পিরামিডের চেয়েও প্রাচীন! মহেঞ্জোদারোর বয়সের নতুন হিসেব, ওলট পালট হবে বহু ইতিহাস?
৬২০ একরের চেয়েও বেশি অঞ্চল জুড়ে অবস্থিত এই শহরে অন্তত ৪০ হাজার মানুষ বাস করতেন বলেই মনে করা হয়।
সিন্ধ নদের তীরে অবস্থিত প্রাচীন এই সভ্যতার নিদর্শন ইউনেস্কোর ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে’র অন্তর্গত। গোটা বিশ্বের কাছে যা এক বিস্ময়ের খনি। বর্তমানে যা পাকিস্তানের অন্তর্গত। ৬২০ একরের চেয়েও বেশি অঞ্চল জুড়ে অবস্থিত এই শহরে অন্তত ৪০ হাজার মানুষ বাস করতেন বলেই মনে করা হয়। ব্রোঞ্জ যুগের বৃহত্তম শহরগুলির অন্যতম ছিল মহোঞ্জোদারো।
আরও পড়ুন:
মনে করা হয় মহেঞ্জোদারো ছিল সিন্ধু সভ্যতার কোনও প্রশাসনিক কেন্দ্র। গরুর গাড়িতে শস্য এনে ভরে রাখা হত তথাকথিত মহাশস্যাগারে। শস্য শুকিয়ে রাখারও ব্যবস্থা ছিল। অবশ্য ওই মহাশস্যাগার আদৌ শস্যাগার কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। মহেঞ্জোদারোর এক বিস্ময়কর উদ্ভাবন ছিল এর স্নানাগার ও পয়ঃপ্রণালী। সেযুগের শৌচাগারেও ফ্লাশের বন্দোবস্ত ছিল দেখে সত্যিই তাক লেগে যায়।
সম্ভবত সিন্ধু নদের গতিপথ বদলে যাওয়াই ডেকে এনেছিল এই জনপদের অন্তিমকাল। অবশ্য অন্য মতও রয়েছে। কারও কারও মতে বহির্শত্রুর আক্রমণ কিংবা কোনও বড়সড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও হতে পারে ওই ঘনবসতিপূর্ণ শহরের ধ্বংসের কারণ। তবে কোনটি যে আসল কারণ ছিল তা এখনও রয়ে গিয়েছে চর্চাতেই। কিন্তু এতদিন কেউ এই সভ্যতার বয়স নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেনি।
মনে করা হত আনুমানিক ২৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেই পৃথিবীর বুকে 'বেঁচে' ছিল মহেঞ্জোদারো। টিকে ছিল মোটামুটি ১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত। এবার এতদিনকার সেই ধারণাতেই ফাটল ধরে গিয়েছে। মনে করা হচ্ছে, এর চেয়েও আগে মোটামুটি ৩৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেও ছিল এই মহেঞ্জোদারোর অস্তিত্ব! অর্থাৎ সেই হিসেবে এই জনপদ পিরামিডের চেয়েও প্রাচীন! কিন্তু কীভাবে বদলে গেল এতদিনের ধারণা? এর পিছনে রয়েছে এক নতুন অন্বেষণ।
আরও পড়ুন:
২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে নতুন করে খননকার্য চালানো হয়েছিল এখানে। আর তা থেকেই প্রাপ্ত নতুন রেডিওকার্বন ডেটিং থেকেই জানা গিয়েছে, আনুমানিক ৩৩০০ থেকে ২৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ছিল জনবসতিপূর্ণ জনপদটির অস্তিত্ব। উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জোনাথন মার্ক কেনোয়েরের নেতৃত্বে মহেঞ্জোদারোর পশ্চিম দিকের একটি এলাকার ওপর আলোকপাত করা হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পাকিস্তানের ড. আসমা ইব্রাহিম ও আলি লাশারি।
এরও বহু আগে ১৯৫০ সালে এখানে একটি প্রাচীর সদৃশ নির্মাণ আবিষ্কার করেছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিক মার্টিমার হুইলার। তখনকার মতো মনে করা হয়েছিল, এটি নদীবাঁধ। বন্যার জল যাতে শহরে প্রবেশ করতে না পারে তা নিশ্চিত করতেই এগুলি নির্মাণ করা হত। কিন্তু এখন সে ধারণা ভেঙেছে। মনে করা হচ্ছে, ওই নির্মাণ আসলে সীমানা নির্দেশক প্রাচীর।
পাকিস্তানের ‘ন্যাশনাল ফান্ড ফর মহেঞ্জোদারো’-র তত্ত্বাবধানে এই প্রাচীরের রেডিয়োকার্বন ডেটিং করে অবাক হয়ে গিয়েছেন গবেষকরা। দেখা গিয়েছে, এতদিনের ধারণা ঠিক নয়। মহেঞ্জোদারোর অস্তিত্ব ছিল আরও প্রাচীন যুগে। স্বাভাবিক ভাবেই এই আবিষ্কারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা। মনে করা হচ্ছে ইতিহাসের সময়ের ধারণা তথা বিভিন্ন সভ্যতার বয়সের মধ্যে তুলনামূলক ধারণা তা বদলে যেতে পারে এই আবিষ্কারে।
এখানে যে খননকার্য চলানো হয়েছে তাতে শতাধিক কালের সময়ে বহু বস্তু উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে দাঁড়িপাল্লা যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে শিশুদের খেলনা, তামা ও পাথর সরঞ্জাম, নানা ধরনের মূর্তি ইত্যাদি। প্রত্নতাত্ত্বিকরা সেগুলি নিরীক্ষণ করে সিন্ধু সভ্যতার না শোনা গল্পগুলি শোনার চেষ্টা করেন। তবে ফাঁকি নিশ্চিত ভাবেই রয়ে গিয়েছে। কেননা কোনও লিখিত কাহিনি এখনও আমরা পাইনি। তবে ভবিষ্যতে পেতেই পারি।
আসলে সিন্ধু সভ্যতার এক রহস্য আজও অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। এখানে যে সব সিলমোহর ও ফলক পাওয়া গিয়েছে তার গায়ে লিপিবদ্ধ বিবরণের আজও পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। যদি কখনও এর পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয় তখন এই নগরীর উত্থানের কাহিনি আমাদের কাছে অনেক বেশি সহজবোধ্য হয়ে উঠবে। জানা যাবে কালের গর্ভে তলিয়ে যাওয়া এক সভ্যতার সাধারণ মানুষের হাসি-কান্নার চিরকালীন গল্প!