Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • রবিবার
  • ৭ জুন ২০২৬
Sports and Harmony

হিংসা কাড়ছে খেলার মাঠের বন্ধুত্ব! যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে ক্রীড়াসম্প্রীতি শুধুই মিথ

খেলা এখন প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর যন্ত্র। খেলা মানুষের 'হিংসা হিংসা' খেলার অস্ত্র। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ঘটনা পরম্পরা থেকে আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপের সংশয়- সব যেন চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ করে দিচ্ছে খেলা এখন আর সম্প্রীতি ফেরায় না।

Advertisement
অর্পণ দাস
অর্পণ দাস

শেষ আপডেট: মার্চ ২৫, ২০২৬, ১৭:৪৭

link
অর্পণ দাস
অর্পণ দাস

শেষ আপডেট: মার্চ ২৫, ২০২৬, ১৭:৪৭

options
link
হিংসা কাড়ছে খেলার মাঠের বন্ধুত্ব! যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে ক্রীড়াসম্প্রীতি শুধুই মিথ zoom
নিজস্ব চিত্র

১১২ বছর আগের যুদ্ধবিধ্বস্ত একদিনের কথা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের পশ্চিম ফ্রন্টে বড়দিনে অস্ত্র নামিয়ে ফুটবল খেলেছিলেন ইংল্যান্ড ও জার্মানির যুযুধান যোদ্ধারা। কিংবা ১৯৭১ সালে আমেরিকা-চিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক জোড়া লেগেছিল পিংপং টেবিলে। বা বলা যাক দিদিয়ের দ্রোগবার কথা। গৃহযুদ্ধে ক্রমশ ধ্বংসপ্রাপ্ত আইভরি কোস্টকে একসুতোয় বেঁধেছিলেন কিংবদন্তি ফুটবলার। গল্পগুলো বড্ড ভিনদেশি শোনাচ্ছে? আচ্ছা, তাহলে বলা যাক ১৯৯৯ সালে ভারতের বিরুদ্ধে টেস্টজয়ের পর পাকিস্তান দলকে ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’ দিয়েছিল গোটা স্টেডিয়াম। বা বাবা হওয়ার পর জশপ্রীত বুমরাহকে উপহার দিয়েছিলেন পাক পেসার শাহিন শাহ আফ্রিদি।

কেমন যেন পূর্বজন্মের কাহিনি! ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে চিমটি কেটে বিশ্বাস করতে হয়, এগুলোও হয়েছিল? ক্রীড়া আর সম্প্রীতি-এই শব্দদুটো যেন এখন পদ্মপাতার জল। গোটা দুনিয়াটার ভরকেন্দ্র এখন একটাই শব্দ- যুদ্ধ! সেখানে কে আপন আর কে পর। ওই সব সম্প্রীতি-টম্প্রীতির কথা আর কে মনে রাখে? খেলায় এখন আর বন্ধুত্ব হয় না, যুদ্ধ মেটে না, দূরত্ব কমে না। ওসব মিথ ভুলে গিয়ে এগিয়ে যান। নয়তো নতুন বিশ্ব আপনাকে ছুড়ে ফেলে দেবে। অতীতের নস্ট্যালজিয়া জড়িয়ে ধরে বসে থাকতেই পারেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন পৃথিবীটা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যুদ্ধ আগেও ছিল, এখনও আছে। যুদ্ধ হত সীমান্তে। গোলাবারুদে মানুষের জীবন ছিল খোলামকুচির মতো। হিংসার বিষবাষ্প তখনও শ্বাসরোধ করত। কিন্তু খেলার মাঠ নামক ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ তখন ছিল শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জায়গা। প্রতিপক্ষকে হারিয়ে বলা যেত, দেখ কেমন লাগে! তবে এখন ছবিটা উলটো।

Advertisement
An Article about Sports and Harmony amid war worldwide
জশপ্রীত বুমরাহ ও শাহিন শাহ আফ্রিদি। ফাইল ছবি

এখন আগে শত্রু বেছে নাও। তারপর তাকে বলে দাও তোমার সঙ্গে খেলব না। কিংবা খেলব হয়তো কিন্তু আমার শর্ত মেনে নিতে হবে। আমার মাঠ, তোমার ব্যাট- জোর যার মুলুক তার। খেলা এখন প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর যন্ত্র। খেলা মানুষের ‘হিংসা হিংসা’ খেলার অস্ত্র। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ঘটনা পরম্পরা থেকে আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপের সংশয়- সব যেন চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ করে দিচ্ছে খেলা এখন আর সম্প্রীতি ফেরায় না।

ক্রীড়া আর সম্প্রীতি-এই শব্দদুটো যেন এখন পদ্মপাতার জল। গোটা দুনিয়াটার ভরকেন্দ্র এখন একটাই শব্দ- যুদ্ধ! সেখানে কে আপন আর কে পর। ওই সব সম্প্রীতি-টম্প্রীতির কথা আর কে মনে রাখে? খেলায় এখন আর বন্ধুত্ব হয় না, যুদ্ধ মেটে না, দূরত্ব কমে না।

