৫ আশ্বিন  ১৪২৬  সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ 

Menu Logo পুজো ২০১৯ মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও বাঁকা কথা ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

পলাশ পাত্র, তেহট্ট: ফি বছর জুলাই মাস এলেই জলঙ্গি যেন কালিমাময় হয়ে ওঠে। দুর্গন্ধে ভরে ওঠে আশপাশ। নদীতে হাজার হাজার মাছের মড়ক লেগে যায়। গত কয়েক বছর তেহট্ট ২ নং ব্লকের হাঁসপুকুরিয়া, সাহেবনগর ও নাকাশিপাড়া ব্লকের রাধানগর-সহ আশপাশের গ্রামে মাছের সার সার মৃতদেহ দেখতে অভ্যস্ত বাসিন্দারা। এবছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গত কয়েকদিন ধরেই দুর্গন্ধ আর মরা মাছের সেই পরিচিত দৃশ্য চোখে পড়ছে সকলের। সমস্যা বুঝে তার সমাধানে এবার আসরে নামল জেলার মৎস্য বিভাগ। জলঙ্গি নদীর জলের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এই জল পৈলানে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

[ আরও পড়ুন: ভেঙে যায়নি ল্যান্ডার বিক্রম, ফের আশার কথা শোনাল ইসরো]

কিছুদিন ধরেই জলঙ্গিতে পলি জমা, কচুরিপানায় ভরতি হওয়া, কালো রঙের জলে দুর্গন্ধ, মাছের মৃত্যু ঘিরে জেলাজুড়ে মৎস্যজীবী, কৃষিজীবী থেকে নদিয়াবাসী এক ঘোরতর সমস্যার সম্মুখীন। বিষয়টি যে প্রবল উদ্বেগের, সে কথা প্রশাসনিক কর্তারাও স্বীকার করছেন। এ হেন জলঙ্গির কঙ্কালসার শরীরকে সুস্থ করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে প্রশাসন। মৎস্য দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, জলঙ্গি নদীর সঙ্গে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার মৎস্যজীবীর রুটিরুজি জড়িয়ে রয়েছে। কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নদিয়ায় চার লক্ষ কৃষক পরিবার এর সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে জলঙ্গির ধারে রয়েছে লক্ষাধিক পরিবার। জেলার কৃষির ক্ষেত্রে ৮৬ শতাংশ চাষ হয় নদী থেকে পাইপের মাধ্যমে জল তুলে সেচের ব্যবস্থা করা হয়।
মুর্শিদাবাদের কাছে পদ্মা থেকে সৃষ্ট জলঙ্গির ২২০ কিলোমিটার এই দূরত্ব নির্দিষ্ট পথের অনেক আগে করিমপুরের মোক্তারপুরে প্রায় ৪৮ কিলোমিটার শুকিয়ে গিয়েছে। ভৈরব নদীর জলেই জলঙ্গি এখানে ভরে ওঠে। ঠিক এই জায়গায় রুটিরুজির পরিত্রাতা জলঙ্গিকে বাঁচাতে কী ভূমিকা নেওয়া হচ্ছে? প্রশাসনিক কর্তারা বর্তমানে এ নিয়ে সচেতনতার উপর জোর দিচ্ছেন।
জলঙ্গির দূষণ নিয়ে নদিয়ার জেলাশাসক বিভু গোয়েল বলেন, ‘জলঙ্গি নিয়ে একটা জটিল সমস্যা রয়েছে। এ নিয়ে আমি জল সংক্রান্ত বিষয়ে সমস্ত আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। এটা নিয়ে কী করা যায়, ভাবনাচিন্তা চলছে।’ কয়েকদিন আগে জলঙ্গি নদীকে বাঁচানোর উদ্যোগ নিয়ে সারাদিনব্যাপী সেভ জলঙ্গি(নদী সমাজ) নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন কবি, সাহিত্যিক, প্রশাসনিক কর্তা, চিকিৎসক,পরিবেশবিদদের একটি অনুষ্ঠান করে। সেখানে বিভিন্ন মূল্যবান বক্তব্য উঠে আসে। আলোচনার সময় নদী রক্ষা আন্দোলনের কর্মী তাপস দাস বলেন, ‘ফারাক্কা ব্যারেজ ভেঙে দিলে জলঙ্গি আগের অবস্থায় ফিরে আসবে। ভারতবর্ষে গঙ্গা নদী ও তার উপনদীতে এক হাজারটা বাঁধ বা ব্যারেজ রয়েছে। এই বাঁধ যদি কোনওভাবে না রাখা হয়, তাহলে নদীর স্রোত ফের ফিরবে। একশো ত্রিশ লক্ষ কোটি টাকা খরচ করেছি কোনও না কোনও বাঁধের জন্য। এই ৫৫০০টি বাঁধ করার জন্য তথ্য একশো তেরো মিলিয়ান হেক্টর ভূমিকে জলসেচের আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু কার্যক্ষেত্র বলছে, আশি থেকে উননব্বই মিলিয়ন হেক্টর জমি নদীর জল বা ক্যানেলের জলে কাজ হয়েছে।’
যদিও এই তথ্যের বিরোধিতায় মিহির সাহা কমিশনের রিপোর্ট বলছে, ভারতবর্ষে ৮৬ শতাংশ চাষ হয় মাটির তলার জলের ওপর নির্ভর করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীকে দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারে যে ধারণা নিয়ে আমরা চলেছি, তা বদলের সময় এসেছে।
প্রতিবছর মুর্শিদাবাদের সূতির খাল থেকে বর্জ্য পদার্থ নেমে এসে মিশছে জলঙ্গিতে নদিয়ার সাহেবনগরে। মূলত পিঁয়াজ, চিনি কল ও রেশম কাপড় কারখানা থেকে নির্গত হওয়া রাসায়নিক এই বর্জ্য।

[ আরও পড়ুন: সুন্দরবন বাঁচাতে নতুন পদক্ষেপ বাংলাদেশের, ম্যানগ্রোভ অরণ্যে পুকুর খননের সিদ্ধান্ত]

সাহেবনগর, গোপীনাথপুর, পলাশিপাড়ায় বহমান জলঙ্গিতে গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার মাছের মৃত্যুর সংখ্যা কম। কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গিয়েছে, বৃষ্টির জল কম হওয়ায় গাড়ি করে পাট এনে পচানো হয়েছে জলঙ্গি নদীতে। তার ফলে জল বিষিয়ে ওঠে। এমনই জানাচ্ছেন মৎস্য কর্তা রামকৃষ্ণ সর্দার। তাঁর কথায়, ‘এই সময় কই,শিঙি-সহ একাধিক মাছের প্রজননের সময়। সেসবের ক্ষতি হচ্ছে।সরকারের আওতায় যে ১২০টি ওয়াটার বডি রয়েছে, সেগুলো সংস্কার করলেই বৃষ্টির জলের পরিমাণ বেড়ে যাবে। সেচের কাজ একইসঙ্গে মাঠে উৎপাদন ভাল হবে। আমরা সমস্তটার ওপর রিপোর্ট পাঠাচ্ছি।’
জুলাই থেকে বর্ষার কয়েক মাস এই সমস্যা। এরপরও রয়েছে জলঙ্গির দূষিত হওয়ার একাধিক কারণ। প্ল্যাস্টিক, ফুল, বরণ ডালা ফেলা হয় জলঙ্গিতে। পুরসভার বর্জ্যও পড়ে। এ প্রসঙ্গে নদী বিশেষজ্ঞ সুপ্রতিম কর্মকারের কথায়, ‘প্লাস্টিক জলে অক্সিজেন প্রবেশের পথে বাধা সৃষ্টি করে। হাই কোর্টে নদী নিয়ে মনিটারিং কমিটি করেছিল। সেখানে কৃষ্ণনগর পুরসভাকে সুইচ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান করতে নির্দেশ দিয়েছিল। যাতে পুর এলাকার জল শোধন করে নদীতে ফেলা যায়। সে কাজ হয়নি। এটা আইনবিরুদ্ধ কাজ। কচুরিপানা নিয়েও আইন আছে। স্থানীয় প্রশাসনকে এটা পরিষ্কার করতে হয়।’ কৃষ্ণনগর পুরসভার অ্যাডমিনিস্ট্রেটর তথা সদর মহকুমা শাসক সৌমেন দত্ত বলেন, ‘কয়েকদিন আগে নমামি গঙ্গা প্রজেক্টের মাধ্যমে কৃষ্ণনগর পুরসভা এলাকার বর্জ্য সরাসরি জলঙ্গিতে না পড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে বড় নেটের মাধ্যমে। ওই নেটে বর্জ্য আটকে যাচ্ছে। এছাড়া প্লাস্টিক অভিযান শুরু করা হচ্ছে। প্রয়োজনে জরিমানাও করা হবে।’

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং