Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ৫ জুন ২০২৬
Farmers using special presticide to farm safed musli

ওষধি গুণে বাড়ছে জনপ্রিয়তা, সফেদ মুসলি চাষে লাখপতি কৃষক

আয়ুর্বেদ চিকিৎসকদের কাছে এটি ‘শ্বেত স্বর্ণ’ বা ‘দিব্য ঔষধি’ নামেও অত্যন্ত সুপরিচিত।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জুলাই ২০, ২০২২, ১৪:০১

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জুলাই ২০, ২০২২, ১৪:০১

options
link
ওষধি গুণে বাড়ছে জনপ্রিয়তা, সফেদ মুসলি চাষে লাখপতি কৃষক zoom

অ‌্যালকালয়েড, ভিটামিন, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, স্টেরয়েড এবং পলিস‌্যাফারাইড সমৃদ্ধ একবর্ষজীবী, বিরুৎ জাতীয় ভেষজ উদ্ভিদ সফেদ মুসলি। আয়ুর্বেদ চিকিৎসকদের কাছে এটি ‘শ্বেত স্বর্ণ’ বা ‘দিব‌্য ঔষধি’ নামেও অত‌্যন্ত সুপরিচিত। চাষিভাইরা সফেদ মুসলি চাষ করে প্রতি হেক্টরে ন্যূনতম ৪-৫ লক্ষ টাকা লাভ পেতে পারেন। লিখেছেন বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ব বিদ্যালয়ের গবেষক ড. তৃপ্তি নন্দী।

সফেদ মুসলির বিজ্ঞানসম্মত নাম Chlorophytum borivilianum। এটি ‘শ্বেত মুসলি’ বা ‘সফেদ মুসলি’, ‘সাদা মুসলি’ বা ‘ভারতীয় স্পাইডার’ গাছ নামেও পরিচিত। অ‌্যাসপারাগেসি পরিবারভুক্ত এই গাছটি অনেকটাই রজনীগন্ধা গাছের সঙ্গে সামঞ্জস‌্য বজায় রাখে। তবে ফুলগুলি আকারে রজনীগন্ধার তুলনায় সামান‌্য ছোট এবং মঞ্জরীদণ্ডের আগায় গুচ্ছাকারে ফোটে। ফুলের রং সাদা এবং বীজগুলি ছোট কালো রঙের হয়ে থাকে। পাতা ভল্লাকার এবং বহুশিরা বিশিষ্ট হয়। কেবলমাত্র ভারতবর্ষের বিভিন্ন জঙ্গলে (প্রধানত গুজরাত, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান শ্বেত মুসলির প্রধান উৎস)-এর সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হওয়ায়, আয়ুর্বেদিক জগতে এটি ভারতীয় বিরল প্রজাতি হিসাবেও পরিচিত এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এই ওষধি গাছটির চাহিদা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আয়ুর্বেদের মেটিরিয়া মেডিকায় ‘রাজ নিঘন্টু’ নামের প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থে সফেদ মুসলির উল্লেখ আছে। আয়ুর্বেদ চিকিৎসকদের কাছে এটি ‘শ্বেত স্বর্ণ’ বা ‘দিব‌্য ঔষধি’ নামেও অত‌্যন্ত সুপরিচিত।

Advertisement

সফেদ মুসলি গাছের উচ্চতা সাধারণত ১-১.৫ ফুট পর্যন্ত হয়। ভারতবর্ষের প্রধান এবং প্রচলিত একটি সমস‌্যা হল, যে কোনও অপ্রতিষ্ঠিত বা সর্বজনীনভাবে স্বীকৃতি না পাওয়া স্বল্প উচ্চতাসম্পন্ন গাছগুলিই সাধারণ মানুষের কাছে আগাছা হিসাবে পরিচিতি পাওয়ায় সহজেই এইসব ওষধি গুণসম্পন্ন এবং দুষ্প্রাপ‌্য গাছগুলিকে জংলা গাছ হিসাবে কেটে ফেলার একটা প্রবণতা দেখা যায়। এর ফলে এই জংলা গাছটিও অযৌক্তিকভাবে কেটে ফেলায় এবং এর যথাযথ সুরক্ষা না হওয়ার ফলে এর অস্তিত্ব ক্রমশ বিপন্ন হয়ে আসছে। তাই যে সমস্ত ওষধি গুণসম্পন্ন গাছগুলির সুরক্ষার জন‌্য IUCN (প্রকৃতি সংরক্ষণের জন‌্য আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন) বোর্ড তৈরি করা হয়েছে। যা এই ধরনের গুণসম্পন্ন গাছগুলিকে তালিকাভুক্ত করে এবং তাদের সুরক্ষার ব‌্যবস্থা করে সংরক্ষণের চেষ্টা চালাচ্ছে।

