নির্মল ধর: কালিনারি সিনেমার রেওয়াজ ইউরোপে আছে, ভারতে তেমন নেই। ওদেশে কালিনারি সিনেমা নিয়ে আলাদা উৎসব হয, কিংবা বড় মাপের উৎসবে ‘কালিনারি সিনেমা’ নামে আলাদা বিভাগ থাকে। বলিউডে ‘চিনি কম’ নামে একটি ছবি হয়েছিল কিছুদিন আগে। ওটাকে বলা যেতে পারে ভারতের প্রথম কালিনারি সিনেমা। বাংলায় রান্নাবান্না নিয়ে সিনেমার প্রথম নাম এই ‘মাছের ঝোল’। প্রতীম ডি গুপ্তকে বলতে পারি বাংলায় কালিনারি সিনেমার প্রথম মানুষ।

গল্পটি কীরকম? সেই কিশোর বয়সে দেবদত্ত হঠাৎই মায়ের জন্য একটা মাছের ঝোল বানিয়েছিল। খেয়ে তো মা ফিদা। সেই দেবদত্ত এখন দেব ডি হয়ে মাঝবয়সী। ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে বাবার অমতে রান্না শেখার কাজ নিয়ে তেরো বছর আগে বাড়ি ছেড়েছিল। প্যারিসে এখন তাঁর বুটিক নামে দু’দুটো রেস্তরাঁ। অন্য দেশেও ফ্র্যাঞ্চাইজিও আছে। সে এখন আন্তর্জাতিক মানের শেফ। টিভির পর্দায় নিয়মিত দেখা যায় তাঁকে। প্যারিসে ফরাসি বান্ধবী সিমঁর সঙ্গে লিভ ইন করে। এদিকে মায়ের কঠিন অসুখের খবর শুনে বারো বছর সাত মাস তেরো দিন পরে সাত হাজার আটশো একান্ন কিমি আকাশদূরত্ব ষোল ঘণ্টায় উজিয়ে দেবদত্ত আসে মাকে দেখতে। শেফ ছেলের কাছে মায়ের আবদার, ‘আমাকে সেই পঁচিশ বছর আগের মাছের ঝোল রান্না করে খাওয়া’। অসুস্থ মায়ের শেষ ইচ্ছে পূরণের আশায় দেব ডি বেশ কয়েকবার রান্না করে মাছের ঝোল। মায়ের পছন্দ হয় বটে, কিন্তু সেই আগের ঝোলের স্বাদ যেন ঠিক আসে না। কঠিন অপারেশনের আগের দিন জীবন-মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে মায়ের দেওয়া বড়ি নিয়ে বিশেষ এক পদ তৈরি করলে সেটি মায়ের পছন্দ হয়। ওটিই হয় সেরা মাছের ঝোল।

গল্পের গতি একমুখী, সরল। অতীতবৃত্তান্ত জানাতে টুকরো ফ্ল্যাশব্যাকের ব্যবহার ছবির গতি ব্যাহত করে না। কিংবা সাংবাদিক পলাশের সঙ্গে শেফের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার পর্বটিও মসৃণ। এমনকী তরুণী শেফের (সৌরসেনী মৈত্র) দেবদত্তর প্রতি নরম ক্রাশ গড়ে ওঠার ব্যাপারটিও মিষ্টি মধুর। বারো বছর আগে বাড়ি ছাড়ার সময় শুধু স্ত্রী শ্রীলাকে ফেলে যায়নি দেবদত্ত। তার পেটে অনাগত সন্তানও ছিল। এত বছর পরে সত্যটি সে জানতে পারে। পরিচালক-চিত্রনাট্যকার প্রতীমকে ধন্যবাদ- প্যানপ্যানে ঘ্যানঘ্যানে বাঙালি দর্শকের কথা ভেবে স্ত্রীর সঙ্গে দেবদত্তকে তিনি মিলিয়ে দেননি। আজকের সময় ও ভাবনাকে মর্যাদা দিয়েই দেব ডি-কে প্যারিসে বান্ধবী সিমঁর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। এই সাহসটুকু সাধারণ বাঙালি পরিচালকের হয় না।
অনুপমের গাওয়া ‘এখনও কিছুটা আলো ফোটা বাকি’ গল্পের সঙ্গে এবং পরিবেশ অনুযায়ী মানানসই। শুভঙ্কর ভড়ের সিনেমাটোগ্রাফিতে মাছের ঝোল রান্নার পর্বগুলি সুন্দর এসেছে। প্যারিসের আউটডোরেও তাঁর কাজ একইরকম দর্শনীয়। অভিনয়ে ঋত্বিক চক্রবর্তী সত্যিই ‘পাগলা করে দেবেন’ দর্শকদের। পরিভাষায় বলা যায়, ‘রিয়েলি হি ইজ এ মাইন অফ অ্যাকটিং’। বাবার সামনে ভীতু হয়ে থাকা আবার ঈষৎ মাতাল হয়ে বাবার সামনেই স্পর্ধাপূর্ণ সংলাপ বলা, এবং পরিত্যক্ত স্ত্রীর সামনে অপরাধবোধে আক্রান্ত স্বামীর অস্বস্তি সবই ঋত্বিক ফুটিয়েছেন তাঁর অসাধারণ অভিব্যক্তিতে। কখনও নীরব থেকে কখনও বাচিক অভিনয়ে। মায়ের চরিত্রে মমতা শঙ্করও চোখ ফেরাতে দেবেন না দর্শককে। বিশেষ করে শেষপর্বে চাপা আবেগ প্রকাশের দৃশ্যে। পাওলি দাম অত্যন্ত শান্ত ও সংযত, অথচ তাঁর অভিনয়েও চাপা ক্ষোভ স্পষ্ট। সিমঁর চরিত্রে কায়া ব্ল্যাক সেজ মন্দ না। বাবার ভূমিকায় সুমন্ত্র মুখোপাধ্যায় ও তরুণী শেফের চরিত্রে সৌরসেনী মৈত্র এবং মিঠু চক্রবর্তী ও অর্জুন চক্রবর্তীকে ভালই লেগেছে।
মাছের ঝোল কালিনারি সিনেমা হিসেব যেমন বাংলায় প্রথম, তেমনই ছবির শেষ পর্ব সত্যিই অপ্রত্যাশিত। দর্শক যে এক অন্য ঘরানার স্বাদ পাবেন তা বাজি রেখে বলাই যায়।
সর্বশেষ খবর
-
পরকীয়ার টান! তিন সন্তানকে ঘরে রেখে মোয়াজ্জিনের হাত ধরে পালালেন বাংলাদেশি মহিলা
-
সদ্যোজাত কোলে একদিনে ৭০টি রিল! জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সরের ‘আসক্তি’তে বিতর্কের ঝড়
-
‘কালের যাত্রায় পা মিলিয়ে’ মমতার সঙ্গ ছেড়ে বিধানসভায় চন্দ্রিমা, বৈঠক ঋতব্রত-সন্দীপনদের সঙ্গে
-
রাম মন্দিরের পর এবার বদ্রীনাথেও দানের টাকা চুরি! উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ
-
গাফিলতিতে ঢোকেনি অন্নপূর্ণার টাকা! ধূপগুড়ি পুরসভার ৩২ কর্মীকে শোকজ মহকুমা শাসকের