২১ শ্রাবণ  ১৪২৭  বৃহস্পতিবার ৬ আগস্ট ২০২০ 

Advertisement

পৌরহিত্য-পিরিয়ডস নিয়ে প্রথাগত বিশ্বাসে কুঠারাঘাত শবরী ঋতাভরীর

Published by: Sandipta Bhanja |    Posted: March 7, 2020 4:18 pm|    Updated: March 7, 2020 4:22 pm

An Images

নারী দিবসের প্রাক্কালে ‘ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি’ যেন ‘সেলিব্রেশন অফ ওমেনহুড’। লিখছেন সন্দীপ্তা ভঞ্জ

পরিচালক- অরিত্র মুখোপাধ্যায়

অভিনয়ে- ঋতাভরী চক্রবর্তী, সোহম মজুমদার, সোমা মুখোপাধ্যায়, অম্বরীশ ভট্টাচার্য, মানসী সিনহা

প্রচলিত বিশ্বাসের জগদ্দল পাথরে কুঠারাঘাত

মেয়েরা একাই একশো। আমাদের চারপাশে প্রত্যেক নারীর মধ্যেই দশভূজারূপ বিদ্যমান। তারা রাঁধে আবার চুলও বাঁধে! রাজনীতির ময়দান থেকে মহাকাশযান, প্রত্যেকটি পেশাতেই পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে চলেছেন নারীরা। কিন্তু তবুও ২০২০ সালে ওষুধের দোকানে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে গিয়ে ‘লুকোচুরি’ খেলতে হয়। যেখানে বাইরের কিছু দেশে ঋতুস্রাব চলাকালীন অফিস-কাছারিতে মেয়েদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেখানে আমাদের দেশে আজও অনেকেই মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন নিয়ে সচেতনই নন, কিংবা নিদেনপক্ষে ন্যাপকিন ব্যবহারও জানেন না। বলা ভাল, পিরিয়ডস নিয়ে সমাজে নানারকম ছুঁতমার্গের জন্য জানানো হয়নি! সেই ট্যাবুগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই নবাগত পরিচালক অরিত্র মুখোপাধ্যায়ের ‘ব্রম্মা জানেন গোপন কম্মটি’।

 

পৌরহিত্যে লিঙ্গভেদ!

গল্পের ভাবনা এবং কাহিনি খ্যাতনামা সাংবাদিক জিনিয়া সেনের। মেয়ে হিসেবে নিজস্ব উপলব্ধি থেকেই তাঁর এই ভাবনা। তবে উল্লেখ্য, গল্পে অনেকরকম প্লট রাখা হয়েছে। বিয়ের ক্ষেত্রেও কোনওরকম বর্ণ কিংবা শ্রেণী বৈষম্য নয়, বরং বিয়ে হোক দুটো মানুষের। দুটো আত্মার- সে বিষয় যেরকম উত্থাপন করা হয়েছে, আবার পেশাগত দিক থেকেও যেন লিঙ্গবৈষম্য না থাকে সে প্রসঙ্গও রাখা হযেছে। পরেরবার থেকে পুরোহিতের আসনে পুরুষের জায়গায় কোনও মহিলাকে দেখলে যাতে ভ্রুযুগল আন্দোলিত না হয়, সে বার্তা গল্পের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বুনে দেওয়া হয়েছে।

‘শবরী’ ঋতাভরী

গল্পে যেহেতু বেশ কয়েকটা প্লটের উত্থাপন রয়েছে, তাই চিত্রনাট্য লেখনীর বাঁধন আরেকটু শক্ত হলে ভাল হত। তবে এক্ষেত্রে একটা কথা উল্লেখ্য, ‘ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি’ দেখতে বসে কিন্তু একঘেয়ে লাগে না। কারণ, শবরীর মতো চরিত্রের সঙ্গে আপনি অনায়াসেই মিশে যেতে পারবেন। প্রত্যেকটি মেয়ের মধ্যেই একজন ‘শবরী’ রয়েছে। শুধু সেটা অনুভব করা প্রয়োজন। প্রয়োজন নিজের মধ্যেকার শবরীকে জাগিয়ে তোলা। সেই বার্তা যে পরিচালকের সার্থক হয়েছে, তা হলে উপস্থিত মেয়েদের ফিসফসেই ঠাহর করা গেল! নারীকেন্দ্রিক ছবির মুখ্য চরিত্রে এইপ্রথম ঋতাভরী চক্রবর্তী। গোটা গোটা সংস্কৃত অক্ষর উচ্চারণ থেকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সামনে গলায় উত্তরীয় জড়িয়ে প্রশ্ন ছোঁড়া- ‘সমজের অশিক্ষা, কুসংস্কার শুষে নিতে ঠিক কতটা স্যানিটারি ন্যাপকিন প্রয়োজন?’ ঋতাভরী বেশ পারদর্শীতার সঙ্গেই ‘শবরী’কে ফুটিয়ে তুলেছেন পর্দায়।

