গৌতম ব্রহ্ম, ভাগলপুর: স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন রাজা। ভৈরব তলাব থেকে তুলে কালভৈরবকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করে নিত্যপুজোর ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু পুকুর থেকে ভৈরব মূর্তি তোলার সময়ই ঘটে গেল অঘটন। ভেঙে গেল নাকের ডগা। কিন্তু এ কী! ভাঙা অংশ দিয়ে গলগল করে বেরচ্ছে রক্ত। অবশেষে স্থানীয় এক স্বর্ণকার রুপোর নাক লাগিয়ে রক্তপাত বন্ধ করেন। মন্দিরে আনার সময়ও বিপত্তি। কালভৈরব আরূঢ় গরুর গাড়ির চাকা নড়ছেই না। ফের স্বপ্নাদেশ পেলেন রাজা। পাঁঠাবলি দিতে দিতে দেউড়ি মহাশয় রাজবাড়িতে আনা হল কালভৈরবকে। সেই থেকেই মাছ-মাংস সহযোগে চম্পানগর রাজবাড়িতে পূজিত হচ্ছেন কালভৈরব।
মন্দিরের দাওয়ায় বসে একটানা বলে যাচ্ছিলেন পুরোহিত দিলীপ ভট্টাচার্য। বয়স ৭০ ছুঁইছুঁই। পৌরোহিত্য করার আগে আদালতে কাজ করতেন। জানালেন, “কালভৈরব অত্যন্ত জাগ্রত। এই আমি আপনাকে গল্প বলছি, এটাও উনি শুনছেন।” দিলীপবাবুর দাদু গৌরনারায়ণ চক্রবর্তী রাজাকে মন্ত্র দিয়েছিলেন। সেই হিসাবে দিলীপবাবুরা রাজপরিবারের কুলগুরুর মর্যাদাও পান। পঞ্চচূড়ার বিরাট মন্দির, যার আনাচকানাচ জুড়ে ছড়িয়ে আছে হরেক রূপকথা। এখানেই না কি বেহুলা লখিন্দরের লৌহ বাসর। এখানেই বেহুলার অনুরোধে চাঁদ সওদাগর বাঁ হাতে মনসার পুজো করেছিলেন। এখানে নাকি এখনও নাগ-নাগিন রয়েছে। দিলীপবাবু জানালেন, তিনি নিজের চোখে নাগ-নাগিন দেখেছেন। মাথায় জ্বলজ্বল করছে মণি। নাকে নোলক। কিন্তু কখনও কাউকে কাটেনি। একবার এই ভৈরব মন্দির থেকেই এক বিরাট নাগ বেরিয়েছিল। তাই দেখে মন্দিরের এক দাসীর সে কী দৌড়! কাপরচোপড় খুলে দৌড়েছিল। কেউ ভয় পেলেই নাকি নাগ-নাগিন তাড়া করে। আজ পর্যন্ত কারও ক্ষতি করেনি এরা। ভৈরবস্থান মন্দিরের পিছনেই রয়েছে মনসাতলা। রাজাকে স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন বেহুলা। লোহার বাসর ঘরের আদলেই সেই মনসাতলা তৈরি। এখানেই নাকি বাস সেই নাগ-নাগিনের। আর এই ঐতিহাসিক-জাগ্রত মন্দিরে মাথা ঠেকিয়ে, পুজো দিয়ে তবেই ভোটের প্রচারে বেরচ্ছেন ভাগলপুরের ভোটপ্রার্থীরা। ছবি তুলতে গিয়ে বেশ ছমছম করছিল গা। চারিদিকে জঙ্গল, চারশো বছরের পুরনো তালাবন্দি ঘরদোর। মনে হচ্ছিল এখনই বুঝি সেই সাপেদের রাজারানি আগন্তুককে দেখে ফোঁস করে উঠবেন।
বাইরে বেরিয়ে ছবি তুলতেই ছুটে এলেন এক ভদ্রলোক। নাম কার্তিক চট্টোপাধ্যায়। জানতে চাইলেন পরিচয়। বাংলা থেকে আসা সাংবাদিক শুনে বললেন, “চলুন রানিমার সঙ্গে দেখা করবেন।” প্রায় ষোলোটি ঘর অতিক্রম করে বৈঠকখানায় পৌঁছলাম। সেখানেই মিনিট পনেরো পর আবির্ভূত হলেন রানিমা। নাম দীপছন্দা ঘোষ। আমার পরিচয় জানার পরেই নিজে হাতে জলখাবার পরিবেশন করলেন। বললেন, “সাপ এখানে ঘরের কোনায় কোনায়। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অনেক সাপ মারতে বাধ্য হয়েছি।” চা খেয়ে বিকেলের প্রতিদিনের কপি ধরিয়ে বাইরে এলাম। আমার পিছনে বিরাট দুর্গামন্দির। সামনে মসজিদ। কার্তিকবাবু জানালেন, “এই মসজিদ রাজা তৈরি করিয়ে দিয়েছিলেন। রাজবাড়িতে সেরেস্তায় এক মুন্সি ছিলেন। তাঁর নমাজের সুবিধার জন্য এই মসজিদ তৈরি হয়।”
ভাগলপুরের দাঙ্গায় ১৯৭৯ সালে সেই মসজিদ ভাঙা পড়ে। ফের মসজিদ তৈরি করা হয়। কার্তিকবাবু জানালেন, এই চম্পানগরে দেড়শো ঘর বাঙালি পরিবার আছে। মহল্লার নাম বাঙালিটোলা। চম্পানগরের বাকি অংশজুড়ে রয়েছে মুসলিম ও জৈন। দীপছন্দাদেবীও জানিয়েছিলেন, এখানে হিন্দু-মুসলিম মিলেমিশে আছে। মন্দিরের আজানের শব্দে কীর্তনের সুর মেশে। সিল্কের পাওয়ারলুমের আওয়াজ সঙ্গী হয় জৈন স্তোত্রের। দুর্গামাকে নমস্কার করে বড় রাস্তায় এসে পড়লাম। হাতে দুটো বিগ শপার। তাতে ভাগলপুরি সিল্কের শাড়ি, চাদর ও ওড়না। সিল্ক কারবারিদের দেখতে এসে কিঞ্চিৎ শপিং করে ফেলেছি। উল্লেখ্য, ভাগলপুরকে সিল্ক গোটা দেশ তথা বিশ্ব চেনে। এখানকার তসর সিল্ক ভুবনবিখ্যাত। সময়ের সঙ্গে ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এখনও চম্পানগরের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই চলে সিল্কের বুনন। হাতে বোনা চরকার জায়গা নিয়েছে পাওয়ারলুম। চম্পানগরের শিরা-উপশিরায় সেই পাওয়ালুমের আওয়াজই এখন শোনা যায়। রেশম কারবারিরা জানালেন, “সরকার বিনি পয়সায় বিদু্যৎ দিচ্ছে তাই ব্যবসা করতে পারছি। তবে সরাসরি রাজ্য সরকার আমাদের কাছ থেকে মাল কিনে নিলে লাভের অঙ্কটা বাড়ত।” এখানকার অন্যতম বড় ব্যবসায়ী মহম্মদ সুলতান জানালেন, ভাগলপুরে বরাবরই জাতপাতের ছুঁতমার্গ নেই।
সর্বশেষ খবর
-
১৫ বছর বয়সেই কোটি কোটি সম্পত্তি, নাবালক বৈভবকে কি আয়কর দিতে হয়?
-
দিল্লিতে মোদির সঙ্গে বৈঠকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট, হরমুজ হাহাকার কাটিয়ে মিলবে জ্বালানি সমাধান?
-
প্রয়াত পদ্মশ্রী সাহিত্যিক রবিলাল টুডু, রোগভোগের পর না ফেরার দেশে ‘বীর বীরসা’র স্রষ্টা
-
বিশ্বকাপের আগে ‘অমানবিক’ ফিফা! দর্শকদের ভোগান্তি বাড়তে পারে এই সিদ্ধান্তে
-
দাউদ ইব্রাহিমের হাড়হিম হুমকি, ‘তোর খেলা শেষ’, আইপিএলের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা শোনালেন ললিত