২৬ অগ্রহায়ণ  ১৪২৬  শুক্রবার ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ 

Menu Logo মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও বাঁকা কথা ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

দিঘা থেকে খুব দূরে নয়। সুবর্ণরেখার গা ঘেঁষে যেন অন্য এক সুন্দরবন। ম্যানগ্রোভ বিচে অন্যরকম উইকএন্ড। লিখছেন ধ্রুবজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

জীবন উপভোগ করাটা এক্কেবারে নিজের হাতে। ও জিনিস কেউ শিখিয়ে দিতে পারবে না। সামান্য একটু বেছে-খুঁটে নিন। বাকিটা গা ভাসিয়ে দিন। হয় ভাবুন আপনি অঙ্কের মাস্টার, নয়তো তেনজিং নোরগে। জীবন তেমনই আপনাকে দু’হাত বাড়িয়ে জাপটে নেবে। এক্ষেত্রে যেমন ধরা যাক পাবদা মাছের টক, শুক্তোর সজনেডাঁটা আর সুন্দরবনের বোন। দিঘার উৎসাহ পার করে পশ্চিমে ওড়িশার দিকে সোজা গিয়ে বিচিত্রপুর। দিঘা-পুরী-দার্জিলিংয়ের বাইরে, বিশ্বাস করুন, বাঙালির প্রথম ইচ্ছেপূরণ। তালসারির পরে কিলোমিটার চারেক পার করলেই এক অঘোর জঙ্গল। নিজের মতো মগ্ন। মাঝেমাঝে জনপদ। ছন্নছাড়া কিছু গ্রাম। ধুলোমাখা কিছু মন্দিরের প্রাচীন পর্ব। তারই আঁকেবাঁকে গিয়েছে চলে পথ দারুচিনি দ্বীপের ভিতর। রিমোট, ভার্জিন নেচার ক্যাম্প। সরকারি হিসাবে। গ্রাম কিন্তু বড় অলস। প্রয়োজনটুকু ফুরোলেই হিসেব তার মর্জির মালিক। তার মাঝেই প্রকৃতিকে সে নিজের কাদামাটিতে রূপসী করে তোলে। প্রাণের টান তার বড্ড বেশি। আর পাঁচ নগরের চাইতে সংস্কারেও তার নিপুণ গ্রামীণ নকশা কাটা।

চরিত্রে বিচিত্রপুর তার কোনও অংশে কম না। সেখানে যেন আরও অনেক নিবিড় করে বাঁধা তার অরণ্যের অধিকার। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে প্রবলভাবে জড়িয়ে থাকা এক শ্বাসমূল-ঠেসমূলের সাম্রাজ্য। সুবর্ণরেখার গা ঘেঁষে বেরিয়ে এসে চেহারায় সুন্দরবনের রূপ চুরি করেই বেড়ে উঠেছে বিচিত্রপুরের ম্যানগ্রোভ বিচ। যে কারণেই তার এত খ্যাতি। ভিতরকণিকায় আবার সে রূপ একেবারে ফুটে বেরিয়েছে মেনকা হয়ে। তবে এ যাত্রা বিচিত্রপুরের।

বিচিত্রপুর। নামেই সাফল্য। উদ্ভিদ, প্রাণিকুলের বৈচিত্রে উদ্ভিন্নযৌবনা এ অরণ্য ওড়িশার অরণ্য দপ্তরের একবুক অক্সিজেন মেশানো খণ্ড। দিঘা থেকে গাড়িতে ১৬ কিলোমিটার পেরোলেই তালসারি। চলে যান আরও পশ্চিমে ৪ কিলোমিটার পেরিয়ে। বিচিত্রপুর বাজার পেরিয়ে রাস্তাটা সরসর করে বাঁ হাতে নেমে গিয়েছে। সেই পথ ধরতেই নাকে ভারী বাতাস লেগে শরীর হালকা করবে। কিছুদূর পর পর ছোট জনপদ। দু’-চার ঘর মানুষের বাস। পানের বরোজ, ধানের গোলা গায়ে গায়ে। বড় একেকটা উঠোন পেরিয়ে শরিকি ঘর। ভাঙা বেড়ার পাটকাঠির চেহারা দেখে তল্লাটের বয়স মালুম হবে। তারই আগল ধরে দাঁড়িয়ে মাটিমাখা আদুল গায়ের ছেলেপুলের দল। কে তার দেশে এল, কে-ই বা গেল, খেলাধুলো ফেলে সেসবে মন দেওয়ার সময় তাদের নেই। আরও কিছুদূর গেলে দু’একটা মোড় পেরিয়ে ছোট মাছের বাজার। শহরের বিলাসিতা ফেলে ক্রোশ মাইল দূরে রাস্তার ধারে উদাসীন বেচাকেনা। সেসব ছাড়িয়ে আরও দক্ষিণে রাস্তা গিয়ে ধাক্কা খাবে জঙ্গলের বাঁকে। মোড় ঘুরেই তিন রাস্তার মাথা। আরও পুবে ঘুরে রাস্তা ক্রমশ সরু হয়ে নেমে গিয়েছে বালিময় ম্যানগ্রোভের রাস্তায়।

পাহাড়ের কোলে রঙের খেলা, প্রকৃতিকে কাছে পেতে ঘুরে আসুন ভার্সে থেকে ]

শুধু ম্যানগ্রোভের বিচটুকুই নয়, সেখানে পৌঁছনোর আগে এই গ্রামীণ ছায়াপথের জংলি রাস্তা একবারের জন্যও পলক ফেলতে দেবে না। বুনো ফুল, টোপা কুলের সবজে লাল কুঁড়ি, হাতির কানের মতো গাঢ় রংয়ের পাতাবাহারি খাটো নাম না জানা গাছ আদরে সাজিয়ে রেখেছে কে চরাচরে।

রাস্তা শেষে গিয়ে খাঁড়ির মুখে ওড়িশা ফরেস্টের টিকিট কাউন্টার। ১০০০ টাকায় ছয় আসন বা ১২০০ টাকায় আট আসনের স্পিড বোট ভাড়া নিয়ে নিন। বাকি কাজ বলতে একটা ঢালের মাঠ আর উঁচু পাড় ঘেঁষে সামনে হেঁটে যাওয়া। বুনো কুল আর কাঁটা গাছের ঝোপ পেরিয়ে গিয়ে অবশেষে আমাজনের অববাহিকা। আর বোট এলে চোখ বুজে পা টিপে টিপে গিয়ে তাতে বসা।

জীববৈচিত্র

কলম্বাস-যাত্রা শুরু হলেই মাইরি বলছি, ক্যামেরা, মোবাইল হাতে যা থাকবে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে জলে হাত ডুবিয়ে দিন। বসে থাকুন চোখ বুজে। বোট ছুটবে আপন মনে। আস্তে আস্তে নোনা খাঁড়ির মুখ চওড়া হতে হতে খুলে যাবে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের দুয়ার। নিস্তব্ধে মুঠো মুঠো বাতাস এসে মুখে লাগবে। তাতে অক্সিজেন তো বটেই বোধহয় অসংখ্য খনিজ গুঁড়ো করে মেশানো। বুকে ভরে নিয়েও মনে হবে এত সম্পদের কিছুই সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবেন না। এ যকের ধন কেবল সেখানকার প্রকৃতির আপ্যায়নের উপচার। প্রায় পঁচিশ মিনিটের জলপথ পার করে দিয়ে বোট আপনাকে এক মোহনার মুখে পাড়ে তুলে দেবে। সামনে বিরাট এক চর জেগে। সে পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি নেই। তারই আগে বাঁ পাশ বরাবর টানা শ্বাসমূলের দ্বীপ থমকে রয়েছে। আরব সাগরের তীরে যেন নোনা জলে পা ডুবিয়ে নির্বাসনে বসেছিল প্রদীপের জিন। খালি গা নীল রংয়ে চোবানো। পায়ে তার তির ছোড়া ফুরফুরে হাওয়ার সুড়সুড়ি। মানুষ দেখে এক লাফে উল্লাসে এসে ছোঁ মেরে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দেবে জন্নতের তবিয়তখানায়। ভরা জোয়ারে সেখানে পা ডুবিয়েই বহুদূর হাঁটুজলে চলেফিরে বেড়ানো যায়। পৃথিবীর সবচেয়ে মোটা দাগের তুলি নিয়ে আদিগন্ত ক্যানভাসে কেউ যেন বাউলনাচ এঁকে রেখে গিয়েছে। হাওয়ায় দোলে না, জলে নরম হয় না, কঠিন চোখে চেয়ে থাকে কেবল। আকাশের দিকে চেয়ে থাকা রাশি রাশি শুকনো শ্বাসমূলের মৃত কিছু গাছ তারা।

খাঁড়িপথে যে ম্যানগ্রোভের জঙ্গল পিছনে পড়ে থাকল, তারই এক শীর্ণ রেখা এসে মিশেছে সমুদ্রের তীরে। জনবসতি নেই। লাল কাঁকড়া, আর কিছু মাছরাঙা কুচো মাছের লোভে অবাধ চড়ে বেড়ায়। সে পথই বাঁ হাতে সোজা গিয়ে উঠেছে তালসারি। পথের ফাঁকে ফাঁকে দড়ির দোলনা সাজিয়ে রেখেছে ওড়িশার অরণ্য দপ্তর। একটু বসুন। জিরোতে জিরোতে মিঠে হাওয়ায় চোখ বুজে আসবে। যে শহর থেকে গিয়েছেন, তার ঠিকানা আর এক মুহূর্তও মনে রাখতে ইচ্ছা করবে না। দেশ ভুলিয়ে দেবে। পল গুলিয়ে দেবে। প্রকৃতিকে যারা প্রকৃতই বেহিসাবি ভালবাসবেন তাদের সে দেবে দু’-হাত ভরে। গায়ে মাখামাখি করে। ফের কোনও এক বোটে সেই পথেই ফেরা।

bichitrapur-1

কখন যাবেন

গ্রীষ্ম, বর্ষা বাদ দিয়ে যে কোনও সময় যান। শরৎ, হেমন্ত বা বসন্তই এর সেরা সময়। আর অবশ্যই জেনে নেবেন জোয়ারের সময়। সেই সময় ধরেই স্পিডবোট চলাচল করে। রোজ একই সময় জোয়ার আসে না। প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে সময় পিছোয়। মাঝির কাছেই জেনে নিতে পারেন এ চরাচরের চরিত্র। মূল খণ্ডের সঙ্গেই জেগে থাকে আশপাশে আরও দুই-চার খণ্ড ভূমি। বিনা প্রয়োজনে সেখানে কাক-পক্ষী ছাড়া কারও পা পড়ে না। আছে জীববৈচিত্রের অপূর্ব সমাহার। কুমির, কামট, ঘড়িয়াল তো আছেই। আছে ফ্লেমিংগো, বাঁশপাতি, অদেখা পায়রা, রাজহাঁস-পাতিহাঁস, কাদাখোঁচা, গাংচিলের মতো হরেক কিসিমের পরিযায়ী। ইহজগতের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের কোনও প্রয়োজন নেই।

থাকবেন কোথায়

বিচিত্রপুরে থাকার জায়গা এখনও গড়ে ওঠেনি। দিঘার সীমানা পার করে বিচিত্রপুর ঘুরে তালসারি হয়ে আবার বাংলার সীমায় পৌঁছতে সাকুল্যে ৪ ঘণ্টা সময় লাগবে। পরামর্শ থাকবে পুরনো বা নতুন যে কোনও একটি দিঘায় থাকার জন্য। ৬০০ থেকে ১৫০০ টাকার অজস্র হোটেল। তবে তালসারিতে একটি থাকার জায়গা করেছে ওড়িশার পর্যটন দফতর। পান্থনিবাসের সে ঘরগুলির ভাড়াও সাধ্যের মধ্যে। স্পট বুকিংয়ে ৪০ শতাংশ ছাড়।

যাতায়াত

দিঘা থেকে মন্দারমণি বা বিচিত্রপুর পর্যন্ত ভাড়াটা মাঝে বলে নেওয়া দরকার। দিঘা থেকে পর্যটনের দু’টি পথ। একটি ওল্ড দিঘা থেকে পিছিয়ে গিয়ে মন্দারমণি, তাজপুর, শঙ্করপুর হয়ে দিঘা মোহানার দিক। সাকুল্যে চার চাকার গাড়িতে যার ভাড়া ১০০০ টাকা। তা না হলে নিউ দিঘা ছাড়িয়ে সোজা এগিয়ে যান ওড়িশার দিকে। নিউ দিঘা বাস টার্মিনাস পেরিয়ে দেখবেন ওড়িয়া ভাষার বোর্ড। বুঝবেন দিঘার শেষ সীমা পেরিয়েছে। চন্দনেশ্বর শিবমন্দর পড়বে পথে। সম্ভবত এ মন্দিরে এখনও সরকারি নেকনজর পড়েনি। মফস্বলের মন্দিরও এর চেয়ে সাফসুতরো। তার বাইরে মোহান্তদের বাড়বাড়ন্ত তো রয়েইছে। মন্দিরের পাশ ঘেঁষা রাস্তা গিয়ে পড়েছে তালসারির পাড়ে।

বিচিত্রপুরের দিকে যেতে ওল্ড দিঘা থেকে পড়ে আটশো টাকা। ওল্ড দিঘা থেকে বিচ গুনতে গুনতে গিয়ে তালসারি পৌঁছলে পড়বে ছ’শো টাকা। আরও পশ্চিমে বিচিত্রপুর পৌঁছতে কেউ আরও দু’শো বা চারশো টাকাও চাইতে পারে। দরদাম নিজের দায়িত্বে। সেই পথেই অন্নপূর্ণা, সরস্বতী, বাসন্তী, মনসা দেবীদের নামে পুজোর চাঁদা চাইতে নাছোড় কিছু ছেলেছোকরা মিলবে। চোখে চোখ রেখে তাদের এড়িয়ে গেলে দেদার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনার অপেক্ষায়।

এবার উত্তরবঙ্গে ট্রেকিংয়ের জন্য অনলাইনে বুকিং করতে পারবেন পর্যটকরা ]

তালসারি হয়ে ফিরুন

ফেরার পথে অবশ্যই তালসারিতে নামুন। সেখানে সমুদ্র পর্যটনকে আরও ভাগ করে নিয়েছে স্থানীয় যুবকেরা। সুবর্ণরেখারই আরেক মোহনা বেয়ে লাল কাঁকড়ার বিস্তীর্ণ চোখ জুড়োনো বিচ। জোয়ারকালে নৌকায় সেখানে পৌঁছতে নেয় ৫০ টাকা। ভাটায় ১০০ টাকা নেয় বাইক। সাহস করে ভাটার নোনা হাঁটু জলে নামতে চাইলে সামনেই ঝাউবন। এ তল্লাটে প্রকৃতির শোভায় এখনও কেউ ভাগ বসায়নি। ওড়িয়া উপকূলের মেছো গন্ধ সহ্য করে নিতে পারলে এ-ও এক প্রাকৃতিক সম্পদ।

খানাপিনা

একমাত্র এ জিনিসটিকেই যদি অবহেলা করেছেন কি গেলেন। উচিত, যখন যেখানে যাওয়া সেখানকার দস্তুর চেখে আসা। সমুদ্রের পাড়েও তাই। বঙ্গোপসাগরে তো বটেই। শুক্তো আর পোস্তয় ঋতু মেনে সজনের ডাঁটা পড়ে দিঘার রান্নায়। একটু ভাল খাবার হোটেলে জমিয়ে আঙুল চেটে বেরতে হবে। আর তালসারির খানায় অন্য সোয়াদ। নোনা পাবদা, ইলিশ, চিংড়ি, আমুদে মাছের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পেল্লাই কাঁকড়া। পছন্দসই বেছে নিয়ে বলুন টক রান্না করে দিতে। সঙ্গে আমুদে ভাজা। নোনা হাওয়া যে পেট কলসি করে দিয়েছে, তাকে মোটা চালের ভাতে তেঁতুলে ডোবানো মাছের টক মিশিয়ে জাঁক দিন। শরীর আলগা হবে। চোখের পাতা লেগে যাবে। কান দুলবে। পা সরতে চাইবে না। একটু জিরিয়ে তখন আপনাকে নিতেই হবে। শেষে মোটা মালাইয়ের ডাব খেয়ে উঠে পড়ুন। সন্ধের আগে দিঘা টুরিজমে অংশ নিতে হবে তো! তবে এমন তাবড় রান্নার হাতের খোঁজ বিদেশ-বিভুঁইয়ে একটু নিয়ে রাখা ভাল। ওড়িশার যে বামুন ঠাকুরেরা সাড়ে ৩০০ বছর আগে বাংলায় এসে সাধের ঝাল আর তরিজুতের খাদ্যে মন মজিয়েছে গোপাল তেমনই একজন। মাঝে মাঝেই তার ফোন চুরি যায়। তবু একটা নম্বর দিয়ে রাখলাম ৯৩৪৮৫৮৫০৬৯। একইসঙ্গে জেনে রাখা উচিত যে, করিতকর্মা বলতে যা বোঝায়, এই রাঁধুনিটি তাই।

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং