রাজনীতি ছাড়া বাঙালির একদিনও চলবে না৷ তাই বছরশেষে একবার ঘুরে দেখা এবছরের হেডলাইন তৈরি করা রাজনৈতিক ঘটনাগুলি৷ কয়েকটি ঘটনা এই বিভাগে না পেলেও সেই খবর মিলবে ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর ‘ষোলো চলা পূর্ণ‘-য় প্রকাশিত অন্যান্য বিভাগে৷
১. আন্তর্জাতিক পরমাণু ক্লাবে ভারতের প্রবেশের প্রস্তুতি:
পারমাণবিক বোমা বানাতে যে যে উপাদান লাগে সেই সব প্রযুক্তি, উপাদান ও সেগুলির রফতানি নিয়ন্ত্রণ করে যে আন্তর্জাতিক গ্রুপ, সেই এলিট পরমাণু ক্লাবে ভারতের প্রবেশ নিয়ে উদ্যোগী হন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি৷ পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে স্বাক্ষর না করেই ভারত ওই ক্লাবে ঢুকতে চায়৷ ৪৮ সদস্যের আন্তর্জাতিক পরমাণু ক্লাবে ভারতের প্রবেশপথে একমাত্র প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে চিন৷ সিওলে এনএসজি সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রগুলি ভারতের অন্তর্ভুক্তিতে সমর্থন জানালেও চিন তাদের অবস্থানে অনড় হয়ে থাকে! বেজিংয়ের দাবি, ভারত নয়, এনএসজি-তে পাকিস্তানের সদস্যপদ পাওয়া উচিত৷ কিন্তু চিনের তীব্র বিরোধিতা করে ভারতের পাশে দাঁড়ায় আমেরিকা৷

২. ব্রেক্সিট:
ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দিল ব্রিটেন৷ ২৩ জুন গণভোটে ব্রিটেনের ৫২ শতাংশ মানুষ ‘ইইউ’ ছেড়ে বেরিয়ে আসার পক্ষে মত দেন৷ কনজারভেটিভ পার্টির তরফে নয়া প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন থেরেসা মে৷
৩. ‘খলনায়ক’ জাকির নায়েক:
বিতর্কিত ইসলাম প্রচারক জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে কড়া ব্যাবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হয় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক৷ বাংলাদেশের গুলশন হামলায় জড়িত জঙ্গিরা এই নায়েকের বক্তব্য শুনেই অনুপ্রাণিত হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে৷ ভারতে জাকিরের ‘পিস টিভি’র সম্প্রচার নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করে কেন্দ্র৷ গ্রেফতারির ভয়ে দেশ ছেড়ে পালান নায়েক৷ তাঁর স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির বিরুদ্ধেও আর্থিক তছরুপের অভিযোগ ওঠে সেগুলির উপর নজর রাখতে শুরু করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট৷

৪. বুরহান ওয়ানি ও অশান্ত কাশ্মীরে পেলেট গানের দাপাদাপি:
কাশ্মীরের হিজবুল কমান্ডার বুরহান ওয়ানির মৃত্যুতে উত্তাল হয়ে ওঠে কাশ্মীর৷ ৮ জুলাই কেন্দ্রীয় নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর হাতে নিকেশ হয় বুরহান৷ তার কাজ ছিল, কাশ্মীরি যুবকদের প্রলোভন দেখিয়ে জঙ্গি তৈরি করা৷ তার মৃত্যুর পর নজিরবিহীনভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে উপত্যকা৷ আন্দোলনকারীদের হঠাতে পুলিশের পেলেট গান ব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে দেশবাসীর একাংশ৷ শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের উদ্যোগে পেলেট গান প্রত্যাহার করা হয়৷ নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারান প্রায় ৮৫ জন , আহত হন ১৩ হাজার জন৷ ২০১০ সালের পর ভূস্বর্গ এতটা অশান্ত হয়ে ওঠেনি৷ টানা ৫৩ দিনেরও বেশি সময় ধরে কারফিউ জারি থাকে কাশ্মীরে, স্তব্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট পরিষেবা৷তবে নোট বাতিলের পর খানিকটা আচমকাই যেন শান্ত হয়ে গিয়েছে উপত্যকা৷