Chlorophytum borivilianum

সফেদ মুসলি চাষের জন‌্য সাধারণত উঁচু জমি বাছাই-এর প্রয়োজন হয়। জৈব পদার্থ বা হিউমাসযুক্ত দোঁয়াশ মাটি বা লাল মাটি এবং দোঁয়াশের মিশ্রণ আছে এমন মাটিতেই এই গাছ ভাল জন্মাতে পারে। জমিতে মাটি উঁচু করার পর হেক্টর প্রতি ১০-১৫ টন জৈব সার মাটিতে ভালভাবে মিশিয়ে নিয়ে মাটি সমান করে নেওয়া হয়। ২৫-৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের উষ্ণ এবং আর্দ্র আবহাওয়াযুক্ত তাপমাত্রা এবং ১৫০-২৫০ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাতের ফলে যে জলযুক্ত মাটি তৈরি হয়, সেরকম পরিবেশেই সফেদ মুসলির বৃদ্ধি এবং শিকড় ভালভাবে হতে দেখা যায়। তবে এই চাষে জমির জল নিকাশি ব‌্যবস্থা অবশ‌্যই উন্নত হওয়া প্রয়োজন। যেহেতু এই গাছের চারা সাধারণত বীজ থেকে তৈরি হয়ে থাকে, তাই এর চাষের জন‌্য উপযুক্ত বীজতলার প্রয়োজন পড়ে। তবে বীজ এবং গচ্ছিত মূল উভয়ের সাহায্যেই এর বংশবিস্তার ঘটে থাকে।

[আরও পড়ুন: বাড়িতে কৃত্রিম মরুভূমি বানিয়ে দুম্বা চাষ, আয়ের নতুন দিশা দেখালেন মালদহের মিরাজুল]

সাধারণত এপ্রিল মাসের শুরুতে বীজ বপন শুরু করলে মে মাসেই এর চারা তৈরি হতে দেখা যায়। বীজ থেকে চারা তৈরি হওয়ার পর চারাগুলি বেশ খানিকটা বড় হলে তখন মূল জমিতে চারাগুলিকে স্থানান্তরিত করা হয়। তবে পুরনো সফেদ মুসলি গাছের মূল জমিতে রোপণ করেও চারা তৈরি করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে হেক্টর প্রতি ৮০-৮৫ হওয়ার সফেদ মুসলি গাছের মূলের প্রয়োজন পড়ে। এইভাবে চারা তৈরিতে বীজতলা প্রস্তুতির কোনও প্রয়োজন পড়ে না এবং এই রোপণ পদ্ধতিতে চাষ অনেক বেশি সুবিধাজনক বলে মনে করে থাকেন চাষিভাইরা। চারা রোপণের সময় দুটি সারি এবং দুটি গাছের মধ্যে ন্যূনতম দূরত্ব ২৫-৩০ সেমি x ১০-১৫ সেমি হওয়া প্রয়োজন।

আমাদের রাজ্যে বর্ষাকাল সাধারণত মে মাসের শেষে বা জুনের শুরুতে লক্ষ করা যায়। তাই ওই সময় অর্থাৎ বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই মূলগুলিকে জমিতে লাগিয়ে ফেলা দরকার। মূলগুলি কাটার সময় কিছুটা সাবধানতা অবলম্বনের প্রয়োজন পড়ে। যেমন- মূলের গোছা থেকে কাটার সময় প্রতিটি মূলের আগায় যে শুঁটি মতে থাকে সেটিকে বাঁচিয়ে রেখে মূলগুলিকে যাতে কাটা হয় সেটা খেয়াল রাখতে হবে। বীজ বা মূল – যেটি থেকেই চারা তৈরি করা হয়ে থাকুক না কেন, প্রতি ক্ষেত্রেই ৩০-৪০ মিনিট ট্রাইকোডারমা ভিরিডি নামক দ্রবণে ডুবিয়ে রাখতে হবে। সাধারণত প্রতি কেজি বীজ বা মূলের জন‌্য প্রায় ৪ গ্রাম ট্রাইকোডারমা ভিরিডির প্রয়োজন পড়ে।

Chlorophytum-borivilianum

দ্রবণে বীজ বা মূল ডোবানোর পরে পাকাপাকিভাবে জমিতে স্থানান্তরের আগে জমিটি শোধনেরও প্রয়োজন পড়ে। তবে সময়মতো বর্ষা এ রাজ্যে না ঢুকলে বা পরিমাণ মতো বৃষ্টির অভাব হলে মাটির আর্দ্রতা কমে যায়। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী মূল বা চারা রোপণের দুই থেকে তিন দিন পর থেকেই জলসেচের প্রয়োজন পড়ে। এই জলসেচের ততদিনই প্রয়োজন হয় যতদিন না পর্যন্ত ঠিকমতো বর্ষা আসছে। তবে অতিরিক্ত বর্ষায় জমিতে যাতে জল না জমে যায় এবং গাছের না ক্ষতি হয়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন।

