Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
The Odyssey Movie Review

যুদ্ধের পৃথিবীতে মহাকাব্যের ‘পুনর্জন্ম’, কেমন হল নোলানের ‘দ্য ওডিসি’

নোলান চমক দেখাতে এই ছবি বানাননি। তাঁর আসল উদ্দেশ্য একেবারেই ভিন্ন।

Advertisement
বিশ্বদীপ দে
বিশ্বদীপ দে

শেষ আপডেট: জুলাই ১৭, ২০২৬, ১৮:৩৩

link
বিশ্বদীপ দে
বিশ্বদীপ দে

শেষ আপডেট: জুলাই ১৭, ২০২৬, ১৮:৩৩

options
link
যুদ্ধের পৃথিবীতে মহাকাব্যের ‘পুনর্জন্ম’, কেমন হল নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ zoom
'দ্য ওডিসি' ছবির একটি দৃশ্য।

‘কয়েকজন কবি এই ইতিহাস পূর্বে বলে গেছেন, এখন অপর কবিরা বলছেন, আবার ভবিষ্যতে অন্য কবিরাও বলবেন।’ রাজশেখর বসু অনূদিত ‘মহাভারত’-এর একেবারে শুরুর এই ক’টি লাইন আমাদের মনে গেঁথে রয়েছে। মহাকাব্যের পুনরুচ্চারণ আসলে এক অনিবার্য পরিণতি। জরুরিও। এই যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে ক্রিস্টোফার নোলানও তাই নতুন করে শুনিয়েছেন মহাকাব্যেরই গল্প। তবে মহাভারত নয়, হোমার লিখিত ওডিসি। এই ছবি দেখতে দেখতে বোঝা যায়, কেন বারবার মহাকাব্যের দিকে ফিরতে হয় সভ্যতাকে।

এই মহাকাব্যের নায়ক ইথাকার রাজা ওডিসিয়াস। ট্রয়ের যুদ্ধশেষে তাঁর ঘরে ফেরার কাহিনিই ওডিসি। তিনি জানতেন, এই যুদ্ধে যাওয়া মানে বাড়ি ফিরতে পারবেন না কুড়ি বছর। হোমারের মহাকাব্যে রয়েছে, মহারণ থেকে নিজেকে সরাতে উন্মাদ হওয়ার ভানও করেছিলেন তিনি। যদিও ছবিতে সেই অংশটি নেই। তবে ওডিসিয়াস যে প্রসন্নচিত্তে যুদ্ধে যাননি সেটা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। রানি পেনেলোপে চেয়েছিলেন একসঙ্গে পালিয়ে যেতে! পশ্চিমের সূর্যকে ধাওয়া করে এক অন্য গন্তব্যের দিকে। ওডিসিয়াস রাজি হননি। স্ত্রী ও একরত্তি পুত্রসন্তান টেলেমেকাসকে রেখে নিয়তির হাতে নিজেকে সঁপে দেন। রওনা দেন যুদ্ধের দিকে। ছেলে বাবাকে দেখেনি। যুদ্ধে যাওয়ার ঠিক আগে তার জন্ম। তবু সে মায়ের মতোই প্রতীক্ষায় থাকে কবে বাবা ফিরবে। ওডিসিয়াসের কুকুর আর্গোস এবং বিশ্বস্ত ভৃত্য জন্মান্ধ ইউমিয়াসও অপেক্ষায় থাকে কবে ফিরবে ইথাকার সুদিন। কবে ফিরবেন ওডিসিয়াস। ওডিসিয়াসও প্রবলভাবে চান ফিরতে। কিন্তু ‘ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি?’ ফেরার সেই প্রবল সংগ্রামের কাহিনিই ওডিসি। অন্যদিকে ইথিকায় পেনেলোপের পানিপ্রার্থীদের ভিড়। যত সময় এগোয় স্পষ্ট হতে থাকে, ওডিসিয়াস আর ফিরবেন না। ইথাকার রানিকে বিয়ে করতে চায় ওই লোভীদের প্রত্যেকে।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

The Odyssey Movie Review

নোলান এখানে তাঁর চিরচেনা পদ্ধতিতে গল্প বলেননি। কিছুটা সোজাসুজিই বলেছেন। তবে সময়ের কালক্রম অবশ্যই ভেঙেছেন। সেটা ছবিটাকেই গতিময় করেছে। চিত্রনাট্য অত্যন্ত স্মার্ট। ‘স্টোরি টেলিং’ যে কোনও দর্শককেই টেনে রাখবে।

আনুমানিক ২৭০০-২৮০০ বছর আগের এই আখ্যান সভ্যতার বাতাসে মিশে রয়েছে। চিরচেনা আখ্যান অনুযায়ী, আমরা জানি ওডিসিয়াস শেষে ফিরে আসবেন। ছবিতেও সেটাই আছে। মূল মহাকাব্যকেই অনুসরণ করেছেন নোলান। কিন্তু এটা আগে থেকে জানা থাকলেও ছবি দেখার মজা এতে নষ্ট হবে না। নোলান এখানে তাঁর চিরচেনা পদ্ধতিতে গল্প বলেননি। কিছুটা সোজাসুজিই বলেছেন। তবে সময়ের কালক্রম অবশ্যই ভেঙেছেন। সেটা ছবিটাকেই গতিময় করেছে। চিত্রনাট্য অত্যন্ত স্মার্ট। ‘স্টোরি টেলিং’ যে কোনও দর্শককেই টেনে রাখবে। ওডিসিয়াসের ভূমিকায় ম্যাট ডেমন অনবদ্য। পেনেলোপে হয়েছে অ্যানা হ্যাথওয়ে। বিখ্যাত অভিনেত্রীও সমানে পাল্লা দিয়েছে ম্যাটের সঙ্গে। টেলেমেকাসের ভূমিকায় ‘স্পাইডারম্যান’ টম হল্যান্ডও ভালো। যতটুকু সুযোগ তাঁকে চিত্রনাট্য দিয়েছে, তিনি পুরোটাই কাজে লাগিয়েছেন। বাকিরাও প্রত্যেকে নিজেদের ভূমিকা পালন করেছেন যত্নের সঙ্গে।

তবে শেষপর্যন্ত এই ছবির নিউক্লিয়াস নোলানই। তিনি অন্যবারের মতো এবারও প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি সংলাপ, নীরবতা- সমান যত্নবান। ছবির শুরুতেই আমরা দেখি ‘ইন আ টাইম অফ অ্যাপারেন্ট ম্যাজিক…’ সেই জাদু এই ছবির পরতে পরতে। একচোখো দানব সাইক্লপস থেকে ছয় মাথাওয়ালা সিলা, নাবিকদের সম্মোহিত করে মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া সাইরেন, ডাইনি সার্সের হাতে যোদ্ধাদের শূকরে পরিণত হওয়া… সকলের কৌতূহল ছিল ছবিতে এসব কীভাবে দেখানো হবে। আজকের দিনে কম্পিউটার গ্রাফিক্স ও ভিএফএক্সের সাহায্যে এসব দৃশ্যের নির্মাণ নস্যি। কিন্তু নোলান তাঁর ছবিতে পুরনো দিনের মতো স্পেশাল এফেক্টস ব্যবহার করেন। সেভাবেই তিনি চমকে দিয়েছেন ‘ওপেনহাইমার’ বা ‘ইন্টারস্টেলার’-এর মতো ছবিতে। ‘দ্য ওডিসি’-তেও সেই জাদু অব্যাহত। অনবদ্য সিনেমাটোগ্রাফির সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত আবহসঙ্গীতের। কিছু দৃশ্যে ‘জাম্পস্কেয়ার’ তৈরি করা হয়েছে এত নিপুণভাবে, শিউরে উঠতেই হয়। ছবির ক্লাইম্যাক্স আমাদের জানা। সেখানেও নোলান যথারীতি অনবদ্য। তবে ট্রয়ের যুদ্ধ বা ট্রোজান ওয়ারকে যুদ্ধের বীভৎসতাকে যেভাবে চিনিয়ে দেয়, তা স্তম্ভিত করে। নোলান চমক দেখাতে এই ছবি বানাননি। তাঁর আসল উদ্দেশ্য একেবারেই ভিন্ন। সেকথায় এবার আসব।

নোলান তাঁর ছবিতে পুরনো দিনের মতো স্পেশাল এফেক্টস ব্যবহার করেন। সেভাবেই তিনি চমকে দিয়েছেন ‘ওপেনহাইমার’ বা ‘ইন্টারস্টেলার’-এর মতো ছবিতে। ‘দ্য ওডিসি’-তেও সেই জাদু অব্যাহত। অনবদ্য সিনেমাটোগ্রাফির সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত আবহসঙ্গীতের।

‘দ্য ডার্ক নাইট’ ছবিতে একটা সংলাপ ছিল ‘সাম মেন জাস্ট ওয়ান্ট টু ওয়াচ দ্য ওয়ার্ল্ড বার্ন’। কিছু মানুষ কেবল চান পৃথিবীর পুড়ে যাওয়া দেখতে! সেই কথাই এই ছবিতে বারবার ফিরে এসেছে। এই মুহূর্তে পশ্চিম এশিয়া যুদ্ধের আঁচে পুড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রণহুঙ্কারের সমান্তরালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধও বছরের পর বছর ধরে অব্যাহত। সাম্প্রতিক আরও যুদ্ধের নজির রয়েছে। এই সামগ্রিক ধ্বংসলীলাকেই যেন আমরা প্রত্যক্ষ করি ট্রয়ের যুদ্ধে। আগুনে পুড়তে পুড়তে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে একটা জনপদ। চারপাশে মৃত্যুমিছিল। যুদ্ধশেষে যখন আনন্দে মেতেছেন তাঁর সহযোদ্ধারা, ওডিসিয়াস একা বিষণ্ণ হয়ে বসে থাকেন। অনুভব করেন যুদ্ধবিষের তিক্ত, কটু স্বাদ। তবু… ওডিসিয়াস নিজেও কি নায়ক? যিনি জিতে যান তিনিই তো নায়ক। ওডিসিয়াস জিতেছেন। মৃত্যুকে অতিক্রম করে ফিরে এসেছে ইথাকায়। উদ্ধার করেছেন রাজপাট। তবু, তাঁকে প্রতি মুহূর্তে বিদ্ধ করে সহযোদ্ধাদের মৃত্যু। এক দৃশ্যে মৃত যোদ্ধারা তাড়া করে আসে ওডিসিয়াস ও তাঁর জীবিত সহযোদ্ধাদের। গোটা ছবিটাকে বোধহয় প্রতিফলিত করে এই একটি দৃশ্য। ছবির একেবারে শেষে ওডিসিয়াস মনে করিয়ে দেন, বারবার ট্রয়ের যুদ্ধের কথা স্মরণ করতেই হবে। কেন? ‘প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা’। যুদ্ধ ও ক্ষমতা দখলের লিপ্সা কী বীভৎস, তা মনে করিয়ে দেওয়া। ‘ওপেনহাইমার’ শেষ হয়েছিল আইনস্টাইন ও ওপেনহাইমারের এক সংলাপের মধ্যে দিয়ে। যা আসলে সভ্যতার উদ্দেশে নোলানেরই সতর্কবাণী, ইতিহাসের ছদ্মবেশে। এখানেও হোমারের ‘হ্যাপি এন্ডিং’-কে অগ্রাহ্য করে তিনি হেঁটেছেন একই পথে, একই উদ্দেশ্যে।

‘দ্য ডার্ক নাইট’ ছবিতে একটা সংলাপ ছিল ‘সাম মেন জাস্ট ওয়ান্ট টু ওয়াচ দ্য ওয়ার্ল্ড বার্ন’। কিছু মানুষ কেবল চান পৃথিবীর পুড়ে যাওয়া দেখতে! সেই কথাই এই ছবিতে বারবার ফিরে এসেছে।

এও আমাদের জানা, হাজার হাজার বছর ধরে মহাকাব্যগুলি যতই এসব মনে করাক, আমাদের শুনতে বয়েই গিয়েছে। তবু চেষ্টা করে যাওয়া… সেটুকুই করেছেন নোলান। যুদ্ধবাজ পৃথিবীর চৈতন্য হোক, এই পবিত্র প্রার্থনাতেই হোমারের হাত ধরেছেন এযুগের এক মহান শিল্পী। কোনও শিল্পই পারে না যুদ্ধের ঘিনঘিনে লালসা থেকে মানুষকে বাঁচাতে। তবু এই সময়ে দাঁড়িয়ে আয়নায় তার ঘৃণ্য শরীরটা একবার ফুটিয়ে তোলাটা আসলে অনিবার্যই ছিল।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.