নন্দিতা রায়, নয়াদিল্লি: সাদা পাঞ্জাবি-চুড়িদারের সঙ্গে হালকা সবুজ জ্যাকেটে শনিবার সকালে যখন তিনি নর্থ ব্লকে নিজের দপ্তরের দায়িত্বভার নিতে এলেন, সেখানে বেজায় ভিড়। ছুটির দিনেই নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দপ্তরের দায়িত্ব গ্রহণ করছেন, এমন বিরল চিত্রের দেখা যে সচরাচর মেলে না। তাছাড়াও তিনি যে অমিত শাহ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ তো বটেই, সঙ্গে এখনও পর্যন্ত বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতিও।
মোদি গুজরাটেরর মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীনও তাঁর সরকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের দায়িত্ব সামলেছেন শাহ। নিজের বিশ্বস্ত সেনাপতিকেই দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সামলানোর জন্য সরকারিভাবে দায়িত্ব দিয়েছেন মোদিই। সে কাজ তিনি দক্ষ হাতে সামলাবেন বলে সকলেরই আশা। পাশাপাশি, শাহকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে বসানোর পিছনে মোদি সরকারের আরও কিছু বিশেষ লক্ষ্য রয়েছে বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞমহল। আর তিনি সেই কাজ শুরু করে দিলেন প্রথম দিন থেকেই। দপ্তরের আধিকারিকদের নিয়ে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করলেন। সরকারের সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা প্রথম দিনেই জেনে নিয়েছেন। সেই মতোই তাঁর প্রধান কাজ কী হতে চলেছে তা জানিয়ে নিজেই টুইট করেছেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি লিখেছেন, “আজ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করলাম। আমার উপর বিশ্বাস রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করছি। দেশের সুরক্ষা এবং দেশবাসীদের কল্যাণই মোদি সরকারের সর্বাধিক অগ্রাধিকার, মোদিজির নেতৃত্বে আমি তা পূরণ করার সম্পূর্ণ চেষ্টা করব।”
প্রথম মোদি সরকারে বহু কাজ হলেও জম্মু-কাশ্মীরের সমস্যা সমাধান, নাগরিকত্ব বিল পাস করানো, জাতীয় নাগরিকপঞ্জির মতো বিষয়গুলিতে সরকারের সামনে এখনও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতেই শাহকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ, দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে এই কাজগুলিকে অগ্রাধিকার দিতে চান মোদি। বিজেপির নির্বাচনী ইস্তেহারে জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে একাধিক ‘সংকল্পের’ কথা বলা হয়েছে। নির্বাচনের প্রচারেও শাহ নিজে নাগরিকত্ব বিল পাস করানো নিয়ে জোরালো সওয়াল করেছেন। বাংলার মতো রাজ্যে জাতীয় নাগরিক পঞ্জির (এনআরসি) কথাও শাহ নির্বাচনী প্রচারে বারবার বলেছেন। দেশে অনুপ্রবেশ রোখার বিষয়টিকে বিজেপি বরাবরই গুরুত্ব দিয়ে আসছে। অনুপ্রবেশ আটকাতে কড়া ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শাহ যে উপযুক্ত ব্যক্তি, সেকথা মানছে ওয়াকিবহাল মহল। বিজেপির অন্দরে তাঁকে ‘চাণক্য’ বলা হয়। ক্ষুরধার বুদ্ধির সঙ্গে দক্ষ সংগঠক হিসেবেই এতদিন দল সামলেছেন। এবারে সেই দক্ষ হাতেই দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সামলানোর সঙ্গে সঙ্গে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পালা।
শুধুমাত্র প্রশাসনিক দায়িত্বই যে তিনি পালন করবেন না, বরং তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে দলের ভিতও শক্ত করবেন এমন কথা রাজনৈতিকমহলে শোনা গিয়েছে। মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ডের মতো রাজ্যে মাওবাদীরা নিত্যদিনের সমস্যা। চলতি বছরের কয়েক মাসের মধ্যেই মহারাষ্ট্র ও ঝাড়খণ্ডের মতো রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন রয়েছে। তার আগে সেখানকার মাও সমস্যার সমাধানের জন্য তাঁর দপ্তর বড়সড় পদক্ষেপ গ্রহণ করে মোদি সরকার তথা বিজেপির জন্য জমি শক্ত করে দেওয়ার কাজ করে ফেলবে বলেই মনে করা হচ্ছে। একইভাবে, বাংলাকে পাখির চোখ করেছে বিজেপি। বাংলায় অনুপ্রবেশ সমস্যা সমাধানের জন্য এনআরসি লাগু করার জন্য ঘর গোছানোর কাজও অচিরেই শুরু হতে পারে, এমন সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পাশাপাশি, আইন-শৃঙ্খলা রাজ্যের এক্তিয়ারে হলেও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকই হল একমাত্র দপ্তর যারা রাজ্য সরকারের কাছে এ বিষয়ে জবাবদিহি দাবি করতে পারে এবং প্রয়োজনে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে হস্তক্ষেপও করতে পারে।
শাহ এদিন দায়িত্ব গ্রহণ করেই দপ্তরের সচির রাজীব গৌবা এবং দপ্তরের দুই প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। বৈঠকে কাশ্মীর নিয়ে একপ্রস্থ আলোচনা হয়েছে বলেই জানা গিয়েছে। এদিনই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী জি কিষান রেড্ডির একটি মন্তব্যে বিতর্কের কারণে তাঁকে শাহ সতর্ক করেছেন বলেও জানা গিয়েছে। রেড্ডি দাবি করেন, হায়দরাবাদে সন্ত্রাসী কাজকর্ম বাড়ছে। বেঙ্গালুরু কিংবা ভোপাল, যেখানেই কিছু ঘটুক শিকড় মেলে হায়দরাবাদে। রাজ্য পুলিশ আর এনআইএ প্রতি দু’-তিন মাসে সেখান থেকে জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এআইএমআইএম সাংসদ আসাদউদ্দিন ওয়েইসি তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, গত পাঁচ বছরে এনআইএ, আইবি এবং র কতবার লিখিত দিয়েছেন যে হায়দরাবাদ জঙ্গিদের মুক্তাঞ্চল হয়ে উঠেছে? তাঁর এমন মন্তব্য দুর্ভাগ্যজনক।
অন্যদিকে, অমিত শাহ নামটিই যে বিজেপির নেতামন্ত্রীদের মধ্যে যথেষ্ট, এদিন তা ফের প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন শুক্রবারই মন্ত্রকের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছিলেন। অন্যদের মধ্যে অনেক মন্ত্রীই সরকারি কাজের দিন সোমবার দপ্তরের দায়িত্ব নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এদিন সকালে শাহ নিজের মন্ত্রকের দায়িত্ব নিয়ে নর্থ ব্লকে নিজের দপ্তরে হাজির হয়েছেন জেনেই সরকারি ছুটির দিনেও নিজ নিজ দপ্তরের দায়িত্বভার গ্রহণের জন্য তাঁরা ছুটে আসেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই মুখে বলেছেন যে, সময় নষ্ট না করে কাজ শুরু দিতে চাইছেন তাই ছুটির দিনেই দপ্তরে এসেছেন, কিন্তু আসল কারণ নর্থ ব্লকের অলিন্দেই লুকিয়ে রয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
সর্বশেষ খবর
-
কোথায় শওকত? ছেলেকে আটক করে হন্যে হয়ে খুঁজছে এনআইএ! তল্লাশি ভাইয়ের বাড়িতেও
-
‘শত্রু দেশ’কে হারিয়ে এশিয়ার সেরা! কিমের সঙ্গে নাচলেন ফুটবলাররা, ভাইরাল ভিডিও
-
জন্ম থেকে দলের ‘মালিকানা’ বদল, মমতার তৃণমূলের ২৮ বছরের ইতিবৃত্ত
-
জিনিয়াস স্পোর্টস নয়, আইএসএল আয়োজনের অধিকার খুব সম্ভবত পেতে চলেছে ক্লাবগুলি
-
ফেডারেশনের বৈঠকে রণক্ষেত্র টলিপাড়া, ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর বিরুদ্ধে ‘চোর চোর’ স্লোগানে ছোঁড়া হল ডিম