তিনি দু’বার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছেন দেশের হয়ে। জানেন কাপ ফাইনালের চাপ কী রকম থাকে। সেই চাপ সামলানোর দাওয়াই, জেমাইমার অপার্থিব ইনিংস, সবকিছু নিয়ে একান্ত সাক্ষাৎকার দিলেন দেশের মহিলা ক্রিকেটের পথপ্রদর্শক ঝুলন গোস্বামী। শুনলেন রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায়।
প্রশ্ন: একটা অপ্রিয় প্রশ্ন দিয়ে ইন্টারভিউটা শুরু করছি। গতকাল নবি মুম্বইয়ে ভারত অবিশ্বাস্য রান তাড়া করে জেতার পর জেমাইমা রডরিগেজ-হরমনপ্রীত কৌরদের প্রবল ইমোশনাল আউটবার্স্ট দেখেছি। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ফাইনালে অতিরিক্ত আবেগে ভেসে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই তো?
ঝুলন: না, না। দেখুন, টিমের উপর কতটা চাপ ছিল, সেটাও বুঝতে হবে। গ্রুপ পর্বে পরপর তিনটে ম্যাচ ভারত হেরে গিয়েছিল। লোকে প্রবল সমালোচনা করছিল। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ খেললে এমনিই প্রেশার থাকবে। তা ছাড়া অতীতে একাধিক বার অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচ ক্লোজ করা সত্ত্বেও জিততে পারিনি। গত বিশ্বকাপ। কমনওয়েলথ গেমস। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। কত বার আমরা পাঁচ-সাত-আট রানে হেরে গিয়েছি ভাবুন অস্ট্রেলিয়ার কাছে। লোকে বলছিল, দ্বিপাক্ষিক সিরিজে অস্ট্রেলিয়াকে ভারত হারালেও, বিশ্বকাপ নকআউটে কেন পারছে না? সবাই বলছিল যে, নিশ্চয়ই এদের বড় ম্যাচে গিয়ে নার্ভ ফেল করে। টিম বিশ্বাস করে যে, ওরা অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারে। কিন্তু গতকাল সবাই দেখল, সত্যিই পারে। আর সেই ‘আমরাও পারি’র কারণেই এহেন আবেগের বিস্ফোরণ।
প্রশ্ন: বুঝলাম। ফাইনালে এবার দক্ষিণ আফ্রিকা। অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর টিমের বিশ্বাস তো ভালো জায়গায় থাকবে।
ঝুলন: দক্ষিণ আফ্রিকাকে একদমই সহজ প্রতিপক্ষ ভাবছি না। গত কয়েক বছরে মহিলা ক্রিকেটে কোনও টিম যদি সবচেয়ে বেশি উন্নতি করে থাকে, তা হলে সেটা দক্ষিণ আফ্রিকা। গত টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপের ফাইনালিস্ট ছিল ওরা। এবার গুয়াহাটিতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে ৭০ অলআউট হয়ে গিয়েছিল ওরা। আবার দেখুন, সেই ইংল্যান্ডকেই উড়িয়ে ফাইনালে চলে গেল। আমি বলব, কনটেস্ট আরও বেড়ে গেল। ভারতের মতো দক্ষিণ আফ্রিকারও কিন্তু তাগিদ থাকবে বিশ্বকে দেখাতে যে, আমরাও পারি!
প্রশ্ন: জেমাইমা রদ্রিগেজ রাতারাতি গোটা দেশের ‘হার্টথ্রব’ হয়ে গিয়েছেন। বুধবার রাতে আমরা দু’জন জেমাইমাকে মাঠে দেখেছি। প্রথম জন, অসম্ভব আবেগী। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ঝরঝরিয়ে কাঁদেন। মেন্টাল হেলথ নিয়ে অকপটে কথা বলেন। দ্বিতীয় জেমাইমা প্রত্যয়ী। অস্ট্রেলিয়ার বিষদাঁত উপড়ে ফেলে তবে মাঠ ছাড়েন। দীর্ঘদিন কাছ থেকে দেখার পর দুই জেমাইমাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
ঝুলন: জেমিকে নিয়ে আমরা জানি যে, ও সোশাল মিডিয়ায় অসম্ভব অ্যাক্টিভ থাকে। টিমেও সব সময় কিছু না কিছু করতে থাকে ও। ইয়ার্কি মারছে। গান করছে। গিটার বাজাচ্ছে। সবাইকে মাতিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু ওর ভেতরেও যে একটা নার্ভ কাজ করে, তা বুধবার দেখা গেল খেলা শেষে। জানেন, জেমাইমা আগে হকি খেলত। বান্দ্রার মিশনারি স্কুলের হকি ক্যাপ্টেন ছিল। সেখান থেকে সুইচ করে ক্রিকেটে এসেছে। মুম্বইয়ে ক্রিকেট খেলে দলে জায়গা করে নেওয়া সহজ নয়। আরে, মুম্বইয়ে ট্রেনিংয়ের জন্য মাঠ পাওয়াই সহজ নয়।
প্রশ্ন: কেন?
ঝুলন: কারণ মুম্বইয়ে নেট পাওয়াটাই কঠিন। এত টিম। এত প্লেয়ার। তুমি হয়তো সকাল সাতটায় নেট পেলে। ন’টায় ছেড়ে দিতে হবে। দেখা গেল, তখন ম্যাচ রয়েছে। এবার সকাল সাতটার পিচ কেমন হতে পারে? মনে রাখবেন, ময়দানের পিচ কিন্তু ঢাকা থাকে না।
প্রশ্ন: মানসিক কাঠিন্য সেখান থেকে এসেছে তা হলে?
ঝুলন: ছোট থেকে মুম্বইয়ে ক্রিকেট খেলে-খেলে সেই টাফনেসটা এসে গিয়েছে ওর। গত বিশ্বকাপে কিন্তু জেমি ড্রপড হয়ে গিয়েছিল। যা যে কোনও প্লেয়ারের কাছে বিশাল ধাক্কা। সেখান থেকে বিশ্বকাপ খেলল এবার। টিমকে ফাইনালে নিয়ে গেল। তাছাড়া ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে সব সময় একটা সংশয়ে থেকেছে। সহজ নয়, এত কিছু সামলানো। এতে নিজের উপর অবিশ্বাস তৈরি হয়ে যায়। গত বিশ্বকাপে ড্রপড হওয়ার সময় জেমির সঙ্গে কথা বলতাম আমি। পাশে থাকার চেষ্টা করতাম। দেখুন, ওর স্কিল নিয়ে কখনও সন্দেহ ছিল না। স্কিল না থাকলে কেউ ভারত খেলে না। আমি বলব, জেমির অ্যাটিটিউডের কথা। এই যে খেলা শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাব। খেলা শেষ করে ফিরব। হ্যারিকে (হরমনপ্রীত) পর্যন্ত একটা সময় জেমি গাইড করছিল! প্রথম দিকে হ্যারি আটকে গিয়েছিল। জেমি তখন দায়িত্ব নিয়ে মাঝেমাঝে বাউন্ডারি মারছিল। এটা বুঝিয়ে যে, উলটো দিকে ক্যাপ্টেন থাকলেও জেমি ক্রিজে সিনিয়র। সিনিয়র সতীর্থকে বুঝিয়ে দেওয়া যে, মারার দায়িত্ব আমি নিচ্ছি। তুমি সময় নিয়ে সেটল করো। জেমির এই অ্যাটিটিউডের কথা বলছি আমি। যা ৩৩৯ রান তাড়া করতে লাগে। ওর কাউকে কিছু প্রমাণ করার ছিল না। কিন্তু নিজের কাছে নিজেকে প্রমাণ করার ছিল।
প্রশ্ন: জেমাইমাকে তিন নম্বরে পাঠানো তো মাস্টারস্ট্রোক?
ঝুলন: অবশ্যই। এই বিশ্বকাপে দু’টো ম্যাচ তিনে খেলল। দু’টোতেই ভালো পারফর্ম করল। আশা করছি, ফাইনালেও তিনে ভালো করবে।
প্রশ্ন: একটা কথা বলুন। এই ভারতীয় মহিলা টিমের খেলা দেখতে স্টেডিয়াম হাউসফুল হয়ে যাচ্ছে। লোকে রাস্তাঘাটে আলোচনা করছে। এসব দেখে আপনার মনে হয় না, আমার সংগ্রাম পূর্ণতা পেল? মিতালি রাজ, আপনি তো ফাঁকা মাঠে খেলতেন। আজ হরমনপ্রীতদের বিশ্বকাপ ম্যাচে একটা সিটও ফাঁকা থাকছে না।
ঝুলন: অবশ্যই। এটাই আমাদের দেশের মহিলা ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। বিশ্বকাপের একটা ম্যাচেও কিন্তু মাঠ ফাঁকা থাকেনি। অন্তত ভারত খেললে। সর্বত্র টিকিট সোল্ড আউট। এই দিনটাই তো দেখতে চেয়েছিলাম। বিসিসিআই, রাজ্য ক্রিকেট সংস্থাকে কৃতিত্ব দিতেই হবে। আর দিতে হবে ডব্লুপিএলকে।
প্রশ্ন: আলাদা করে ডব্লুপিএল কেন?
ঝুলন: কারণ ভর্তি স্টেডিয়ামে খেললে কী অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে হয়, ডব্লুপিএল শিখিয়েছে। আমরা ফাঁকা মাঠে খেলতে অভ্যস্ত ছিলাম। হঠাৎ করে ভর্তি মাঠে খেললে পাশের সতীর্থের কথাও শুনতে পাবেন না। আরসিবি’র খেলা পড়লে, সে পুরুষদের টিম হোক বা মহিলা টিম, দু’হাত দূরে দাঁড়ানো লোকের কথা শোনা যায় না।
প্রশ্ন: শেষ প্রশ্ন। একাধিক বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছেন আপনি। রোববারের ফাইনালের আগে কী পরামর্শ দেবেন হরমনপ্রীতদের?
ঝুলন: শুধু এটাই বলব যে, মুহূর্তকে উপভোগ করো। বিশ্বকাপ ফাইনাল আবার জীবনে কখনও না-ও আসতে পারে। আর জেনে রেখো, জয়-পরাজয় নির্বিশেষে তোমরা আমাদের কাছে সুপারস্টারই থাকবে!
সর্বশেষ খবর
-
‘শত্রু দেশ’কে হারিয়ে এশিয়ার সেরা! কিমের সঙ্গে নাচলেন ফুটবলাররা, ভাইরাল ভিডিও
-
জন্ম থেকে দলের ‘মালিকানা’ বদল, মমতার তৃণমূলের ২৮ বছরের ইতিবৃত্ত
-
জিনিয়াস স্পোর্টস নয়, আইএসএল আয়োজনের অধিকার খুব সম্ভবত পেতে চলেছে ক্লাবগুলি
-
ফেডারেশনের বৈঠকে রণক্ষেত্র টলিপাড়া, ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর বিরুদ্ধে ‘চোর চোর’ স্লোগানে ছোঁড়া হল ডিম
-
সমর্থকদের উপস্থিতিতে নিষেধাজ্ঞা, হোটেল আর ট্রেনিংয়ে ‘কারফিউ’ ব্রাজিলের