‘অপারেশন সিঁদুর’ পরবর্তী সময় ভারত বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় খেলতে আপত্তি করেনি। কিন্তু এটাও মানতে হবে, ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট-সেতু চূর্ণ হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে হাসিনা সরকার উৎখাত হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশে প্রবল হয়ে ওঠে ভারতবিরোধী হাওয়া। যা ক্রমশ উত্তপ্ত থেকে উত্তপ্ততর হয়েছে। বাংলাদেশের মাটিতে একাধিক হিন্দুহত্যার ঘটনার প্রভাব পড়ে এদেশেও। যার প্রেক্ষিতে মুস্তাফিজুর রহমানকে ছাঁটাই ও ঘটনা পরম্পরায় বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বয়কট। ‘সন্ত্রাসীদের আশ্রয়দাতা’ পাকিস্তান বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে ভারতে সঙ্গে ম্যাচ বয়কটে অনুঘটকের কাজ করেছে। যাই হোক, পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে ম্যাচ খেলেছে। তবু হাত না মেলানো, ম্যাচের আগে-পরে কারও সঙ্গে কথা না বলার মনোভাব কি ক্রিকেটীয় ‘স্পিরিটে’র সঙ্গে যায়? অবশ্যই খেলার আগে দেশের স্বার্থ। তাহলে কোনও একটাকে বেছে নেওয়াই উচিত নয় কি? তাতে অন্তত খেলাকে রাজনীতির গণ্ডি থেকে দূরে রাখা যায়।

An Article about Sports and Harmony amid war worldwide
১৯১৪ সালে ‘বড়দিনের যুদ্ধবিরতিতে’ ফুটবল ইংল্যান্ড ও জার্মানির। ফাইল ছবি

এই তো ক’দিন আগে সানরাইজার্স কর্তৃপক্ষ কেন ইংল্যান্ডের লিগে আবরার আহমেদকে কিনল, তা নিয়ে বিরাট বিতর্ক। এমনকী কিংবদন্তি সুনীল গাভাসকর পর্যন্ত বলে ফেললেন, “দল থেকে যে অর্থ পাক ক্রিকেটারদের দেওয়া হয়, সেই অর্থই ক্রিকেটাররা কর হিসাবে পাক সরকারকে দেন। করের অর্থে পাকিস্তান অস্ত্র কেনে, সেই অস্ত্র ব্যবহার হয় ভারতের উপর আক্রমণ করার জন্য।” এটাই তো আপামর দেশবাসী বিশ্বাস করছে। গাভাসকরও কি জনপ্রিয় মতের রাস্তাতেই হাঁটলেন? বন্ধু আসিফ ইকবালকে কোনও উপহার দিতে গেলেও কি এই তত্ত্বেও বিশ্বাস করবেন সানি?

An Article about Sports and Harmony amid war worldwide
সুনীল গাভাসকর ও আসিফ ইকবাল। ফাইল ছবি

ঘরের বাইরে দু’পা ফেলে দেখা যাক। ইরানে মিলিতভাবে আক্রমণ করেছে আমেরিকা ও ইজরায়েল। যুদ্ধের ২৪ দিন কেটে গেলেও থামার লক্ষণ নেই। মধ্যপ্রাচ্যে খেলাধুলো পুরোপুরি বন্ধ। ঘটনাচক্রে তিনমাস পর ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচ হবে আমেরিকাতেও। ইরান কি সেখানে খেলবে? ‘বয়কটের’ ধুয়ো উঠেছে। আবার এটাও হতে পারে আমেরিকা নয়, মেক্সিকোয় ম্যাচ খেলবেন সর্দার আজমুনরা। অন্যদিকে এই যুদ্ধের কারিগর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, বিশ্বকাপ খেলতে এলে ইরানকে অভ্যর্থনা জানানো হবে। কিন্তু প্লেয়ারদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনও রকম নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না তিনি। সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রকে এবার ফুটবলের মঞ্চে স্বাগত জানানোর সমস্ত প্রস্তুতি সারা হয়ে গিয়েছে। এদিকে হুমকির মুখে পিএসএলে খেলতে আসা বিদেশি ক্রিকেটাররা। পাকিস্তানে খেলতে এলেই বিপদ! তাই নিজের দায়িত্বে আসুন। পাকিস্তান সুপার লিগ শুরুর আগেই বিদেশি প্লেয়ারদের হুমকি দিয়েছে জঙ্গিগোষ্ঠী জামাত-উল-আহরার। পিএসএলে স্টিভ স্মিথ, ডেভিড ওয়ার্নার বা ড্যারিল মিচেলের মতো তারকা বিদেশি খেলেন। তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের সহযোগী এই জঙ্গিগোষ্ঠীর হুমকির পর তাঁরা পাকিস্তানে মাথা ঠান্ডা রেখে খেলতে পারবেন কি না সন্দেহ।

An Article about Sports and Harmony amid war worldwide
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের ফুটবল দল। ফাইল ছবি

কিন্তু একজন ট্রাম্প, একজন মহসিন নকভি কিংবা একজন মহম্মদ ইউনুস বা কোনও জঙ্গিগোষ্ঠী তো খেলার মানচিত্র তৈরি করতে পারেন না। সেই কর্তৃত্ব কেন তাঁদের হাতে তুলে দেবেন ক্রীড়াভক্তরা? যুদ্ধ আগেও ছিল, এখনও আছে। দুর্ভাগ্যের হলেও ভবিষ্যতেও তা থাকবে। দেশে-দেশে বৈরিতার ছবিটাও বদলাবে বলে মনে হয় না। আফসোসের হল, তার মাঝে পিষে গেল খেলার দুনিয়া। আর হয়তো কোনও দিন ভারত-পাকিস্তান সিরিজের নাম ‘ফ্রেন্ডশিপ সিরিজ’ হবে না। আর কোনও দিন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো কোনও ভারত-অধিনায়ক পাকিস্তানের গলিতে কাবাব খেতে বেরোবেন না। ১৯৮০ সালের মতো ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা একসঙ্গে হোলি খেলবেন না। কিংবা বাবর আজম অফফর্মের বিরাট কোহলির জন্য সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করবেন না। বা খারাপ ইংরেজির জন্য সরফরাজ আহমেদের পাশে বীরেন্দ্র শেহওয়াগের মতো দাঁড়াবেন না। পাকিস্তানি জ্যাভলিন থ্রোয়ারের সঙ্গে ‘বন্ধুত্বে’র জন্য সমালোচিত হতে হয় অলিম্পিকে সোনাজয়ী নীরজ চোপড়াকে। সেই বন্ধুত্ব কি আর কোনও দিন প্রকাশ্যে আনবেন ভারতের ‘সোনার ছেলে’?

An Article about Sports and Harmony amid war worldwide
নীরজ চোপড়া ও আরশাদ নাদিম। ফাইল ছবি

কিন্তু ১৯৯৮-র বিশ্বকাপে ইরান-আমেরিকা ম্যাচের স্মৃতি ফিরে এলে তো মন্দ হয় না। মরণবাঁচন ম্যাচে সেদিন জিতেছিল ফুটবল। ম্যাচের ফলাফলের ঊর্ধ্বে হাত মিলিয়েছিল দুই দল। ইরানের প্লেয়াররা ফুলের তোড়া উপহার দিয়েছিলেন মার্কিন ফুটবলারদের। ফুটবল কাছে এনে দিয়েছিল দুই ‘শত্রু’ তুরস্ক ও আর্মেনিয়াকেও। অলিম্পিকে উত্তর ও দক্ষিণ মিলে এক ‘কোরিয়া’ হওয়ার উদাহরণ আছে। আরও পিছিয়ে গেলে দেখা যাবে হিটলারের জার্মানিতে দাঁড়িয়ে কৃষ্ণাঙ্গ জেসি ওয়েন্সকে জড়িয়ে ধরেছিলেন শ্বেতাঙ্গ অ্যাথলিট লুজ লং। আইভরি কোস্টে দ্রোগবার যুদ্ধ থামানোর গল্প তো বহুলপ্রচারিত। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘বড়দিনের যুদ্ধবিরতি’তে ফুটবল খেলেছিলেন ইংল্যান্ড ও ব্রিটেনের যোদ্ধারা। কূটনৈতিক সম্পর্ক উদ্ধারে আমেরিকার টেবিল টেনিস দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল চিন।

An Article about Sports and Harmony amid war worldwide
১১৯ সালে ইরান ও আমেরিকার ম্যাচ। ফাইল ছবি

এগুলো সবই তো গত শতাব্দীর ঘটনা। যুদ্ধের ভয়াবহতা সেদিন বেশি বই কম ছিল না। আসলে ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগের ঝড়টা দীর্ঘদিন সরকার, রাজনৈতিক দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন দৈনন্দিন সামাজিক জীবনে বিষবৃক্ষের প্রভাব এমনভাবে পড়েছে যে, সাধারণ ভারতীয় সাধারণ পাকিস্তানিকে শত্রু হিসেবে দেখে। কিংবা উল্টোটা। নিঃসন্দেহে সোশাল মিডিয়া এই ‘মতবাদের’ অন্যতম পথিকৃৎ। খেলার মাঠ জিততে শেখায়, হারতে শেখায়, লড়তে শেখায়। কিন্তু মারতে শেখায় না। শাসক শ্রেণি সেটাকে ভয় পায়। তাই বোধহয় খেলার মাঠকেও কর্দমাক্ত করার কাজে নেমেছে। ক্রীড়াপ্রেমীরা কি ‘ফাঁদে’ পা দেবেন? নাকি দেশের স্বার্থ ও খেলার স্পিরিটের ভারসাম্য সঠিক ভাবে সামলাতে পারবেন? যুদ্ধ থেমে যাবে। নিজের ভিতরের যুদ্ধকে ক্লিন বোল্ড করা বা ১০ গোল দেওয়ার স্পিরিটটা যেন বজায় থাকে।

An Article about Sports and Harmony amid war worldwide
চিন-আমেরিকার পিংপং ডিপ্লোমেসি। ফাইল ছবি

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.