পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে বিশিষ্ট আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামীকে রাজ্যসভায় মনোনয়ন রাজনীতির অন্দরে একাধিক স্তরে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করছে। ঘোষিত সমকামী, মানবাধিকারপন্থী ও সংবিধান-বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁর পরিচয় এই সিদ্ধান্তকে একটি সাংগঠনিক পদক্ষেপের বাইরে নিয়ে গিয়ে বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে তুলে ধরেছে।
সাদা চোখে অনেকেই সাম্প্রতিককালে রাজ্য সরকারের হয়ে মেনকার সুপ্রিম কোর্টে মামলা লড়ার বিষয়টিকে দেখছেন। তবে, শুধুমাত্র সেই কারণেই তাঁকে তৃণমূলের টিকিটে রাজ্যসভায় পাঠানোর মত বড় সিদ্ধান্ত পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রহণ করেছেন মনে করলে বিষয়টি ক্লিশে হয়ে যায়। গুরুস্বামীকে রাজ্যসভার জন্য মনোনীত করে এক ঢিলে মমতা যে কটা পাখি মারলেন তার উত্তর ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। যার ফল সুদূরপ্রসারী হবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আরও পড়ুন:
অন্তর্ভুক্তির রাজনীতি ও প্রগতিশীল বার্তা
মেনকা গুরুস্বামী ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ঐতিহাসিক রায় সমকামিতাকে অপরাধমুক্ত করার মামলায় (ধারা ৩৭৭ বাতিল) গুরুত্বপূর্ণ আইনজীবী হিসেবে পরিচিত। সেই প্রেক্ষাপটে তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠানো মানে LGBTQIA+ অধিকারের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান, সামাজিক ন্যায় ও সংবিধানিক মূল্যবোধকে প্রাধান্য দেওয়ার বার্তা। জাতীয় রাজনীতিতে প্রগতিশীল ও উদার ভাবমূর্তি জোরদার করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই নিজেকে সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষতার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেন। এই মনোনয়ন সেই অবস্থানকেই আরও সুদৃঢ় করল।
মেনকা গুরুস্বামী ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ঐতিহাসিক রায় সমকামিতাকে অপরাধমুক্ত করার মামলায় (ধারা ৩৭৭ বাতিল) গুরুত্বপূর্ণ আইনজীবী হিসেবে পরিচিত। সেই প্রেক্ষাপটে তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠানো মানে LGBTQIA+ অধিকারের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান, সামাজিক ন্যায় ও সংবিধানিক মূল্যবোধকে প্রাধান্য দেওয়ার বার্তা।
মিলেনিয়াল ও জেন-জি ভোটারদের দিকে কৌশলগত নজর
সামনেই বাংলার বিধানসভা নির্বাচন। ভারতের জনসংখ্যার বড় অংশ এখন ১৮–৩৫ বছর বয়সী। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাতে এবারে বিপুল সংখ্যক মিলেনিয়েল ভোটার রয়েছে। এই মিলেনিয়াল প্রজন্মের ভোটাররা বিশেষ করে জেন জি ভোটাররা সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় এবং দ্রুত মতামত গঠন করেন। এরা
পরিচয়-রাজনীতি ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেন। লিঙ্গসমতা, মানবাধিকার ও বৈচিত্র্যের প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থানও রয়েছে এদের। সেখানে ঘোষিত সমকামী, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এক আইনজীবীকে রাজ্যসভায় পাঠানো তরুণ ভোটারদের কাছে ‘নতুন প্রজন্মের রাজনীতি’-র ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে। এতে শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও প্রথমবারের ভোটারদের মধ্যেও ইতিবাচক সাড়া তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিলেনিয়াল ও জেন-জি প্রজন্মের কাছে এটি একটি শক্তিশালী বার্তা। যেখানে স্পষ্ট তুলে ধরা হয়েছে রাজনীতি বদলাচ্ছে, এবং সেই বদলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অধিকার, পরিচয় ও সমতার প্রশ্ন। আর তাতে এগিয়ে রয়েছেন মমতাই।
জাতীয় রাজনীতিতে কৌশলগত অবস্থান
তৃণমূল কংগ্রেস এখন জাতীয় স্তরে নিজেদের বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। সেই প্রেক্ষাপটে শুধুমাত্র আঞ্চলিক ইস্যু নয়, জাতীয় মানবাধিকার ও সংবিধান রক্ষার রাজনীতিতেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সক্রিয় থাকার বার্তা দিলেন তৃণমূল নেত্রী। পাশাপাশি বিরোধী জোট রাজনীতিতে উদারপন্থী অবস্থানকে জোরদার করে দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের শিক্ষিত ভোটারদের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতার প্রথম ধাপটা পার করে ফেললেন সুকৌশলে।
ঘোষিত সমকামী, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এক আইনজীবীকে রাজ্যসভায় পাঠানো তরুণ ভোটারদের কাছে ‘নতুন প্রজন্মের রাজনীতি’-র ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে।
নজর কাড়লেন আন্তর্জাতিক মহলের
মমতার এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন ভারতের সংসদে বৈচিত্র্য ও প্রতিনিধিত্বের পরিসর প্রসারিত করেছে, সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলের ও নজর কেড়েছে আবারও। কারণ, মেনকা গুরুস্বামী কেবল পরিচয়ের রাজনীতির প্রতীক নন। তাঁর যোগ্যতা ও কাজের অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত পরিসরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট হিসেবে সংবিধান, মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মামলায় সওয়াল করার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন ধরেআন্তর্জাতিক মঞ্চে বক্তা ও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় অংশগ্রহণও করছেন। তিনি আইনের শাসন, সংখ্যালঘু অধিকার এবং লিঙ্গ-সমতার পক্ষে সোচ্চার। ফলে রাজ্যসভায় তাঁর উপস্থিতি আইন প্রণয়নের বিতর্কে উচ্চমানের সাংবিধানিক বিশ্লেষণ যোগ করতে পারে।
অন্যদিকে, মমতার এই সিদ্ধান্তকে বিরোধীরা ‘শহুরে লিবারেল’ ইমেজ নির্মাণের প্রচেষ্টা হিসেবেও ব্যাখ্যা করতে পারে না। ভিন রাজ্যের বাসিন্দা একজন অবাঙালিকে কেন বাংলা থেকে রাজ্যসভার সাংসদ করা হচ্ছে সেই প্রশ্ন তুলে সমালোচনাও করতে পারেন। কিন্তু রাজনীতির হিসেবের অঙ্ক কষে দেখলে এই সিদ্ধান্তের বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ রয়েছে। তাই মেনকা গুরুস্বামিকে রাজ্যসভায় পাঠানো কেবল একজন ব্যক্তির মনোনয়ন নয় এটি প্রজন্মের রাজনৈতিক ভাষা বদলের ইঙ্গিত। সংবিধানিক মূল্যবোধ, অন্তর্ভুক্তি এবং তরুণ ভোটারদের মানসিকতার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে এই পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ রাজনীতির রূপরেখাই স্পষ্ট করছে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
গোড়াতেই গলদ, একাধিক কর্মীর দিকে সন্দেহের তির! রাম মন্দিরে চুরির প্রাথমিক রিপোর্টে বিস্ফোরক SIT
-
ফুটপাথ থেকে নাবালিকাকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে খুন, অভিযুক্তকে এনকাউন্টার দিল্লি পুলিশের
-
৩ কেজি ‘সোনার মালকিন’ টিনা কোথায়? পুলিশি তল্লাশির আগেই স্বামীর সঙ্গে উধাও তৃণমূল নেত্রী!
-
‘মেসিও তো ২ গোল করেছেন’, জোড়া গোলের পর রোনাল্ডোকে প্রশ্ন, জবাবে কী করলেন সিআর?
-
যুদ্ধবিধ্বস্ত পরমাণু কেন্দ্রে রাষ্ট্রসংঘের প্রবেশে না! ভ্যান্সের দাবি খারিজ ইরানের, ক্ষুব্ধ ট্রাম্প