৮ জ্যৈষ্ঠ  ১৪২৬  বৃহস্পতিবার ২৩ মে ২০১৯ 

Menu Logo নির্বাচন ‘১৯ মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

কৃষ্ণকুমার দাস, চিতোরগড়: রানি পদ্মিনীর পাগল করা রূপের মোহে, না আরাবল্লি পর্বতের নিচের রুপোর খনির বিপুল সম্পদের জন্য ১৩০৩ সালে চিতোর আক্রমণ করেছিলেন দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি? পরিচালক সঞ্জয় লীলা বনশালি তাঁর পদ্মাবত সিনেমায় রানি পদ্মাবতীর চরিত্রহনন ইচ্ছাকৃত করেছেন, না কারও উসকানিতে ধর্মীয় উন্মাদনা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পরিকল্পিত বিক্ষোভ ছিল? আপাতত এসব এখন ধামাচাপা।

[জঙ্গিদমনে বড় সাফল্য সেনার, যৌথ বাহিনীর অভিযানে খতম ২ জেহাদি]

রানা কুম্ভের হাতে ১৪৪৮ সালে তৈরি কুম্ভশ্যামজি দেবস্থানের পাশের মীরাবাঈয়ের মন্দির সংস্কার (বছর দু’য়েক আগে মীরার মন্দিরের চাঙড় খসে পড়া নিয়ে বিস্তর হইচই হয়েছিল) নিয়েও আগ্রহ নেই কোনও চিতোরবাসীর। কিন্তু সেই চিতোরের রাজপুত, ব্রাহ্মণ, সংখ্যালঘু, সিন্ধ্রি, ক্ষত্রিয় সবাই এখন মগ্ন নতুন রণাঙ্গনে। রানি পদ্মিনীর চরিত্র বিকৃতির দায়ে এক বছর আগে এই শিশোদিয়া রাজপুতদের রাজধানী চিতোরগড়ে ভিলেন ছিল বলিউডের ‘পদ্মাবত’ সিনেমা। স্পষ্ট বললে, পরিচালক সঞ্জয় লীলা বনশালি। রোষের মুখে পড়েছিলেন স্বয়ং অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোনও। কিন্তু এবার ভোটের মুখে রাজস্থানের চিতোরগড় সংসদীয় কেন্দ্রে পুরোপুরি খলনায়ক ‘পাকিস্তান’। কারণ, চিতোরগড় সংসদীয় কেন্দ্রের তিন তিনজন বাসিন্দা সেনা দু’মাস আগে পুলওয়ামায় শহিদ হয়েছেন। বালাকোটে সেই হামলার বদলা নেওয়ার দিন চিতোরগড় জুড়ে উৎসব করেছিল ছাত্র-যুবরা। পদ্মিনীর কথা ভুলে গিয়ে সেই থেকে আপাতত বিতর্কের কেন্দ্রে রাজস্থান সীমান্ত লাগোয়া পাকিস্তান। সীমান্ত পারের শত্রুদের ঘিরে ক্ষোভের আগুন ধিকি ধিকি জ্বলছিল, চিতোরগড়ে জনসভা করে তা আরও উসকে দিয়ে গিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মোদি।

উদয়পুর থেকে গাড়ি ছুটিয়ে যখন চিতোরগড় পৌঁছলাম, সূর্য তখনও মধ্যগগনে পৌঁছয়নি। বুঝলাম, এবছর ভোটের ময়দানে রাজপুতদের সঙ্গে ব্রাহ্মণদের আরেক নতুন রণাঙ্গনের জন্ম দিয়েছে। চার মাসের আগের বিধানসভা ভোটের ফল বলছে, কেন্দ্রের আট বিধানসভার চারটি কংগ্রেস ও চারটি বিজেপির দখলে গিয়েছে। সারাদিন বারিসাদরি, নিমবেহরা, মাভিল, প্রতাপগড় ঘুরেছি। গাড়ি চালক থেকে, স্কুল শিক্ষক, কলেজের অধ্যাপক, খনি শ্রমিকদের সুপারভাইজার, অনেকের সঙ্গেই কথা বলে স্পষ্ট, রাজস্থানের সেরার সেরা হওয়ার লড়াই হবে রানি পদ্মিনীর শহরে।

মরুরাজ্যে জাতপাতের রাজনৈতিক সমীকরণে প্রার্থী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কংগ্রেস চিতোরে এবার বিজেপিকে জোর ধাক্কা দিয়েছে। বর্তমান সাংসদ ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের চন্দ্রপ্রকাশ যোশীকেই ফের প্রার্থী করেছে বিজেপি। মাত্র ৪৩ বর্ষীয় যোশী বিজেপির যুব সংগঠনের রাজ্য সভাপতি। অন্যদিকে কংগ্রেস প্রার্থী করেছে রাজপুত বংশীয় প্রাক্তন সাংসদ গোপাল সিং ইড্ডাকে। উল্লেখ্য, রাজপুত ও ব্রাহ্মণ, দু’ই সম্প্রদায়ের ভোট এই কেন্দ্রে ২২ শতাংশ করে। কংগ্রেস প্রার্থীর দাবি, রাজপুত ছাড়াও আমাদের সঙ্গে রয়েছে মুসলিম, আদিবাসী এবং তফসিলি সম্প্রদায়ের ভোট। যদিও কংগ্রেসের এমন দাবি অযৌক্তিক ও হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিলেন চন্দ্রপ্রকাশ।

ভারতীয় রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে চিতোর থেকে এর আগে জিতেছেন দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বিজেপির যশবন্ত সিং, কংগ্রেসের গিরিজা ব্যাস। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, ১৯৫২ সালে এই চিতোর থেকে জিতেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত জনসঙ্ঘের সাংসদ ইউ এম ত্রিবেদী। গতবার গিরিজা ব্যাস প্রায় তিন লক্ষ ভোটের ব্যবধানে হেরে যান চন্দ্রপ্রকাশের কাছেই। পাঁচ বছরে বিজেপি সাংসদ মাভলি থেকে মারওয়াড় পর্যন্ত রেললাইন ব্রডগেজ এবং চিতোরের এক্সপ্রেসওয়েকে ছয় লেনের করিয়েছেন। দুই নির্মাণই প্রায় সম্পূর্ণ। এতদিন পাসপোর্ট করতে চিতোরবাসীকে ১১০ কিলোমিটার দূরের সেই উদয়পুর যেতে হত। কিন্তু ভোটের আগেই খাস চিতোর শহরে পাসপোর্ট কেন্দ্র চালু করে আগের দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকেও লজ্জায় ফেলে দিয়েছেন সি পি যোশী। কিন্তু পিছিয়ে পড়তে রাজি নন, কংগ্রেস প্রার্থী গোপাল সিং। মাভিল গার্লস কলেজে কংগ্রেসের টিচার সেলের সভা করে বেরোতেই ধরলাম। ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলাম, “চন্দ্রপ্রকাশ এত কাজ করার পরেও কেন আপনি জিতবেন?” জেতার কথা শুনে যেন মুখে একটু বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে গেল। ভোটের ময়দানে ছুটে বেড়ানো ৬৮ বছরের যুবা বললেন, “রেললাইন ব্রডগেজ করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে গিয়েছেন রাজস্থান থেকে নির্বাচিত প্রাক্তন কংগ্রেস সাংসদ, রেলমন্ত্রী ড. সি পি যোশী। তাঁর সময়ে কাজ শুরু হয়েছে মাত্র।”

ভোটের মুখে রানি পদ্মিনীর জহরব্রত নিয়ে যে বিষয়টি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে তা অবশ্যই অভিনব এবং ইতিহাসের ছাত্রদের গবেষণার বিষয়। রানি পদ্মিনী নয়, খিলজি এসেছিলেন তৎকালীন চিতোরের অধীনে থাকা রুপোর খনি দখল করতে। উদয়পুরবাসী দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গবেষক ডঃ বিবেক ভাটনগর দাবি করছেন, “একসময় চিন থেকে রুপো আসত। তা দিয়ে মুদ্রা বানাতেন সুলতান। কিন্তু চিন সেই জোগান বন্ধ করায় নিজের মুদ্রা তৈরি নিয়ে সংকটে পড়েন আলাউদ্দিন। খবর পান, বিপুল পরিমাণে রুপোর সঞ্চিত রয়েছে মেবার রাজ্যে। তাই চিতোর আক্রমণ করেন।” যে খনির লক্ষ্যে খিলজি আক্রমণ করেছিলেন সেটা এখন উদয়পুর সংসদীয় কেন্দ্রের অধীন, তবে চিতোরগড়ের মধ্যে দরিবা খনিটি। ভোটের ফল যাই হোক, বলিউডের রাজস্থানের কাহিনি কিন্তু ধাক্কা খাবে যদি ভাটনগরের তথ্য সত্য হয়।

[১.৫ কোটির সাদা ঘোড়ায় চেপে প্রচার করছেন দিনমজুর প্রার্থী]

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং