বর্ষায় যেমন নামে স্বস্তির বৃষ্টি, তেমনই বাড়ে নানা সংক্রামক রোগের ঝুঁকিও। সেই তালিকায় নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে চাঁদিপুরা ভাইরাস (Chandipura Virus বা CHPV)। গুজরাটে ইতিমধ্যেই তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, একাধিক শিশুর শরীরে মিলেছে এই ভাইরাসের সংক্রমণ। যদিও এটি খুব বিরল, কিন্তু একবার শরীরে প্রবেশ করলে মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই মস্তিষ্কে মারাত্মক প্রদাহ তৈরি করতে পারে। তাই এই ভাইরাস সম্পর্কে সচেতন থাকাই এখন সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
কী এই চাঁদিপুরা ভাইরাস?
চাঁদিপুরা ভাইরাস ব়্যাবডোভিরিডা পরিবারের একটি ভাইরাস। ১৯৬৫ সালে মহারাষ্ট্রের চাঁদিপুরা গ্রামে প্রথম এর সন্ধান মেলে। এই ভাইরাস অ্যাকিউট এনসেফালাইটিস সিনড্রোম (এইএস) বা মস্তিষ্কের তীব্র প্রদাহের অন্যতম কারণ হতে পারে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অতীতেও এই ভাইরাসের ছোট-বড় প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছে। বিশেষ করে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়েই এর সংক্রমণ বেশি হয়।
আরও পড়ুন:
কীভাবে ছড়ায়?
চাঁদিপুরা ভাইরাস হাঁচি-কাশি বা একজন থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়ায় না। এর প্রধান বাহক স্যান্ডফ্লাই। এই ক্ষুদ্র রক্তচোষা পোকা কামড়ালে ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বর্ষাকালে স্যান্ডফ্লাইয়ের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সংক্রমণের আশঙ্কাও বাড়ে।
আরও পড়ুন:

কোন লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন?
এই ভাইরাসের লক্ষণ খুব দ্রুত দেখা দেয় এবং অল্প সময়েই রোগীর অবস্থা খারাপ হতে পারে।
প্রধান লক্ষণগুলো হল—
- হঠাৎ তীব্র জ্বর
- অসহ্য মাথাব্যথা
- বারবার বমি
- প্রচণ্ড দুর্বলতা
- পেশিতে ব্যথা
- অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব
- অস্থিরতা বা বিভ্রান্তি
- খিঁচুনি
- জ্ঞান হারিয়ে ফেলা
শিশুর জ্বরের সঙ্গে যদি খিঁচুনি, অস্বাভাবিক আচরণ বা অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব দেখা যায়, তাহলে এক মুহূর্তও দেরি না করে নিকটবর্তী চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যান।
কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
এই ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় ১৫ বছরের কম বয়সি শিশু, বিশেষ করে ১০ বছরের নিচের শিশুরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি গড়ে না ওঠা এবং বাইরে খেলাধুলার সময় স্যান্ডফ্লাইয়ের সংস্পর্শে আসার কারণেই ঝুঁকি বেশি।
কেন এত ভয়ঙ্কর?
চাঁদিপুরা ভাইরাসের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল এর অত্যন্ত দ্রুত গতিতে মস্তিষ্কে আঘাত হানা। সংক্রমণের পর অনেক ক্ষেত্রেই মাত্র ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কে প্রদাহ তৈরি হয়। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। আরও উদ্বেগের বিষয়, এখনও পর্যন্ত এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ বা অনুমোদিত টিকা নেই।

কীভাবে রোগ ধরা পড়ে?
চিকিৎসকেরা রোগীর উপসর্গ দেখে সন্দেহ করলেও নিশ্চিত হতে আরটি-পিসিআর, অ্যান্টিবডি পরীক্ষা এবং বিশেষ ল্যাবরেটরি পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। কারণ ডেঙ্গি, জাপানিজ এনসেফালাইটিসসহ আরও কয়েকটি ভাইরাসের উপসর্গের সঙ্গে এর মিল রয়েছে।
চিকিৎসা কী?
চাঁদিপুরা ভাইরাসের নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে—
- জ্বর নিয়ন্ত্রণ
- খিঁচুনি সামলানো
- শরীরে তরলের ভারসাম্য বজায় রাখা
- প্রয়োজনে আইসিইউ-তে নিবিড় পরিচর্যা

কীভাবে প্রতিরোধ করবেন?
যেহেতু এই ভাইরাস স্যান্ডফ্লাইয়ের কামড়ে ছড়ায়, তাই প্রতিরোধের মূল উপায় হল এই পোকা থেকে নিজেকে এবং শিশুদের সুরক্ষিত রাখা।
- শিশুদের রিপেলেন্ট ব্যবহার করান
- রাতে মশারি টাঙিয়ে ঘুমান
- হাত-পা ঢাকা পোশাক পরান
- বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখুন
- জমে থাকা আবর্জনা ও পোকামাকড়ের বংশবিস্তার রোধ করুন
জ্বরের সঙ্গে বমি, খিঁচুনি বা আচরণে পরিবর্তন দেখলেই দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান।
চাঁদিপুরা ভাইরাস বিরল হলেও, অবহেলা করার মতোও নয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে শিশুদের জ্বরকে হালকাভাবে নিলে বিপদ বাড়তে পারে। সচেতনতা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো হাসপাতালে চিকিৎসাই এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
বিশ্বকাপে সাফল্যের স্বীকৃতি! এবার ‘ম্যাজিশিয়ান’ ভোজিনহার নামে নতুন প্রাণীর নামকরণ
-
ডায়ালিসিস কাণ্ড থেকে ‘শাস্তিমূলক বদলি’! পালাবদলের বাংলায় কলকাতায় ফিরলেন একঝাঁক চিকিৎসক
-
নারীপাচারে বড় সাফল্য পুলিশের! ৭ দিনের মধ্যে রাজস্থান থেকে উদ্ধার মালবাজারের কিশোরী
-
জগন্নাথদেবের প্রিয় মিষ্টি এবার আপনার হেঁশেলে, রথের আগেই শিখে নিন সেরা ৩ রেসিপি
-
হাঁটাও অসম্ভব, জল-কাদায় ভরা ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক যেন চাষের জমি! বিপর্যস্ত যোগাযোগ