Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ১২ জুন ২০২৬
টি-২০ বিশ্বকাপ ২০২৬
T20 World Cup

আহমেদাবাদের ‘শাপ’ কাটাতে তৈরি ঘরের ছেলে অক্ষর, বাস ভাড়া করে ফাইনালে যাবে ‘বাপু’র মহল্লা

ভারতের টি-টোয়েন্টি সহ অধিনায়কের জীবনযাপন, চলনবলন বড় আটপৌরে, সহজ-সরল। চাইলে অক্ষর কি আর পারতেন না, আমেদাবাদের বিত্তশালী জায়গায় প্রকাণ্ড অট্টালিকা গড়তে? পারতেন না, পিতা-মাতাকে নিয়ে কোনও অভিজাত বাংলোয় 'শিফট' করতে? পারতেন। কিন্তু করেননি।

Advertisement
রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায়
রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: মার্চ ৭, ২০২৬, ২০:০৪

link
রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায়
রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: মার্চ ৭, ২০২৬, ২০:০৪

options
link
আহমেদাবাদের ‘শাপ’ কাটাতে তৈরি ঘরের ছেলে অক্ষর, বাস ভাড়া করে ফাইনালে যাবে ‘বাপু’র মহল্লা zoom
অক্ষর প্যাটেল। ফাইল ছবি

‘আচ্ছা, অক্ষর প্যাটেলের বাড়ি ঠিক কোনটা?’
‘কেন, যে বাড়ির দোর থেকে এখুনি ঘুরে এলেন, সেটা।’
‘অ্যাঁ?’
‘হ্যাঁ।’
‘ও বাড়িতে অক্ষরের বাবা-মা থাকেন?’
‘বহু বছর।’
‘মানে, থাকেন এখনও?’
‘সন্ধে ছ’টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে যান। পেয়ে যাবেন রাজেশ ভাইকে।’

প্রথম-মার্চের ঝিমুনি দুপুর। রোদের তাত বেশ চড়া। মধ্যবর্তী একফালি রাস্তা দিয়ে (বড় নয়, মেজো-রাস্তা) হুশ-হাশ দু’পাঁচখানা গাড়ি বেরিয়ে গেল। এ পারে পানের গুমটি-ঘরের মালিক দেখি, কথা বলার ফাঁকফোঁকরে ভিনরাজ্যের ক্রিকেট সাংবাদিকের ভ্যাবাচ্যাকা মুখ দেখে হাসছেন মিটিমিটি। বেশ শুনতে পাচ্ছি, ও পারের বিস্কুট-রঙা একতলা বাড়ির জানালা থেকে ল্যাব্রাডর মহাশয় প্রবল হম্বিতম্বি এখনও নির্বিচারে চালিয়ে যাচ্ছেন। অনাহুত ‘দু’পেয়ে’-কে যার কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না, কিছুতেই এখনও হজম হচ্ছে না ঈষৎ আগে তার মোবাইল বার করে ফটর-ফটর ছবি তোলা। ঘাড় ঘুরিয়ে আবারও ভালো করে দেখলাম, দোতলা বাড়িখানা। মিলিয়ে নিলাম, গুগলে তল্লাশি চালিয়ে বার করা ছবির সঙ্গে। হুঁ, এটাই। মওকা পেয়ে পান-দোকানের ভদ্রলোক বেকুব বানাচ্ছেন না মোটে।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

‘কী হল, বিশ্বাস হচ্ছে না, তাই তো? কারওরই হয় না।’

ছ্যাঁকা-টিপ্পনী গায়ে আর লাগল না বিশেষ। অপার বিস্ময় জাগল বরং। জনান্তিকে শুনেছিলাম বটে যে, ভারতের টি-টোয়েন্টি সহ অধিনায়কের জীবনযাপন, চলনবলন বড় আটপৌরে, সহজ-সরল। চাইলে অক্ষর কি আর পারতেন না, আহমেদাবাদের বিত্তশালী জায়গায় প্রকাণ্ড অট্টালিকা গড়তে? পারতেন না, পিতা-মাতাকে নিয়ে কোনও অভিজাত বাংলোয় ‘শিফট’ করতে? পারতেন। কিন্তু করেননি। নইলে খামোখা আহমেদাবাদ থেকে পঞ্চান্ন-ষাট কিলোমিটার দূরবর্তী নাদিয়াদে পড়ে থাকবেন কেন?

T20 World Cup: Axar Patel wants to be game changer for India in Ahmedabad
নাদিয়াদে অক্ষর প্যাটেলের পৈতৃক বাড়ি। ছবি: রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায়

বিশ্বাস করুন, আহমেদাবাদ থেকে গাড়ি ভাড়া করে নাদিয়াদ গিয়ে অমন দৃশ্য দেখব, ভাবিনি। ভাবিনি, দেশের টি-টোয়েন্টি সহ অধিনায়কের বাড়ির সামনে দু’টো স্কুটিকে ঢুলতে দেখব, পেল্লায় ষাঁড়কে জিরোতে দেখব, গোটা তিন ধুলোমাখা গড়িকে অবহেলায় পড়ে থাকতে দেখব। দেখব, অক্ষরের পিতা রাজেশ প্যাটেলের বাড়ির দোতলায় আপনার-আমার বাড়ির মতোই জামাকাপড় শুকোনোর ‘র‍্যাক’ হেলে থাকে। দুপুরে ‘ভাতঘুম’ দেয় ব্যালকনির সিলিংয়ে দুলতে থাকা পাখা। আর তাঁর পুরনো মহল্লায় ঘুরে যা যা পুরনো-নতুন গালগল্প পাওয়া গেল, রোমাঞ্চকর।

গত রাতে ওয়াংখেড়ে ‘মিক্সড জোনে’ এসে বিশ্বকাপ (T20 World Cup) সেমিফাইনালে দুই দুর্ধর্ষ ক্যাচের নায়ক অক্ষর বলছিলেন, আগামী রোববারের বিশ্বকাপ ফাইনাল তাঁর কাছে খুব স্পেশাল। কারণ, ভারত এর আগে আহমেদাবাদে খেললেও, তাঁর কখনও নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে দেশের জার্সি পরে নামা হয়নি। দু’বছর পর প্রথম নামবেন। “আরও ভালো লাগছে এটা ভেবে, আমার সন্তান এই প্রথম বাবার খেলা মাঠে বসে লাইভ দেখবে!” তবে তিনি ঘুণাক্ষরেও কাকপক্ষীকে জানতে দেননি, নিজের পুরনো পাড়ার অন্তত জনা পঞ্চাশেক চেনা-পরিচিতের ফাইনাল দেখার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছেন। পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে কিছু দূরে হনুমান মন্দিরের কাছে বিশাল নতুন বাড়িতে অধুনা সরে গেলেও, পুরনো পাড়ার সঙ্গে অক্ষরের ‘আত্মীয়তার’ টানে আজও ভাঁটা পড়েনি।

সত্যি-মিথ্যে জানি না। তবে পান-গুমটির মালিক, কাঁচাপাকা চুল-দাড়ির অক্ষয় শুক্রবার বারবার দাবি করলেন যে, তাঁদের মহল্লার রবিবাসরীয় ফাইনাল দেখার যাবতীয় বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন অক্ষরই। তাঁরা সম্মিলিত জনা পঞ্চাশ বাস ভাড়া করে রোববার নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে যাচ্ছেন। ক্রিকেট সাংবাদিক দেখে হওয়া মৃদু জমায়েতও দেখলাম, তাতে দ্রুত সহমত পোষণ করল। শুনলাম, শৈশব থেকে নাকি অক্ষরের পরিবারের সঙ্গে অক্ষয়বাবুর সম্পর্ক খুব ভালো। ছেলেবেলায় অক্ষরকে সাইকেল চাপিয়ে নিকটবর্তী কলেজ মাঠে প্র্যাকটিস করাতে নিয়ে যেতেন তিনি, অক্ষরের বাবা রাজেশ প্যাটেলের নির্দেশে (অবিশ্বাসের কারণ দেখি না বিশেষ। কারণ, কলকাতার সাংবাদিক অক্ষরের পিতার সঙ্গে কথা বলতে চান শোনামাত্র সোৎসাহে ফোন করে বসেছিলেন তাঁকে! রাজেশবাবু ব্যস্ত ছিলেন, সময় দিতে পারেননি, আলাদা কথা)। উপস্থিতদের কেউ কেউ বলছিলেন, খেলা-টেলা না থাকলে, পৈতৃক বাড়ির উল্টোদিকের পান-দোকান অক্ষরের প্রিয় আড্ডা-কেন্দ্র। তিনি ভারতের হয়ে খেলেন বটে। কিন্তু সে জার্সির অহং অহেতুক বয়ে বেড়ান না। আর পাঁচজন সাধারণের মতোই নাকি মহল্লার লোকজনের সঙ্গে মেশেন, ভালো-মন্দের খোঁজ নেন, পথচলতি কেউ ছবির আবদার করলে, তা তুলে ফেলেন অনায়াসে। আর হ্যাঁ, নিকটবর্তী অঞ্জলি হাসপাতালের গায়ের পানিপুরি বিক্রেতার ‘বিশ্বস্ত’ খদ্দেরও তিনি!

খেলা-টেলা না থাকলে, পৈতৃক বাড়ির উল্টোদিকের পান-দোকান অক্ষরের প্রিয় আড্ডা-কেন্দ্র। তিনি ভারতের হয়ে খেলেন বটে। কিন্তু সে জার্সির অহং অহেতুক বয়ে বেড়ান না। আর পাঁচজন সাধারণের মতোই নাকি মহল্লার লোকজনের সঙ্গে মেশেন, ভালো-মন্দের খোঁজ নেন, পথচলতি কেউ ছবির আবদার করলে, তা তুলে ফেলেন অনায়াসে। আর হ্যাঁ, নিকটবর্তী অঞ্জলি হাসপাতালের গায়ের পানিপুরি বিক্রেতার ‘বিশ্বস্ত’ খদ্দেরও তিনি!

ছোট শহরের বড় সুবিধে হল, গল্প থেকে নতুন গল্প জন্ম নেয়, কাহিনি-প্রবাহের নতুন উৎস খুলে। পান-গুমটিতেই শুনলাম, অক্ষরের স্কুল হাঁটাপথ দূরত্বে। যে স্কুলের নাম বাশুড়িওয়ালা হাইস্কুল, যে স্কুল থেকে ক্লাস টুয়েলভপাশ করেছেন অক্ষর। তা, সে স্কুলে গিয়ে দেখা গেল, বোর্ডের পরীক্ষা চলছে। গেটে গোঁফ চুমড়োচ্ছে পুলিশ। কিন্তু অক্ষরের ছেলেবেলার কাহিনির খোঁজে কলকাতা থেকে সাংবাদিকের আগমন দেখে, গোঁফে ‘তা’ দেওয়া থামিয়ে তাঁরাই লোক পাঠিয়ে ডেকে আনলেন স্কুল প্রিন্সিপাল প্রশান্ত উপাধ্যায়কে। পড়ুয়া-জীবনে কেমন ছিলেন অক্ষর? “অত্যন্ত বাধ্য,” হাসতে-হাসতে বলেন প্রশান্তবাবু। “আমি ইংরেজি পড়াই। একবার ইংরেজি টেক্সট বই ক্লাসে আনেনি বলে শাস্তি দিয়েছিলাম। আজ মনে পড়লে হাসি পায়,” স্বগতোক্তি করেন তিনি। দেখা-সাক্ষাৎ হয় এখনও? “একবার দু’জনের গাড়ি মুখোমুখি পড়ে গিয়েছিল। কাঁচ নামিয়ে অক্ষর বলেছিল, স্যর চিনতে পারছেন? ভাবলেই কেমন লাগছে যে, রবিবার ভারত জিতলে, আমার ছাত্র বিশ্বজয়ী হয়ে যাবে,” অস্ফুটে বলার সময় আবেগ-সরণিতে কোথাও হারিয়ে যান প্রশান্ত উপাধ্যায়।

T20 World Cup: Axar Patel wants to be game changer for India in Ahmedabad
অক্ষরের স্কুলের প্রিন্সিপাল প্রশান্ত উপাধ্যায়। ছবি: রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায়

আগে বলা হয়নি। মুম্বইয়ে গত রাতে অক্ষরকে আহমেদাবাদ-অভিশাপ নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, লোকে যে বলে আহমেদাবাদ ভারতের পক্ষে ‘অশুভ’, সে ধারণা রবি-রাতের বিশ্বকাপ ফাইনালের পর কাটবে কি না? ভারত তো জেতেনি এখানে। আড়াই বছর আগের ওয়ানডে বিশ্বকাপ ফাইনাল জেতেনি। দশ দিন পূর্বের দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ জেতেনি। মুচকি হেসে অক্ষর উত্তর দিয়েছিলেন, “আসলে ঘরের ছেলে, এখনও ঘরের মাঠে নামেনি তো, তাই এই ফাঁড়া!” শুক্রবার ঘণ্টা দু’য়েক নাদিয়াদ ঘুরে বুঝলাম, অক্ষরের ধাত্রীগৃহও তাই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। বিশ্বাস করে যে, ঘরের ছেলে ঘরের মাঠে নামলেই কেটে যাবে শাপ, কাটিয়ে দেবেন ঘরেরই ছেলে! ব্যাট, বল আর একজোড়া ‘সোনার’ হাত দিয়ে। যে হাত গত রাতে ছোঁ মেরে তুলে নিয়েছে ইংল্যান্ডের দুই জিয়নকাঠি’ হ্যারি ব্রুক আর উইল জ্যাকসকে। এবং ফাইনালেও নেবে। নেবেই।

আহা, হোক, এ ভাবেই গল্প হোক, অক্ষরের রূপকথায়। বাকি পর্ব না হয় পরের বার এসে শুনে যাব!

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.