চারা লাগানোর পরে প্রথমে ৩০-৩৫ দিন এবং পরে ৫০-৫৫ দিনের মাথায় নিড়ানির সাহায্যে আগাছা পরিষ্কার করার প্রয়োজন হয়। এইভাবে চারা রোপণের পর আগাছা দমন এবং জল নিকাশির সুবন্দোবস্ত থাকলে প্রায় ৯৫-১১৫ দিনের মাথায় গাছগুলি তোলার উপযুক্ত হয়ে যায়। গাছের পাতা সম্পূর্ণরূপে হলুদ হওয়ার এক সপ্তাহ পর পর্যন্ত অপেক্ষা করে যখন গাছগুলি একেবারে শুকিয়ে যায়, তখন ধীরে ধীরে মাটি থেকে গাছগুলি তুলে মূল সংগ্রহের কাজ শুরু করা হয়। মূলগুলি সংগ্রহ করে ৪-৫ দিন ছায়াযুক্ত স্থানে ফেলে রাখা হয় যাতে প্রতিটি মূল গোছা থেকে আলাদা করা যায়। মূলগুলিকে আলাদা করে মূলগুলির উপর হালকা চাপ দিলে মূলের উপরের আস্তরণটি সরে আসে এবং ভিতরের সাদা দুধ রঙের মূলটি বেরিয়ে আসে। পরে এই মূলটিকে ভাল করে পরিষ্কার করে ১২-১৫ দিন পর্যন্ত রোদে শুকিয়ে নিয়ে পরিষ্কার একটি পলিথিনের ব‌্যাগে ভরে সংগ্রহ করে রাখা হয়।

[আরও পড়ুন: এবার পুকুর থেকেই মিলবে ইলিশ, গ্রামগঞ্জে রুপোলি শস্য চাষের নয়া উদ্যোগ নবান্নের]

সফেদ মুসলি উদ্ভিদটি মূলত অ‌্যাডাপটোজেন অর্থাৎ মানসিক চাপ হ্রাস করে। এই উদ্ভিদটির অনেক খাদ‌্যগুণ আছে যা সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ‌্য বজায় রাখতে সাহায‌্য করে। ওষধি গুণ প্রচুর পরিমাণে থাকায় জংলা এই উদ্ভিদটির চাষে চাষিভাইরা প্রচুর জনপ্রিয়তাও পেয়ে থাকেন। গবেষণার দ্বারা প্রমাণিত, যে সমস্ত ওষধিগুণ সফেদ মুসলির মধ্যে পাওয়া যায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ‌্য হল এর ব‌্যবহারে শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এটি উল্লেখযোগ‌্য মধুমেহ-বিরোধী ওষধি গাছ, যা আয়ুর্বেদ চিকিৎসকদের কাছে অত‌্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রক্তে হাইপোগ্লাইসেমিক অর্থাৎ রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে গেলে চিকিৎসকরা এর ব‌্যবহার করে থাকেন। এছাড়াও এর হাইপোলিপিডেমিক গুণ থাকায় এটি খারাপ কোলেস্টেরল হ্রাস ও ভাল কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, কার্ডিও ভাসফুলের সমস‌্যাজনিত রোগ নিরাময়ে ব‌্যবহৃত হয়ে থাকে।

Chlorophytum-borivilianum

সফেদ মুসলি চাষে প্রতি হেক্টর জমি থেকে আনুমানিক ৫৫-৬৫ কুইন্ট‌াল মূল সংগ্রহ করা যেতে পারে। ৫ কুইন্টাল কাঁচা মূলকে শুকনো করলে তা থেকে ১ কুইন্টাল শুষ্ক মূল পাওয়া যায়। শুকনো মূলকে গুঁড়ো করে বাজারজাত করা হয় এবং এর বাজারমূল‌্যও যথেষ্ট ভাল। প্রতি কেজি সফেদ মুসলির শুষ্ক মূল ১০০০-১২০০ টাকা মূল্যে বিক্রয় হয়ে থাকে। এই চাষে উৎপাদন খরচ হেক্টর প্রতি আনুমানিক ৬-৭ লক্ষ টাকা এবং প্রতি হেক্টরে ১১-১৩ কুইন্ট‌াল শুষ্ক মূল পাওয়া গেলে তার বিক্রয়মূল‌্য ১০-১১ লক্ষ টাকা হয়। ফলত এই  মূল বিক্রয় করে এর থেকে চাষিভাইরা সারা বছরে প্রতি হেক্টরে ন্যূনতম ৪-৫ লক্ষ টাকা লাভ পেতে পারেন। 

[আরও পড়ুন: ধানখেতে হাঁস পালন, দ্বিগুণ আয়ের মুখ দেখতে পারেন প্রতিপালকরা]

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.