বলিউডের কবীর সিংয়ের বন্ধু সোহম টলিউডে শবরীর বিক্রমাদিত্য

টলিউডে ‘জ্যৈষ্ঠপুত্র’তে আগেই ধরা দিয়েছেন সোহম মজুমদার। কিন্তু ‘ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি’র মধ্য দিয়ে এক নতুন সোহমকে আবিষ্কার করা গেল। এক্কেবারে আদ্যোপান্ত মধ্যবিত্ত বাঙালি ঘরের ছেলে। সাপোর্টিভ স্বামী বিক্রমাদিত্যর চরিত্রে সোহমের অভিনয়ও বেশ।  সোহমের পাশাপাশি  পুরোহিতের চরিত্রে শুভাশীষ মুখোপাধ্যায় এবং জ্যোতিষ পিসির চরিত্রে মানসী সিনহার অভিনয় বেশ কমিক এলিমেন্ট যোগ করেছে। যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন শাশুড়ির চরিত্রে সোমা মুখোপাধ্যায়। 

 

গল্পের ফোকাস শিফট হল না তো!

পৌরহিত্যে লিঙ্গভেদ কেন? সেই প্রশ্ন উত্থাপন করেই শুরু হয়েছিল শবরীর জার্নি। কিন্তু শবরীর মতো মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার গল্প বলতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আরও কয়েকটি প্লট উঠে এসেছে। পেশাগত ক্ষেত্রেও কেন লিঙ্গভেদ? মেয়েদের এরকম সামাজিক অবস্থানের জন্য কি মেয়েরাই দায়ী? শাখা-পলাতেও কি মেয়েদের সাম্যতা চাই? এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- নারীদেহ পুরোপুরি শুচি কি না? যাবতীয় প্লট একসুতোয় গাঁথতে গিয়ে শবরীর ‘গোপন কম্মটি’ খানিক ম্লান হয়েছে বটে, কিন্তু পৌরহিত্যের প্রশ্ন যখন ওঠে, তখন ‘নারীদেহ শুচি কি অশুচি’ সেই বিষয়টিও তার সঙ্গে ওতপ্রোতোভাবে জড়িত। কাজেই শবরীর পৌরহিত্যের সঙ্গে স্যানিটারি ন্যাপকিন তথা ম্যানস্ট্রুয়েশন হাইজিন নিয়ে সচেতনতার বার্তা দেওয়া- গল্পে প্যারালালি দেখে মোটেই অপ্রাসঙ্গিক মনে হয় না! এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করা জরুরি, কারণ অনেকেই ‘ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি’ বিষয়বস্তু নিয়ে মুক্তির প্রাক্কালে সন্দিহান ছিলেন।

কেন দেখবেন

প্রথম সিনেমাতেই বিষয়বস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন অরিত্র মুখোপাধ্যায়। ছকভাঙার গল্প নিয়ে বর্তমানে প্রচুর বাংলা ছবিই হচ্ছে। আমাদের গতেবাঁধা নিয়মগুলোকে প্রশ্ন করে চ্যালেঞ্জও ছুঁড়েছেন পরিচালক অরিত্র। সেইদিক থেকে খুব সহজ-সরল গল্প। পিরিয়ডসের ছুঁতমার্গ নিয়ে সিনেপ্রামীরা হয়তো এর আগেও একডজন সিনেমা দেখে ফেলেছেন। কিন্তু মেয়েদের পৌরহিত্যকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার কথা বোধহয় এভাবে এর আগে কোনও পরিচালক বলেননি। স্বামী-স্ত্রীর মিষ্টি রসায়ন, নারীদেহ শুচি কিনা, সেসবের থেকেও সংশ্লিষ্ট বিষয়টি উপস্থাপন করাতেই স্বার্থক শবরীর ‘গোপন কম্মটি’র গল্প।  

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement