বারবার চোখের পাতা ফেলা, কাঁধ ঝাঁকানো, মুখের ভঙ্গি বদলানো বা হঠাৎ গলা খাঁকারি দেওয়া। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, ইচ্ছা করলেই এসব থামানো সম্ভব। কিন্তু ট্যুরেট সিনড্রোমে (Tourette Syndrome) আক্রান্ত মানুষের কাছে এই অনিচ্ছাকৃত নড়াচড়া বা শব্দ না করা অনেকটা হাঁচি বা তীব্র চুলকানি চেপে রাখার মতো। কিছুক্ষণ সামলানো যায়, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন হয় প্রবল মনোযোগ ও মানসিক নিয়ন্ত্রণ।
কী এই সমস্যা
ট্যুরেট সিনড্রোম একটি স্নায়বিক সমস্যা। এতে বারবার অনিচ্ছাকৃত নড়াচড়া বা শব্দ করার প্রবণতা দেখা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এগুলিকে বলা হয় ‘টিক্স’। কারও ক্ষেত্রে চোখের পাতা ফেলা, মুখের ভঙ্গি বদলানো বা কাঁধ ঝাঁকানোর মতো সাধারণ নড়াচড়া দেখা যায়। আবার কারও ক্ষেত্রে একসঙ্গে একাধিক পেশি জড়িয়ে জটিল নড়াচড়াও হতে পারে।
আরও পড়ুন:
শব্দের ক্ষেত্রেও সমস্যা হতে পারে। বারবার গলা খাঁকারি দেওয়া, নাক টানা বা কোনও শব্দ বা আওয়াজ পুনরাবৃত্তি করা এর মধ্যে পড়ে। সবার ক্ষেত্রে উপসর্গ এক রকম নয়। সময়ের সঙ্গে নড়াচড়া বা শব্দের ধরন এবং তীব্রতাও বদলাতে পারে।
আরও পড়ুন:

বাইরে চেপে, বাড়িতে বাড়ে
অনেকেই সামাজিক পরিস্থিতিতে কিছু সময়ের জন্য এই প্রবণতা দমন করতে পারেন। স্কুল, অফিস বা অনুষ্ঠানে বাইরে থেকে তাঁকে একেবারে স্বাভাবিকও মনে হতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সমস্যাটি ইচ্ছাধীন।
বরং নড়াচড়া বা শব্দ চেপে রাখতে যথেষ্ট মনোযোগ ও মানসিক শক্তি খরচ হয়। অনেক আক্রান্তকেই বলতে শোনা যায়, বাইরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার পর বাড়িতে ফিরে এই প্রবণতা আরও বেড়ে যায়।
আবার গান করা, খেলাধুলা করা বা কোনও কাজে গভীর মনোযোগ দেওয়ার সময় অনেকের উপসর্গ সাময়িক ভাবে কমে যেতে পারে। অন্যদিকে মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব বা অসুস্থতায় তা বেড়ে যেতে পারে। এই ওঠানামাই ট্যুরেট সিনড্রোমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
শুধু টিক্স নয়
ট্যুরেট সিনড্রোমের সঙ্গে উদ্বেগ, অবসেসিভ-কমপালসিভ উপসর্গ এবং এডিএইচডি-র মতো সমস্যাও থাকতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত নড়াচড়া বা শব্দের চেয়ে এই সমস্যাগুলিই জীবনযাত্রায় বেশি প্রভাব ফেলে।
শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে পড়াশোনা, বন্ধুত্ব ও সামাজিক সম্পর্কে। চোখের পাতা ফেলা বা কাঁধ ঝাঁকানোর জন্য কোনও শিশুকে সহপাঠীদের কটাক্ষের মুখে পড়তে হতে পারে। আবার মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা, অতিরিক্ত উদ্বেগ বা বারবার একই চিন্তা মাথায় ঘোরা তার পড়াশোনায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।

কেন হয়?
ট্যুরেট সিনড্রোমের সঠিক কারণ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে গবেষকদের ধারণা, জিনগত এবং পরিবেশগত বিভিন্ন কারণ এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে শিশুদের মধ্যে এই সমস্যার প্রকোপ ১ শতাংশেরও কম। আর আক্রান্ত সবার রোগের প্রকাশ এক নয়। কারও ক্ষেত্রে উপসর্গ খুব সামান্য, আবার কারও ক্ষেত্রে তা দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
নিয়ন্ত্রণই চিকিৎসার হাতিয়ার
‘কমপ্রিহেনসিভ বিহেভিয়োরাল ইন্টারভেনশন ফর টিক্স’ বা সিবিআইটি নামে একটি আচরণগত চিকিৎসায় রোগীকে শেখানো হয়, কোনও উপসর্গ শুরু হওয়ার আগে শরীরে যে বিশেষ অনুভূতি তৈরি হয়, তা কীভাবে চিনবেন। কোন পরিস্থিতিতে সমস্যা বাড়ে, সেটিও বোঝানো হয়। এরপর সেই নড়াচড়া বা শব্দের পরিবর্তে এমন একটি বিকল্প আচরণ করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যা উপসর্গের তীব্রতা কমাতে সাহায্য করে। প্রয়োজনে ওষুধ, আচরণগত চিকিৎসা এবং খুব অল্পসংখ্যক গুরুতর ক্ষেত্রে ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশনের মতো চিকিৎসারও প্রয়োজন পড়তে পারে।

দেখছেন যা, সবটা তা নয়
ট্যুরেট সিনড্রোম নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হল, কারও চোখে পড়ার মতো কোনও নড়াচড়া বা শব্দ না থাকলে তাঁর সমস্যা নেই। বাস্তবে অনেকেই সামাজিক পরিস্থিতিতে প্রবল চেষ্টা করে উপসর্গ দমন করেন। তাই সাময়িক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন মানেই সমস্যাটি ইচ্ছাকৃত নয়। বরং সেই নিয়ন্ত্রণের পিছনে থাকতে পারে যথেষ্ট মানসিক চাপ ও ক্লান্তি।
ট্যুরেট সিনড্রোমকে বুঝতে হলে তাই শুধু চোখে দেখা উপসর্গ নয়, তার আড়ালে থাকা অভিজ্ঞতাটিও বোঝা জরুরি। সচেতনতা বাড়লেই আক্রান্ত মানুষকে নিয়ে ভুল ধারণা, অস্বস্তি ও সামাজিক কটাক্ষ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
EXCLUSIVE: বিয়ের পিঁড়িতে মিমি চক্রবর্তী! কাকে জীবনসঙ্গী বাছছেন টলি নায়িকা?
-
মোবাইলে নেটওয়ার্কের সমস্যা, টেলিকম কর্মীকে ধরে টাওয়ারে বেঁধে রাখল গ্রামবাসী!
-
মমতার জোটের ডাক উপেক্ষা! উপনির্বাচনে নন্দীগ্রাম-রেজিনগরে প্রার্থী ঘোষণা কংগ্রেসের
-
আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বারাকপুরে বিজেপি নেতার বাড়ির সামনে রেইকি ৩ যুবকের! পুলিশের জালে ১
-
রাজ্যজুড়ে সক্রিয় ভুয়ো চিকিৎসক চক্র! ২ চিকিৎসককে কাঠগড়ায় তুলে স্বাস্থ্যদপ্তরে চিঠি