BREAKING NEWS

২৩ জ্যৈষ্ঠ  ১৪২৭  শনিবার ৬ জুন ২০২০ 

Advertisement

‘দলে সম্মান নিয়ে কাজ করতে পারছিলাম না’, তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিলেন শোভন

Published by: Sulaya Singha |    Posted: August 16, 2019 10:46 pm|    Updated: August 17, 2019 12:44 am

An Images

সদ্য বুধবার বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ও তৃণমূল কংগ্রেসের এক সময়ের প্রথমসারির নেতা শোভন চট্টোপাধ্যায়। তাঁর হাত ধরেই বন্ধু অধ্যাপিকা বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিজেপিতে যোগ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সক্রিয় রাজনীতির ময়দানে পা দিয়েছেন। পদ্মশিবিরে যোগ দেওয়ার পরে প্রথম কোনও বাংলা পোর্টালের সঙ্গে মন খুলে কথা বললেন শোভন-বৈশাখী। নতুন শুরু হওয়া রাজনৈতিক সফর থেকে ব্যক্তিগত জীবন। অভিযোগ থেকে অনুযোগ। বাদ গেল না কিছুই। শুনলেন নন্দিতা রায়সোমনাথ রায়

প্রশ্ন: একসময় আপনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়াসঙ্গী ছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও সামলেছেন। এখন নতুন দল। নতুন মতাদর্শ। কীভাবে মানিয়ে নেবেন নিজেকে?

শোভন: বিজেপির রাজ্য ও কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃত্বর সঙ্গে আমার বিস্তারিত কথা হয়েছে। ওঁরা একটা চিন্তাভাবনা নিয়ে বাংলায় সংগঠন তৈরি করেছেন। তা আরও উন্নত করতে ওঁদের নতুন নতুন পরিকল্পনা আছে। সেই কারণে আমাকেও দলে নেওয়া হয়েছে। কলকাতায় ফিরে রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করব।

প্রশ্ন: শিক্ষাবিদ বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় হিসাবেই আপনার পরিচিতি। সক্রিয় রাজনীতিতে কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নেবেন?

বৈশাখী: যেদিন থেকে পড়াতে এসেছি, সেদিন থেকেই শিক্ষক আন্দোলনে জড়িয়েছি। ওয়েবকুটা, ওয়েবকুপার দায়িত্ব সামলেছি। বৃহত্তর রাজনীতিতে এই প্রথম। এতদিন যেভাবে কাজ করে এসেছি, এখনও তা করব। আমার সৌভাগ্য যে, শোভনদার মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সবসময় সঙ্গে থাকেন। ওঁর ভাবাদর্শ, মতাদর্শে আমার বিশ্বাস আছে। জানি কোথাও হোঁচট খেলে ওঁর অভিজ্ঞ পরামর্শ আমায় পথ দেখাবে। তাই আত্মবিশ্বাসী।

প্রশ্ন: গত দু’বছর আপনাদের ব্যক্তিগতভাবে প্রচুর আক্রমণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও হয়তো সেই আক্রমণের সামনে পড়তে হবে। এর মোকাবিলা কীভাবে করবেন?

শোভন: শোভন আর বৈশাখী দু’জন আলাদা সত্তা। দু’জনে নিজেদের জায়গায় নিজেদের মতো কাজ করছিলাম। ২০১৭-র আগস্ট নাগাদ দেখলাম এত ভাল কাজ করা সত্ত্বেও ওয়েবকুপার কমিটি ভেঙে বৈশাখীকে সরিয়ে দেওয়া হল। বলা হল আমায় শিক্ষা দিতে এটা করা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে দলে অভিযোগ জানাই। আমায় কিছু বলার থাকলে সরাসরি কথা বলা যেত। দলে, মন্ত্রিসভায় যেভাবে দিদি আমাদের নামে অপপ্রচার, দোষারোপ করছিলেন, তা মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। তাহলে সম্মানের সঙ্গে আপস করতে হত। প্রতিকারও হয়নি। দলে কাজ করার জায়গাও পাচ্ছিলাম না। তাই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলাম।

[আরও পড়ুন: শোভনে মুগ্ধ দিলীপ, কলকাতায় ফিরলেই প্রাক্তন মেয়রকে সংবর্ধনার ঘোষণা রাজ্য সভাপতির]

প্রশ্ন: এই পরিস্থিতি সামাল দিতে আপনি কীভাবে নিজেকে তৈরি রাখছেন?

বৈশাখী: ষড়যন্ত্র ছক কষে আটকানো যায় না। অপপ্রচারের উত্তর একটাই হতে পারে, গুরুত্ব না দেওয়া। তবে বিশ্বাস করি অশুভ শক্তির পরিমাণ সবসময় কম হয়। আমি ইতিবাচক চিন্তা করতে পছন্দ করি। এত অপপ্রচার সত্ত্বেও বন্ধু, সহকর্মীরা আমায় নিয়ে কখনও ফিসফাস করেনি। কারণ যারা এগুলো করেছে, তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই সাধারণের মনে প্রশ্ন আছে। এটাই আমাদের নৈতিক জয়।

প্রশ্ন: শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকের সঙ্গেই কথা বলেছেন। তাঁরা আপনাকে কীভাবে কাজে লাগাতে চান?

শোভন: প্রথমদিন শুধু সৌজন্যমূলক কথাই হয়েছে। কলকাতা ফিরে সবার সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক হবে সব। রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ একদিন দেখা করে বলেন, আর কতদিন এভাবে বসে থাকবেন। এই কথাগুলো আর ফেরাতে পারিনি। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। আশা করি আগামিদিনে এর ফলপ্রসূ ভূমিকা দেখতে পাবেন।

প্রশ্ন: শোভনবাবুর এতদিনের রাজনৈতিক গুরুকে আমরা সবাই জানি। আপনার গুরু কে? তাঁর থেকে কী কী টিপস নেবেন নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলতে?

বৈশাখী: শোভন চট্টোপাধ্যায়। উনি আমার বন্ধু, অভিভাবক। শোভনদার ব্যক্তিত্বের সবথেকে বড় গুণ হল, উত্তেজিত হন না। দীর্ঘ রাজনৈতিক কেরিয়ারের জন্য বড্ড ঠান্ডা মাথায় কাজ করেন। মাটির গন্ধ নিয়ে ওঁর বড় হওয়া। তৃণমূল স্তরের সমস্যা সমাধানের যে ভঙ্গি, তা থেকেই এতদিন আমায় পথ দেখিয়েছেন, আশা করি সেভাবেই আমায় ও বাকিদের সমৃদ্ধ করে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। একটা রাজনৈতিক দল তখনই সমৃদ্ধ হয় যখন আমিত্ব থেকে বেরিয়ে এসে সবাইকে নিয়ে চলা হয়। উনি এরই প্রতিমূর্তি। বিভাজন নয় ঐক্য বজায় রেখে শোভনদা এভাবেই বিজেপিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

প্রশ্ন: আপনার স্ত্রী বারবার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অভিযোগ করে যাচ্ছেন…

শোভন: আমি ২৪ ঘণ্টা রাজনীতির মধ্যে ছিলাম। সংসারে সুড়ঙ্গ কেটে কী হয়েছে খবর পাইনি। ২০০৮ থেকে স্ত্রী রত্না বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে পিছন থেকে ছুরি মেরে সম্পর্কটা শেষ করে দিয়েছে, তা বিশ্বাস করতে পারিনি। আমার সেজো ভাই জানায় অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় নামে একজনের সঙ্গে রত্না জড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ওঁদের যাওয়া আসার প্রমাণ পাই। আমি সেগুলো দিদিকে জানাই। উনি বলেন, তোর বড় বিপদ। খুন হয়ে যেতে পারিস। বলেন, ঘর ছাড়তে। সেই কথা মেনেই ডিভোর্সের নোটিস দিই। যা করেছি দিদির পরামর্শ, নির্দেশ মেনে। দিদি ধমক দিয়ে বলেছিল তোর সন্তানরা অশিক্ষার শিকার হচ্ছে। অথচ সেই তিনিই আজ আমায় কাঠগড়ায় তুলছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃণমূলকে প্রতিষ্ঠা করতে কী করেছি, তা সবাই জানে।

প্রশ্ন: তৃণমূলের বর্তমান অবস্থাকে কীভাবে দেখছেন?

শোভন: বলা হয়েছিল ৪২-এ ৪২। সেটা ৪১, ৪০ হতে পারত। ২২-এ কেন নেমে এল? আসলে দলের পুরনো কর্মীরা এই বিরোধীশূন্য করে দেওয়ার বিষয়টা মানতে পারেনি। অপোজিশন ইজ দ্য মিরর অফ দ্য পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি। এটাই হওয়ার ছিল।

প্রশ্ন: আপনি বিজেপিতে যোগ দিয়েই বলেছিলেন পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রক্রিয়ার বিরোধিতা দলের মধ্যে করেছিলেন। অথচ পার্থবাবু বলছেন সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা।

শোভন: আমি পার্থবাবুকে কেন বলতে যাব? ওঁর জানার অধিকার সীমিত সেটা জানা উচিত। আমি দিদিকে যা বলার বলেছি। উনি জিজ্ঞেস করতে পারেন। বাম আমলে জীবন শঙ্কায় ফেলে কাজ করেছি। আজ বাংলার অবস্থা তার থেকেও খারাপ। এই পরিস্থিতিতে মানুষের রায়কে মেনে নিতে ওদের তৈরি থাকা উচিত।

প্রশ্ন: আপনি দিনকয়েক আগেই পদত্যাগ করার সময় পার্থবাবু বলেছিলেন মিটমাট হয়ে যেতে পারে। হল না কেন?

বৈশাখী: আমার কলেজের বিষয়টা আলাদা। সেখানে একটা সমস্যা তৈরি হয়েছিল। যিনি করেছিলেন পার্থবাবু, এমনকী মুখ্যমন্ত্রীর নাম করে সমস্যা তৈরি করেন। আমার কোনও সহকর্মী চাননি আমি পদত্যাগ করি। তখন সস্নেহে শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন পদত্যাগ স্বীকার করছেন না। বাকি জানি না।

প্রশ্ন: তাহলে কি আমরা বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়কে নতুন মঞ্চে, নতুন ভূমিকায় দেখতে চলেছি?

বৈশাখী: নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। জানি এটা পার্টটাইম হতে পারে না। শোভনদাকে দেখেছি কীভাবে দিনরাত এক করে কাজ করেছেন। প্রয়োজনে অধ্যাপনা থেকে ছুটি নিয়ে মানুষের কাজ করব। জানি আগামী দু’-তিন বছর বাংলার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: আপনারা যেদিন যোগ দিতে আসেন, সেদিন তৃণমূল বিধায়ক দেবশ্রী রায়কেও বিজেপি সদর দপ্তরে দেখা যায়। এই বিষয়ে আপনারা কী কিছু জানতেন?

শোভন: উনি রায়দিঘির বিধায়ক। অথচ তাঁর অনুপস্থিতি সংগঠনের কাজ করতে সমস্যায় ফেলে দিত। ওঁকে যখন দেখি, তখন নাড্ডাজিকে জানাই উনি যোগ দিলে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ যে সম্মান ও মর্যাদার প্রশ্নে তৃণমূল ছেড়ে এসেছি, সেটা প্রশ্নের মুখে পড়ছে, এক বৈরিতার সৃষ্টি হচ্ছে। ওঁকে কে এখানে এনেছে, এখনও জানা যায়নি। অনাহূতের মতো এসেছে, চলেও গেছে। হতে পারে তৃণমূলের একটা চাল। আমরা খুশি যে বিজেপি আশ্বাস দিয়েছে ওঁরা এই বিষয়ে জানেন না ও ভবিষ্যতে এমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

[আরও পড়ুন: স্ত্রী’র জন্মদিনে বেড়াতে গিয়ে গৃহকর্তার মৃত্যু, বিপর্যস্ত বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তির পরিবার]

প্রশ্ন: দেবশ্রীকে বিজেপিতে যোগ দিতে আটকালেন কেন?

শোভন: আমার ব্যক্তিগত সমস্যার জন্য যে বিভিন্ন পারিবারিক ষড়যন্ত্র হয়েছে, তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেবশ্রী রায় জড়িত। তাই ওঁর সঙ্গে যোগ দিতে চাইনি।

প্রশ্ন: সংবাদমাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি, আপনি নাকি অমিত শাহের কাছে অতিরিক্ত নিরাপত্তা চেয়েছেন। বিষয়টা ঠিক কী?

শোভন: উনি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। দলের সর্বভারতীয় সভাপতি। প্রচুর ব্যস্ত। কে বা কারা এসব বলছেন, জানি না। এটা ঠিক যে বিভিন্ন ঘটনা, প্রাণনাশের আশঙ্কায় আমায় জেড প্লাস নিরাপত্তা দেওয়া হত। হঠাৎ দু’বছর আগে তা ওয়াই প্লাস করা হয়। এই নিরাপত্তা দেওয়া ও তোলা, দু’ক্ষেত্রেই মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা থাকে। তিনিই হয়তো সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অমিতজির কাছে আমি এই নিয়ে কিছুই বলিনি।

প্রশ্ন: আপনার ক্ষেত্রেও শোনা যাচ্ছে যে মহিলা মোর্চা ও বুদ্ধিজীবী সেলে পদ পাওয়ার জন্যই এসেছেন।

বৈশাখী: এগুলো সুপরিকল্পিতভাবে করা অপপ্রচার। কোন পদ, কী দায়িত্ব এসব কোনও কথাই হয়নি। নেতৃত্ব অনেক বৃহত্তর চিন্তা করছে। এসব বিষয় নিয়ে আমি আবদার করবই বা কেন? বা ওঁরা প্রশয় দেবেন কেন।

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement