হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত ভয়ঙ্কর হড়পা বান অর্থাৎ ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’-এর ঝুঁকি কমাতে তৎপর হয়েছে ভারতের সিকিম সহ প্রতিবেশী দুই দেশ নেপাল ও ভুটান। ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদগুলোর জলস্তর নিয়ন্ত্রণে রাখতে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। ভুটানের ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর হাইড্রোলজি অ্যান্ড মেটিওরোলজি’-র একটি দল থরথরমি হ্রদে সাইফন পদ্ধতি পরীক্ষার দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রস্তুতি নিয়েছে। সিকিমে ইতিমধ্যে দুটি অটোমেটিক ওয়েদার স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। হ্রদের বিপুল পরিমাণ জলের চাপ কমাতে সৌরচালিত পাম্প ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
২৬ আগস্ট সকালে হিমবাহ হ্রদ বিপর্যয়ের জেরে নেপালের বিধ্বংসী হড়পা বান অনেক হিসেব পালটে দিয়েছে। ঘটনার পর বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছিল নেপালে হড়পা বানের নেপথ্যে রয়েছে ভূমিকম্প। কিন্তু ‘ইউনাইটেড স্টেটস জিয়োলজিক্যাল সার্ভে’ ওই দাবি বাতিল করে জানিয়ে দেয়, ভূমিকম্প নয়, তুষারধস এবং পাহাড়ি হ্রদে জল বেড়ে যাওয়ায় ওই ভয়াবহ হড়পা বান হয়েছে। সেটার ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ভোটেকোশী এবং ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায়।

কার্যত ২০২৩ সালের ৩ অক্টোবর রাতে সিকিমের দক্ষিণ লোনার্ক হ্রদ বিপর্যয়ের পর উদ্বেগ ছড়িয়েছিল সিকিম, দার্জিলিং, নেপাল, ভুটানে। সেই উদ্বেগই এখন চরমে পৌঁছেছে চলতি বছরের ২৬ আগস্ট নেপালে হড়পা বান বিপর্যয়ের পর। ভুটানের ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর হাইড্রোলজি অ্যান্ড মেটিওরোলজি’-র একটি দল গাসা জেলার লুনানায় পৌঁছে থরথরমি হ্রদে সাইফন পদ্ধতি পরীক্ষার দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। এই পদ্ধতিতে অভিকর্ষজ বল কাজে লাগিয়ে পাইপের সাহায্যে হ্রদ থেকে বাড়তি জল নিচের দিকে বের করে দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ভুটানের অধিকাংশ হিমবাহ হ্রদ গাসা জেলার লুনানায় রয়েছে। ‘গ্লসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’-এর ঝুঁকি কমাতে নেপালও ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদগুলোর জলের স্তর কমানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। ওই দেশের বিদ্যুৎমন্ত্রী বিরাজ ভক্ত শ্রেষ্ঠ সংবাদ মাধ্যমে জানান, সবচেয়ে বিপজ্জনক হ্রদগুলো চিহ্নিত করতে এবং অতিরিক্ত জল বের করার জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। ‘গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড’-এর সহায়তায় এবং ‘জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ’ ও স্থানীয় সরকারের সমন্বয়ে এই প্রকল্প চলতি বছরেই শুরু হবে। এদিকে নেপালের ভয়ঙ্কর পরিণতির পর ত্রস্ত সিকিম এবং উত্তরবঙ্গ।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সেখানেও হিমবাহ হ্রদ থেকে হড়পা বানের ঝুঁকি রয়েছে। ১৬টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত হিমবাহ হ্রদের উপর লাগাতার নজরদারি শুরু করেছে সিকিম সরকার। জলস্তরের পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করতে সেন্সর, স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া কেন্দ্র এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনও হ্রদের জলস্তরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে যাতে দ্রুত সতর্ক হওয়া যায় সেজন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগানো হচ্ছে। গবেষকরা জানান, সিকিমে ছোটবড় মিলিয়ে শতাধিক হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি হ্রদ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই হ্রদগুলোর মধ্যে ১৩টি উত্তর সিকিমে, ৩টি পশ্চিম সিকিমে। অর্থাৎ হিমবাহ হ্রদে বিপর্যয়ের ঝুঁকি উত্তর সিকিমেই সবচেয়ে বেশি। কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিকিমে ইতিমধ্যে দুটি ‘অটোমেটিক ওয়েদার স্টেশন’ স্থাপন করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, দুর্গম উঁচু পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ ও হিমবাহ হ্রদ পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন। ওই কারণে প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। অতিঝুঁকিপূর্ণ ‘শাকো চু’ হ্রদের ভঙ্গুর মোরেইনের আড়ালে থাকা বিপুল পরিমাণ জলের চাপ কমাতে সৌরচালিত পাম্প ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে হ্রদ থেকে প্রায় ৮০ লক্ষ ঘনমিটার জল অপসারণ করে এর জলস্তর ২০ থেকে ৪০ মিটার পর্যন্ত নামিয়ে আনার লক্ষ্য স্থির হয়েছে।
লোনার্ক উপত্যকার ‘ডালমা সাম্পা’ এলাকায় একটি বড় ধরনের ডাউনস্ট্রিম ফ্লাড-রিটেনশন কাঠামো বা বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এটি কোনও কারণে হ্রদ ফেটে জল নেমে এলে তার গতি ও ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা কমিয়ে দিতে সাহায্য করবে। গুরুদংমার হ্রদ কমপ্লেক্সের আউটলেটে বা জল নির্গমন পথে একটি সুরক্ষামূলক মোরেইন প্লাগ অর্থাৎ কংক্রিটের নিরাপত্তা প্রাচীর তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও সুইজারল্যান্ডের সহায়তায় দক্ষিণ লোনার্ক হ্রদ এবং শাকো চু হ্রদে উন্নত ‘প্রাশার প্রোব’ এবং ‘সেন্সর’ বসানো হয়েছে। এর মাধ্যমে হ্রদের জলের পরিমাণ, চাপ ও জলস্তরের পরিবর্তনের ওপর রিয়েল-টাইমে নজর রাখা হচ্ছে।
সর্বশেষ খবর
-
‘হয় চুক্তি করবে, নতুবা নরকে পাঠাব’, এবার রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চ দাঁড়িয়ে ইরানকে হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
-
হকিতে ১৬-১ ব্যবধানে জয়, পদকের লক্ষ্যভেদ লক্ষ্য সেনদের, এশিয়ান গেমস পদক তালিকায় কোথায় ভারত?
-
ঘুরে ফিরে একটাই প্রশ্ন, নেতাজি এতখানি উপেক্ষিত কেন?
-
পড়ুয়াহীন স্কুলে কি তালা ঝুলবে? বিরোধীদের ‘অপপ্রচারের’ মধ্যে কী জানালেন মন্ত্রী
-
সুদিন নয়, দুর্দিনেরও বন্ধু! কঠিন সময়ে মাতৃহারা রানির পাশে থাকতে ছুটে গেলেন শাহরুখ