Advertisement
Advertisement
FIFA World Cup

ঘুষ দিয়েই বিশ্বকাপ জিতেছিল আর্জেন্টিনা! মেসিদের সাফল্যে জড়িয়ে দুর্নীতির কালো ইতিহাস

যে দেশে দি'মারিয়া-বুরুচাগাদের মতো প্রতিভার জন্ম, মেসি-মারাদোনার মতো সর্বকালের সেরা ফুটবলার উপহার দিয়েছে যে দেশ-তাদের বিরুদ্ধে এমন নিন্দনীয় অভিযোগ কেন?

Advertisement
অণ্বেষা অধিকারী
অণ্বেষা অধিকারী

শেষ আপডেট: জুলাই ৩, ২০২৬, ১৬:২৯

link
অণ্বেষা অধিকারী
অণ্বেষা অধিকারী

শেষ আপডেট: জুলাই ৩, ২০২৬, ১৬:২৯

options
link
ঘুষ দিয়েই বিশ্বকাপ জিতেছিল আর্জেন্টিনা! মেসিদের সাফল্যে জড়িয়ে দুর্নীতির কালো ইতিহাস zoom
১৬ হাজার কিলোমিটার দূরে বসেও আর্জেন্টিনাকে নিজের দেশের মতো ভালোবাসেন ভারতীয়রা।

আর্জেন্টিনা। দিয়েগো মারাদোনা-লিওনেল মেসির দেশ। ১৬ হাজার কিলোমিটার দূরে বসেও আর্জেন্টিনাকে নিজের দেশের মতো ভালোবাসেন ভারতীয়রা। বিশ্বকাপ থাক বা না থাক, লাতিন আমেরিকার দেশের প্রতি বিরূপ মনোভাব সেঅর্থে নেই ভারতবর্ষে। ফুটবলের মহিমায় গোটা বিশ্বেই এমন প্রচুর মানুষ রয়েছেন, যাঁদের কাছে আর্জেন্টিনা আসলে নিজেরই দেশ। মেসিরা ঘরের ছেলে। কিন্তু ফুটবলের বিশ্বজনীন মঞ্চে ন্যক্কারজনক ইতিহাস রয়েছে এই আর্জেন্টিনারই! বিশ্বকাপের (FIFA World Cup) সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা গুঞ্জনে শোনা যায়, বিশ্বকাপ জিততে এতটাই মরিয়া ছিল মেসিদের দেশ যে প্রতিপক্ষকে রীতিমতো ঘুষ দেওয়া হয়েছিল। আর সেই কাজটা সম্পন্ন করেছিলেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট স্বয়ং।

যে দেশে দি’মারিয়া-বুরুচাগাদের মতো প্রতিভার জন্ম, মেসি-মারাদোনার মতো সর্বকালের সেরা ফুটবলার উপহার দিয়েছে যে দেশ-তাদের বিরুদ্ধে এমন নিন্দনীয় অভিযোগ কেন? নীল-সাদা ভক্তকুলের অনেকেই মানতে চাইবেন না। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় উঁকি দিলে সত্যিই দেখা যাবে, আর্জেন্টাইন ফুটবলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। আজ পর্যন্ত অবশ্য প্রমাণিত হয়নি সেটা। বহু বছর কেটে গিয়েছে, আমজনতার স্মৃতির পাতাও ধূসর হয়েছে। কিন্তু ফুটবলমহলের একাংশে আজও আলোচনা হয়, আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের সঙ্গে কি দুর্নীতির যোগ ছিল না?

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement
Argentina’s first FIFA World Cup victory
আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয়।

ঠিক কী কারণে এমন অভিযোগ? সেটা জানতে হলে আর্জেন্টিনার ইতিহাসে খানিকটা ডুব দিতে হবে। ১৯৭৪ সালে প্রয়াত হন আর্জেন্টিনার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুয়ান পেরোঁ। তাঁর স্ত্রী ইসাবেল বসেন প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে। সেটা মোটেও ভালোভাবে নেয়নি দেশের সেনা। ১৯৭৫ থেকেই দেশজুড়ে শুরু হয় সেনা অভ্যুত্থান। পরের বছর মার্চ মাসে গ্রেপ্তার হন ইসাবেলা। আর্জেন্টিনায় শুরু সামরিক শাসন। প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে বসেন জেনারেল জোর্গে ভিদেলা। তার দু’বছর পরেই বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্বে ছিল আর্জেন্টিনা। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ, সেখানে দল ব্যর্থ হবে? সেটা যেকোনও মূল্যে আটকাতে বদ্ধপরিকর ছিলেন ভিদেলা।

Argentina’s president at the time, General Jorge Videla, was later linked in rumors alleging possible interference in matches involving Peru in 1978 FIFA World Cup
আর্জেন্টিনার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল জোর্গে ভিদেলা।

প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে বসেই দেশজুড়ে কার্যত সন্ত্রাসের রাজত্ব চালিয়েছিলেন ভিদেলা। আমজনতা এবং মূলত বামপন্থীদের অপহরণ করে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো, প্লেনে চাপিয়ে মাঝসমুদ্রে ছুড়ে ফেলার মতো ভয়ংকর অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। অন্তত ৩০ হাজার মানুষ অপহৃত হয়েছিলেন এই সামরিক শাসনকালে-এমনটাই ঐতিহাসিকদের অনুমান। সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, বামপন্থী রাজনীতিকদের ধরে জেলে ভরা, অত্যাচার চালানোটা যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভিদেলার শাসনে। তবে আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা, তাঁর দেশে যে সবকিছু ছবির মতো সুন্দর রয়েছে সেটা প্রমাণ করতে হবে। বিশ্বকাপের মঞ্চেই সেটা সেরে ফেলতে হবে, ধরে নেন ভিদেলা।

সামরিক শাসনের মধ্যেই ১৯৭৮ বিশ্বকাপ খেলতে নামে আর্জেন্টিনা। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ইতালির কাছে ১-০ হেরে যান মারিও কেম্পেসরা। তবে গ্রুপে আগের দুটো ম্যাচেই আর্জেন্টিনা জেতে ২-১ ফলে, ফ্রান্স এবং হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে। গ্রুপে দ্বিতীয় হয়ে পরের রাউন্ডে পৌঁছয় আর্জেন্টিনা। কিন্তু গোলমাল বাঁধে দ্বিতীয় রাউন্ডে গিয়ে। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন না হলে ফাইনালে ওঠার রাস্তা বন্ধ, এই অবস্থায় ব্রাজিলের বিরুদ্ধে গোল শূন্য ড্র করেন কেম্পেসরা। তার আগের ম্যাচে পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২-০ জিতেছিল আর্জেন্টিনা। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায়, স্রেফ গোলপার্থক্যের জোরেই ব্রাজিল উঠে যাবে ফাইনালে। বিদায়ঘণ্টা বাজবে আর্জেন্টাইনদের।

সামরিক শাসনের মধ্যেই ১৯৭৮ বিশ্বকাপ খেলতে নামে আর্জেন্টিনা। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ইতালির কাছে ১-০ হেরে যান মারিও কেম্পেসরা। তবে গ্রুপে আগের দুটো ম্যাচেই আর্জেন্টিনা জেতে ২-১ ফলে, ফ্রান্স এবং হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে। গ্রুপে দ্বিতীয় হয়ে পরের রাউন্ডে পৌঁছয় আর্জেন্টিনা। কিন্তু গোলমাল বাঁধে দ্বিতীয় রাউন্ডে গিয়ে। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন না হলে ফাইনালে ওঠার রাস্তা বন্ধ, এই অবস্থায় ব্রাজিলের বিরুদ্ধে গোল শূন্য ড্র করেন কেম্পেসরা। তার আগের ম্যাচে পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২-০ জিতেছিল আর্জেন্টিনা। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায়, স্রেফ গোলপার্থক্যের জোরেই ব্রাজিল উঠে যাবে ফাইনালে। বিদায়ঘণ্টা বাজবে আর্জেন্টাইনদের।

Argentina squad for the 1978 FIFA World Cup
১৯৭৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা স্কোয়াড।

দ্বিতীয় রাউন্ডের শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনার সামনে কঠিন অঙ্ক-পেরুকে অন্তত ৪ গোলের ব্যবধানে হারাতে হবে। তবেই ব্রাজিলের গোলপার্থক্যকে টপকে ফাইনালে যাওয়া সম্ভব। সেটা না হলে আর্জেন্টিনার সুখের ছবি দেখাতে ভিদেলার যাবতীয় প্রচেষ্টা শেষ। এখান থেকেই শুরু হয় মাঠের বাইরের খেলা। শোনা যায়, ম্যাচের আগে পেরুর ড্রেসিংরুমে পৌঁছে যান ভিদেলা নিজে। সেখানে আর্জেন্টিনা এবং পেরুর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলেই পরে শোনা যায়। বিশ্বকাপে ম্যাচের আগে বিপক্ষ দেশের প্রেসিডেন্ট ড্রেসিংরুমে হানা দিলেন-এমন ঘটনা সম্ভবত ঘটেনি কখনও।

খেতাবি যুদ্ধেও একের পর এক নিয়মবিরুদ্ধ আচরণ করেছিল নীল-সাদা ব্রিগেড। নির্ধারিত সময়ের পাঁচ মিনিট পর মাঠে নামে আর্জেন্টিনা। তারপর প্রশ্ন তোলে নেদারল্যান্ডসের মিডফিল্ডার রেনে ভান দে খেরকফের হাতের প্লাস্টার নিয়ে। গোটা টুর্নামেন্ট এই প্লাস্টার নিয়েই খেলেছিলেন তিনি। কিন্তু ফাইনালে এসে প্রশ্ন ওঠায় হতচকিত হয়ে যায় ডাচ ব্রিগেড। শেষ পর্যন্ত ব্যান্ডেজ পরে খেলতে নামেন খেরকফ।

ওই বৈঠকের পরেই এক আশ্চর্য ম্যাচ দেখে ফুটবলবিশ্ব। ৬-০ গোলে ওই ম্যাচ জেতেন কেম্পেসরা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটাই আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ ব্যবধানে জয়। পরে অবশ্য ২০০৬ সালে সার্বিয়া-মন্টেনেগ্রোকেও ৬-০ হারিয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেদিন পেরুকে ৬-০ হারানোর ফলে বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছে যায় লা আলবিসলেস্তে। ওই ম্যাচে পেরুর হয়ে খেলা গোলকিপারের জন্ম হয়েছিল আর্জেন্টিনায়। হারের দায়টা গিয়ে পড়ে তাঁর ঘাড়েই। ফুটবলমহলের মনে আজও প্রশ্ন, সেদিন কি গড়াপেটার করাল ছায়া গ্রাস করেছিল বিশ্বকাপকে? সেনা শাসকের চাপের মুখে পড়ে ম্যাচ ছেড়ে দিয়েছিল পেরু?

Military rule began in Argentina. General Jorge Videla took over as president. Two years later, Argentina was set to host the FIFA World Cup
আর্জেন্টিনায় দীর্ঘদিনের সামরিক শাসন।

এই সন্দেহ আরও দৃঢ় হয় বিশ্বকাপের পর। সেসময়ে প্রবল দারিদ্র্যে ভুগছে পেরু। ‘যথার্থ প্রতিবেশী’র কর্তব্য পালন করে পেরুর পাশে দাঁড়ায় ভিদেলার প্রশাসন। মানবিক সাহায্য হিসাবে ৩৫ হাজার টন খাদ্যশস্য পাঠানো হয় পেরুতে। এখানেই শেষ নয়, দেশটির ৫০ মিলিয়ন ডলারের সম্পত্তি ফ্রিজ করে রেখেছিল আর্জেন্টাইন প্রশাসন। বিশ্বকাপের পরে সেই সম্পত্তিও ফিরিয়ে দেওয়া হয় পেরুকে। বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক বন্দিও আর্জেন্টাইন কারাগার থেকে মুক্তি পান। প্রশ্ন উঠতে বাধ্য, হঠাৎ পেরুর প্রতি কেন এত উদার হল ভিদেলার প্রশাসন? এটা কি ৬-০ হারের পুরস্কার?

পেরুকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা, প্রতিপক্ষ নেদারল্যান্ডস। সেই খেতাবি যুদ্ধেও একের পর এক নিয়মবিরুদ্ধ আচরণ করেছিল নীল-সাদা ব্রিগেড। নির্ধারিত সময়ের পাঁচ মিনিট পর মাঠে নামে আর্জেন্টিনা। তারপর প্রশ্ন তোলে নেদারল্যান্ডসের মিডফিল্ডার রেনে ভান দে খেরকফের হাতের প্লাস্টার নিয়ে। গোটা টুর্নামেন্ট এই প্লাস্টার নিয়েই খেলেছিলেন তিনি। কিন্তু ফাইনালে এসে প্রশ্ন ওঠায় হতচকিত হয়ে যায় ডাচ ব্রিগেড। শেষ পর্যন্ত ব্যান্ডেজ পরে খেলতে নামেন খেরকফ।

ফাইনালের ঠিক আগে এহেন আচরণে ডাচ ব্রিগেডের ফোকাস নষ্ট হয়ে যায় বলেই পরবর্তীকালে জানা গিয়েছিল। ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছেন রেফারি, এমন অভিযোগও আনে নেদারল্যান্ডস। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের শেষে ম্যাচের ফলাফল ছিল ১-১। অতিরিক্ত সময়ে গিয়ে গোল করেন কেম্পেস এবং বেরতোনি। ৩-১ জিতে প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। কিন্তু পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান বয়কট করে নেদারল্যান্ডস, পক্ষপাতী আচরণের প্রতিবাদে। ১৯৭৮ বিশ্বজয়ের ফলে ফুটবল মানচিত্রে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায় আর্জেন্টিনা, কিন্তু প্রদীপের নিচে জমে থাকা অন্ধকারের মতো আজও থেকে গিয়েছে দুর্নীতি-গড়াপেটার অভিযোগ।

The final match of 1978 FIFA World Cup
১৯৭৮ বিশ্বকাপ ফাইনাল।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.