল-জ্বর। তাতে ছোটবেলায় কাবু ছিলেন সুজয়ও। এরকম কোনও রহস্য রোমাঞ্চে ভরা অভিযানের শরিক হতে তাঁরও ইচ্ছে করত। স্যাম-বান্টি-গাবলু-নিকের মধ্য দিয়ে কৈশোরের সফর সেরেছেন পরিচালক।

কৈশোরের দিকে এক পা বাড়ানো চার স্কুলপড়ুয়া। সিলেবাসের সাদাকালো হরফ নয়, তাদের টানে মৃত্যুর ওপারের কালো-সাদা জগৎ। তার অস্তিত্ব আর অনস্তিত্বের ছাইরঙা ক্যানভাসে তুলি বুলিয়ে যায় তারা। এই ‘ঘোস্ট ক্লাব’-এর নেতৃত্বে সময়িতা ওরফে স্যাম। ‘ভূত’ খোঁজার, প্যারানরমাল রহস্য সমাধানের অভিযানে বাকিদের তুলনায় স্থিতপ্রজ্ঞ এই খুদে ‘ঘোস্ট হান্টার’। ‘আমি কি ডরাই সখা ভূত-আত্মারে?’ এরকম ডেয়ারডেভিল অ্যাপ্রোচ নিয়ে গোয়ার অলিগলি চষে বেড়ায় স্যাম। আর তাকে নিডর, নির্ভীক, নিষ্ঠিত সঙ্গ দেয় তার তিন বন্ধু। স্যাম ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছে। বাবার আদর-আগলানোয় বড় হওয়া স্যামের কাছে ‘ভূত’ বিষয়টা তাই মা’কে পাওয়ার একমাত্র পথ। প্রিয়জন হারানো শৈশবের উপান্তে যে যন্ত্রণা থাকে, তাতে শুধু স্যাম নয়, আক্রান্ত ফকিরও (অভিষেক বন্দ্যেপাধ্যায়)। সেই যন্ত্রণা, সেই উদ্বেগ, সেই অস্থিরতাই নিয়ন্ত্রণ করে চরিত্রগুলোকে। তাদের আসন্ন ভবিষ্যৎকে। ভৌতিক উৎকণ্ঠার সমান্তরালে চরিত্র এবং ঘটনা পরম্পরার এই একাধিক পরত মুনশিয়ানায় তুলে ধরেছেন সুজয়। ভূতের গল্পের থেকে তাই আরও বেশি কিছু হয়ে রয়ে গিয়েছে ‘টাইপরাইটার’।

আসলে সুজয় ঘোষ বাজারচলতি অ্যাডাল্ট হরর থ্রিলারের পেটোয়া হয়ে থাকতে চাননি। ফিরে যেতে চেয়েছেন নিজের কৈশোরে। হেমেন্দ্রকুমার রায়, বিমল কুমার, আগাথা ক্রিস্টি, এনিড ব্লাইটনের বইয়ের স্মৃতি মোড়া কৈশোর। ভূত, প্যারনরমাল মিস্ট্রি নিয়ে কিশোর-কিশোরীদের বরাবরের কৌতূহল-জ্বর। তাতে ছোটবেলায় কাবু ছিলেন সুজয়ও। এরকম কোনও রহস্য রোমাঞ্চে ভরা অভিযানের শরিক হতে তাঁরও ইচ্ছে করত। স্যাম-বান্টি-গাবলু-নিকের মধ্য দিয়ে কৈশোরের সফর সেরেছেন পরিচালক।

ইন্সপেক্টর রবি আনন্দের চরিত্রে পূরব কোহলি সুন্দর। রবি, স্যামের বাবা। সিঙ্গল পেরেন্টিং-এ সন্তানের প্রতি যে বাড়তি স্নেহটুকু লাগে অভিভাবকের, যে বাড়তি নির্ভরতা দাবি করে সন্তান, বাপ-বেটির মন ছুঁয়ে যাওয়া রসায়নে তা স্পষ্টদৃশ্য। কাহিনির অন্যতম প্রোটাগনিস্ট জেনি। তার চরিত্রে অভিনয় করেছেন পালোমি ঘোষ। ছিমছাম অভিনয় পালোমির। তাঁর ‘গার্ল নেক্সট ডোর’ লুকটাও চরিত্রের সঙ্গে জব্বর মানিয়েছে। যিশু সেনগুপ্ত এখানে ‘কাহানি’-র বব বিশ্বাসকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। শান্ত। স্থির। অথচ শাণিত। স্যামের চরিত্রে নজরকাড়া অর্ণা শর্মা। অতটুকু বাচ্চা, অথচ কী অদ্ভুত সাবলীল অভিনয়! সিরিজের মুডকে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছে রাজা নারায়ণ দেবের মিউজিক কম্পোজিশন। সিনেমাটোগ্রাফির জন্য গৈরিক সরকারকে বিগ রাউন্ড অফ অ্যাপ্লজ জানাতে ইচ্ছে করে।

[আরও পড়ুন: ‘জাজমেন্টাল হ্যায় কেয়া’ গল্পের আসল স্টার কঙ্গনাই]

তবে শেষ এপিসোডে এসে বড্ড তাড়াতাড়ি যেন প্যাক আপ বলে ফেলেন সুজয়। প্রথম চার এপিসোড জুড়ে তৈরি হওয়া রোমাঞ্চের মইটা যেন বিনা নোটিসে কেড়ে নেওয়া হল! মূলত বাচ্চাদের কথা মাথায় রেখে সিরিজটা তৈরি করা বলেই কি রহস্যের জটিলতর মারপ্যাঁচে যেতে চাইলেন না সুজয়? এরকম আশাহত করে ছেদ টানলেন ফার্স্ট সিজনে? ‘কাহানি’, ‘অহল্যা’, ‘বদলা’-র পরিচালকের কাছে, বলিউডের ‘রহস্যের রাজা’-র কাছে প্রত্যাশা আরও বেশি ছিল।

তবুও ‘টাইপরাইটার’-এর রেশ রয়ে যায়। এখনকার পরকীয়া, যৌনতা, বিষাদ, যন্ত্রণা সর্বস্ব ওয়েব সিরিজের মাঝে একপশলা ছোটবেলা নামিয়েছে ‘টাইপরাইটার’। ফিরিয়ে দিয়েছে সেই দিনগুলোর সোঁদা গন্ধ। ‘মণিহারা’, ‘কুহেলি’, ‘গগন চৌধুরীর স্টুডিও’র গন্ধে ভরপুর ছিল ছোটবেলা। সূর্যনেভা বিকেলে স্যাম, বান্টি, গাবলুদের ‘ঘোস্ট ক্লাব’-এর আড্ডায় বসার দৃশ্য, ওদের চোখভরা বিস্ময় মনে পড়িয়ে দেয় আমাদের সেদিনকার রোমাঞ্চ সন্ধানী মুখগুলো। নিরলস, প্রত্যয়ী পাগুলো। ভুঁড়িঅলা টিভি, বইয়ের পাতা ছেড়ে যেই আদুর পা ছুটছে গুপ্তধনের খোঁজে। ভাঙা মন্দির, নিঃশব্দ দুপুর-গলির এককোণ, নিঝুম চিলেকোঠা বা কাকপক্ষীহীন বিকেলের ছাদে। শেষ হয়েও শেষ না-হওয়া গল্পের মোহনার সন্ধানে। থ্যাঙ্ক ইউ সুজয় ঘোষ।

 

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং