মানুষের মূত্রে ধোয়া হত পোশাক, চলত প্রস্রাবের কালো বাজারিও! রোমান লন্ড্রির ইতিহাস জানেন?
কল্পনা করুন আপনি প্রাচীন রোমের পথে হাঁটছেন। হঠাৎ চোখে পড়ল বিশাল এক মাটির পাত্র। তাতে ল্যাটিন হরফে লেখা, ‘মূত্রত্যাগ করুন’। না, শৌচাগারের অভাব নয়, এ ছিল প্রাচীন রোমের এক সুপরিকল্পিত ব্যবসার কৌশল। পথচারীদের মূত্র জমিয়ে, পচিয়ে চড়া দামে বিক্রি হত স্থানীয় লন্ড্রিতে। আজকের দিনে এসব ভাবলে গা ঘিনঘিন করে বইকি! কিন্তু প্রাচীন রোমে এটিই ছিল পোশাক সাফাইয়ের একমাত্র দারুণ জনপ্রিয় এক চাতুর্য।
রোমের পেশাদার ধোপাদের বলা হত ‘ফুলোনেস’। তারা প্রস্রাব জমিয়ে ব্যবসা ফেঁদে বসেছিলেন। অবৈজ্ঞানিক মনে হলেও এর নেপথ্যের রসায়ন ছিল একশো শতাংশ খাঁটি। আসলে জমিয়ে রাখা প্রস্রাব সময়ের সঙ্গে ভেঙে গিয়ে তীব্র ক্ষারীয় অ্যামোনিয়া তৈরি করে। এই অ্যামোনিয়াই কাপড়ের তেলচিটে ময়লা কাটাত এবং গভীর দাগ নিমেষে তুলে দিত। তবে ময়লা সাফ করার এই প্রাচীন পদ্ধতিটি কিন্তু রোমানদের নিজস্ব আবিষ্কার ছিল না, এর উৎস ছিল মেসোপটেমিয়ায়।
আরও পড়ুন:
রোমান ধোপাদের এই সাফাই প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ পরিশ্রমের। চৌবাচ্চার মতো বড় পাত্রে জল এবং পচা প্রস্রাব ঢেলে দেওয়া হত। এরপর ধোপারা বা তাদের ক্রীতদাসেরা সেই পাত্রে নেমে খালি পায়ে অবিরাম কাপড় মাড়াতেন, ঠিক যেমন আজকের ওয়াশিং মেশিন ঘোরে। জামাকাপড় কাচার পর পরিষ্কার জলে তা ধুয়ে নেওয়া হত। এর পর রোদে শুকিয়ে সাদা পোশাকে গন্ধকের ধোঁয়া আর রঙিন পোশাকে এক বিশেষ মাটি ঘষে ফেরানো হত ঔজ্জ্বল্য।
রোমানদের অদ্ভুত কীর্তি এখানেই শেষ নয়। এই ক্ষারীয় অ্যামোনিয়ার তীব্র ক্ষমতা দেখে তারা এটিকে মাউথওয়াশ বা মুখ ধোওয়ার জল হিসেবেও ব্যবহার শুরু করে। তাদের বিশ্বাস ছিল, অ্যামোনিয়া দাঁতের এনামেলকে ধবধবে সাদা করে তুলবে। এই কাজে আবার পর্তুগাল থেকে আমদানি করা প্রস্রাবকে সবচেয়ে ‘প্রিমিয়াম গ্রেড’ বা উচ্চমানের মনে করা হত। বৈজ্ঞানিক ভাবে যুক্তিটি খাটলেও, আজকের দিনে এমন প্রসাধন ভাবলে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে উঠবেন।
এই ব্যবসা এতটাই রমরমা এবং লাভজনক ছিল যে, প্রথম শতাব্দীতে রোমান সম্রাট ভেসপাসিয়ান গণশৌচাগার থেকে প্রস্রাব সংগ্রহের ওপর একটি নির্দিষ্ট ‘ইউরিন ট্যাক্স’ বা মূত্র কর বসিয়ে দেন। এই আজব করের কথা শুনে সম্রাটের নিজের ছেলেই যখন বাবার রুচি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন সম্রাট একটি সোনার মুদ্রা ছেলের নাকের সামনে ধরেন। তিনি জানতে চান, এর থেকে কোনও দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে কি না।
আরও পড়ুন:
ছেলের উত্তর ‘না’ আসতেই ভেসপাসিয়ান উচ্চারণ করেন সেই বিখ্যাত ল্যাটিন আপ্তবাক্য— ‘পেকুনিয়া নন ওলেত’। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, ‘টাকার কোনও গন্ধ হয় না’। অর্থাৎ, উপার্জনের উৎস যতই নোংরা বা অদ্ভুত হোক, অর্জিত অর্থের নিজস্ব কোনও ভালো বা মন্দ গন্ধ থাকে না। ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা এই ল্যাটিন প্রবচনটি আজও অর্থনীতির দুনিয়ায় সমান ভাবে প্রাসঙ্গিক এবং বহুল ব্যবহৃত।
খ্রিস্টাব্দ ৭৯-এ ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল পম্পেই শহর। সেই শহরেরই ‘ফুলোনিকা অফ স্টিফেনাস’ নামের এক লন্ড্রি আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের নিচে অক্ষত থেকে যায়। ১৯১২ সালে খননকার্যের সময় প্রত্নতাত্ত্বিকরা সেখানে জামাকাপড় মাড়ানোর পাত্র, ধোওয়ার বেসিন এবং দেওয়ালে ধোপাদের কাজের ফ্রেস্কো বা ছবি অবিকল খুঁজে পান। এমনকী মালিক স্টিফেনাসের কঙ্কালটিও পাওয়া যায়, যিনি ব্যবসার উপার্জিত কয়েন নিয়ে পালাবার চেষ্টা করছিলেন।