দুলাল দে: রাশিয়ার সবচেয়ে বড় ইঞ্জিনিয়ারের নাম কী? মস্কো, সোচি কিংবা সেন্ট পিটার্সবার্গ- যেখানেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলুন, উত্তর পাবেন একটাই–যোশেফ স্তালিন। ১৯২৮-এর দিকে শত্রু-পরিবৃত অনুন্নত একটা চাষি প্রধান দেশে সমাজতন্ত্র গড়তে উদ্যোগী হলেন তিনি। যখন কাজ আরম্ভ করলেন, তখন রুশিরা চাষিপ্রধান এবং নিরক্ষর। আর যখন তিনি কাজ শেষ করলেন, রাশিয়া হয়ে ওঠে পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয় শিল্পোন্নত শক্তি। দু’দুবার দেশটাকে তিনি এই ভাবে গড়ে তোলেন। প্রথমবার হিটলারের আক্রমণের পূর্বে, দ্বিতীয়বার যুদ্ধে ধ্বংসাবশেষের উপরে।
[ ইরান কাঁটা টপকে শেষ ষোলোয় যাওয়া নিশ্চিত করতে মরিয়া পর্তুগাল ]
ঘটনাচক্রে স্তালিন কিন্তু জাতিতে রুশ ছিলেন না। ছিলেন জর্জিয়ান। বাবা মুচি। কিন্তু তিনিই যখন বললেন, রুশরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে। যে কোনও সমাজ-প্রথা নিজেদের পছন্দমতো গড়ে তুলতে পারে, বদলে গেল রুশরা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই বাণী শুনে ঝাঁপিয়ে পড়ল সবাই। স্তালিনের এই প্রস্তাব ১৯২৫ সালে পার্টি কংগ্রেসে ঠিক যে জায়গায় নেওয়া হয়েছিল কাকতালীয়ভাবে সেন্ট পিটার্সবার্গে মেসিদের হোটেল তার থেকে মেরে কেটে সাড়ে তিনশো গজ দূরে। মেসি জন্মসূত্রে হয়তো আর্জেন্টাইন। কিন্তু ধর্ম-কর্ম সবই তো স্পেনে। তবুও দলের সঙ্গী সাথীদের নিয়ে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নামতে হচ্ছে মেসি অ্যান্ড কোংকে। আর তার আগেই দলের পুরো দায়িত্ব নিয়ে নিলেন মেসি আর মাসচারেনো। বলা যায়, সেন্ট পিটার্সবার্গের মাটিতে ফুটবলারদের বিপ্লবের ফের জয়গান।
[ ব্রিটিশ হানায় তছনছ পানামা, হ্যাটট্রিক করে রোনাল্ডো-লুকাকুকে টপকালেন হ্যারি কেন ]
কেননা, গ্রুপের শেষ ম্যাচে দল বাছবেন ফুটবলাররা। কোচ সাম্পাওলি নন। বিশ্বকাপের মাঝে এও এক অনন্য নজির। যা চিরকাল বিশ্বফুটবল ইতিহাসের দলিলে লিপিবদ্ধ থাকবে। রোমেরোর চোটটা যে এভাবে পথে বসিয়ে দেবে সত্যিই ভাবতে পারেননি সাম্পাওলি। ভরসা রেখেছিলেন কাবায়েরোর উপর। কিন্তু শেষ ম্যাচে ক্রোয়েসিয়ার বিরুদ্ধে যেভাবে দলকে ডুবিয়েছেন, তারপর শুধু আর্জেন্টাইন প্রেস কেন, সাধারণ সমর্থকদের চোখেও এখন কাবায়েরো ভিলেন হিসেবে চিহ্নিত। সাম্পাওলির উপর একারণেই আরও বিশেষভাবে ক্ষুদ্ধ ফুটবলাররা। দল গঠনের সময় সিদ্ধান্তটাই নাকি তিনি ঠিক ভাবে নিতে পারেন না। আসলে শুরু থেকে মারাদোনার চাপ, তারপর দেশের সংবাদমাধ্যমের সঙ্গেই এমন ব্যবহার করেছেন যে, সাম্পাওলির এই মুহূর্তে প্রধান প্রতিপক্ষ যেন আর্জেন্টাইন সংবাদ মাধ্যম। ক্রোয়েশিয়া ম্যাচের পর পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে ওঠে বলে তড়িঘড়ি ব্রুনেৎসিতে চলে আসতে হয়েছে দেশের ফুটবল ফেডারেশন প্রেসিডেন্ট ক্লদিও তাপিকে। তাঁকেও অবশ্য একহাত নিতে ছাড়েননি মারাদোনা। ক্রোয়েশিয়া ম্যাচের পর বলে দিয়েছেন, “আর্জেন্টিনার এই হারের জন্য সবচেয়ে দায়ী ক্লদিয়া তাপি। কেন না, সাম্পাওলির মতো লোককে এনে তিনিই তো আর্জেন্টিনার কোচের চেয়ারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন। তাই দলটার এই হাল।”
রবিবার সকালে ব্রুনেৎসিতে সবে প্র্যাকটিস শেষ করে উঠেছেন ফুটবলাররা। দল চলে আসবে সেন্ট পিটার্সবার্গে। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাই এগিয়ে দেওয়া হল মাসচারেনো আর বিগলিয়াকে। কিন্তু সাংবাদিক সম্মেলনে হাজির হয়ে মিডিয়াকে এক হাত নিয়ে নিলেন আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট। –“আপনাদের ভুল খবরের জন্যই আজকে দলের ভেতর এই অবস্থা। সাম্পাওলির সঙ্গে ফুটবলারদের কোনও সমস্যা হয়নি।” কিন্তু ততক্ষণে সংবাদমাধ্যমের কাছে খবর চলে এসেছে, সাম্পাওলি আর একার হাতে দল তৈরি করতে পারবেন না। মেসি আর মাসচেরানোর সঙ্গে আলোচনা করেই দল তৈরি করতে হবে। আর তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় থাকবেন বুরুচাগাও। আর এই আলোচনার শুরুতেই নাম ওঠে গোলকিপার কাবায়েরোকে নিয়ে। কিন্তু শেষ ম্যাচে নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে খেলানো হবে কাকে? আরমানি না গুজম্যান? এর মধ্যে আবার সাধারণ মানুষের কাছেও একটা সমীক্ষা করেছে সংবাদমাধ্যমগুলি। যেখানে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন বলেছেন, কাবায়েরোর জায়গায় খেলানো উচিত আরমানিকে। আবার মেসিদের ভোটও গিয়েছে গুজমানকে ছেড়ে ফ্রাঙ্কো আরমানির দিকেই। তাই আশা করা যাচ্ছে মঙ্গলবার নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে বারের নিচে দাঁড়াবেন আরমানি।
[ বিশ্বকাপের নক-আউটে কারা কারা, কোন অঙ্কে আটকে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ভাগ্য? ]
সেরকম প্রথম দলে কে থাকবেন, হিগুয়েন না আগুয়েরো? এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নিয়েও প্রবল সমস্যা তৈরি হয়েছে। আপাতত যা পরিস্থিতি, তাতে হয়তো নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে হিগুয়েনের প্রথম দলে ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা বেশি। নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে খেলার জন্যে এদিন আর্জেন্টিনা শিবিরে একটা প্রথম একাদশ অবশ্য বেছে নেওয়া হয়েছে। দলটা এরকম-আরমানি, তাগলিয়াফিকো, ওটামেন্ডি, মারকাডো, সালভিও, এনজো পেরেজ, মাসচেরানো, বানেগা, ডি’মারিয়া, হিগুয়েন এবং মেসি। এমনিতে এখানে রাত দশটার পরেও আকাশে ভাল আলো থাকে। অন্ধকারের সম্ভাবনাই নেই। এমনকী রাত বারোটার সময়ও ঠিকঠাক ভাবে বলা যাবে না, সেন্ট পিটার্সবার্গে সূর্যাস্ত হয়েছে কিনা। এদিন রাতেই শহরে চলে এলেন মেসিরা। রাত এই কারণে বলা যে, ঘড়ির কাটা বলছে রাত। না হলে আকাশের আলো দেখে বোঝার উপায় নেই। মঙ্গলবার সেন্ট পিটার্সবার্গে আর্জেন্টিনারও এরকম আলো ঝলমলে আকাশ থাকলেই ভাল। না হলে যে বিশ্বকাপ থেকে চিরকালের মতো ঝরে পড়বে মেসির মতো নক্ষত্র। কেননা, এদিনই আর্জেন্টাইন সূত্রে খবর, এবার বিশ্বকাপ থেকে দেশ বিদায় নিলে আর্জেন্টিনার আকাশ থেকে ঝরে পড়বে এক ঝাঁক নক্ষত্র। আর পরবেন না দেশের জার্সি। সেই তালিকায় অধিনায়ক মেসি এবং সহ-অধিনায়ক মাসচেরানো যেরকম আছেন, তেমনই রয়েছেন রোজো, বানেগা, বিগলিয়া, আগুয়েরো এবং ডি’মারিয়ার মতো ফুটবলাররা। যার অর্থ ফের নতুন করে শুরু করতে হবে আর্জন্টিনার ফুটবল ইতিহাস। আর মঙ্গলবার নাইজেরিয়া ম্যাচ হচ্ছে তার ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ।
সর্বশেষ খবর
-
বিতর্কিত গোল বাতিলেই হার! অদম্য লড়াইয়ের পরও মেসিদের বিরুদ্ধে ট্র্যাজিক নায়ক সালাহ
-
নাগাল্যান্ডের ভুয়ো লাইসেন্সে কেনা পিস্তল দেখিয়ে তাণ্ডব চালাত মিনি ফিরোজ, উদ্ধার সেই ‘বিদেশি’ পিস্তল
-
বিশ্বকাপে অব্যাহত মেসি মহাকাব্য! দু’গোলে পিছিয়ে পড়েও নাটকীয় জয়ে শেষ আটে আর্জেন্টিনা
-
কলকাতা, হাওড়ায় পুরভোট নভেম্বরের শেষেই! ৬০টি ওয়ার্ডে ভাগ হবে হাওড়া
-
১৬০ কোটির সন্দেহজনক লেনদেন, তৃণমূলের টাকাতেই বিমান-হেলিকপ্টার কেনে সংস্থা! প্রকাশ্যে বিস্ফোরক তথ্য