৫. তুরস্কে সেনা অভ্যুত্থান:
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপ এরদোগান এবং তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর একটি অংশ অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে। ট্যাঙ্ক, যুদ্ধবিমান থেকে তীব্র গুলিবর্ষণ চলে আঙ্কারায়৷ কমপক্ষে ২৯০ জন নিহত এবং ১,৪৪০ জনেরও বেশি আহত হন। আঙ্কারা, তুরস্কের পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে বোমা ফেলা হয়৷ ইস্তানবুলের প্রধান বিমানবন্দর দখল করার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয় বিদ্রোহীরা৷ সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে বিদ্রোহ রুখে দেন৷ সরকার কড়া হাতে ওই বিদ্রোহ দমন করা হয়৷ ২,৮৩৯ জন সেনা-সহ ৬,০০০ জনেরও বেশি গ্রেফতার হন।

৬. বঙ্গ না বাংলা?
‘পশ্চিমবঙ্গ’ নাম পরিবর্তন করে ‘বঙ্গ’ বা ‘বাংলা’ করতে চায় রাজ্য সরকার। বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা সর্বদল বৈঠকে পরিষদীয় মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় জানিয়ে দেন, সরকার চায় রাজ্যের নাম হোক ‘বাংলা’। ইংরেজিতে বলা হবে বেঙ্গল, হিন্দিতে বঙ্গাল। কিন্তু সরকারের সেই প্রস্তাবে ঘুরিয়ে আপত্তি জানায় বাম-কংগ্রেস। প্রস্তাবটি সরাসরি খারিজ করে দেয় বিজেপি।
৭. জিএসটি:
সাধারণ পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) চালুর জন্য সংবিধান সংশোধনী বিল, যেটি ২০১৫-র মে মাসে লোকসভায় পাশ হয়েছিল, সেটি ৪ আগস্ট পাশ হয় রাজ্যসভায়। কংগ্রেস থেকে শুরু করে বাকি সব বিরোধী দল একজোট হয়েই জিএসটি-র পক্ষে ভোট দেয়। সংবিধানের ১২২তম সংশোধনীর পক্ষে সায় দেন রাজ্যসভায় উপস্থিত ২০৩ জন সাংসদই।

জিএসটি চালু হলে সারা দেশে একই ধরনের কর কাঠামো বলবৎ হবে, যাকে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী-সহ নানা মহল থেকেই বলা হচ্ছে, ‘এক দেশ, এক কর’। একটি হিসেবে, এই ব্যবস্থার ফলে জিডিপি ১.৫ শতাংশের বেশি বাড়বে। অন্যদিকে, বিভিন্ন করের হার পুনর্বিন্যাসের ফলে, বিশেষ করে পরিষেবার উপর করের হার বাড়ার ফলে প্রথম কয়েক বছর মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা আছে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এ সবই হবে জিএসটি কার্যকর হওয়ার পরে, যা এখনও অন্তত এক-দেড় বছর পরের ব্যাপার।
৮. সার্জিক্যাল স্ট্রাইক:
৯ সেপ্টেম্বর পাক অধিকৃত কাশ্মীরে ঢুকে ৩৫-৫০ জন পাক জঙ্গিকে খতম করে ভারতীয় ফৌজ৷ যদিও পাকিস্তান সেই দাবি উড়িয়ে দেয়৷ উরিতে পাক জঙ্গিরা হানা দিয়ে ১৯ জন ভারতীয় সেনাকে হত্যা করেছিল৷ ওই হামলার পাল্টা আঘাত হানতেই সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, দাবি করে সেনাবাহিনীর একটি সূত্র৷ এটাই অবশ্য প্রথম নয়, ইউপিএ জমানাতেও পাক অধিকৃত আজাদ কাশ্মীরে ঢুকে পাক রেঞ্জার্সদের উচিত শিক্ষা দিয়েছিল ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী৷

৯. চিনা পণ্য বয়কট:
রাষ্ট্রসংঘে মাসুদ আজহারকে সন্ত্রাসবাদী তকমা দেওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি জানায় বেজিং। ভারত সিন্ধু জল চুক্তি পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দেওয়া মাত্র চিন ব্রহ্মপুত্রের একটি শাখা নদীর জল ভারতে ঢোকা বন্ধ করে দেয়! এই প্রেক্ষিতে দেশজুড়ে দাবি ওঠে, চিনকে শিক্ষা দিতে ভারতীয় বাজারে তাদের তৈরি পণ্য বয়কট করা হোক। খোদ নরেন্দ্র মোদির রাজ্য গুজরাত চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ ফতোয়া জারি করে, জাতীয় স্বার্থে এখন থেকে চিনা পণ্য ব্যবহার করা হবে না৷ দীপাবলিতে চিনা আলো কেনা থেকে শুরু করে মোবাইল ফোন- দেশে চিনা পণ্যের বিক্রি একধাক্কায় তলানিতে নেমে যায়৷
১০. যদু বংশে কাকা-ভাইপো তীব্র মতপার্থক্য:
পুত্র অখিলেশ যাদবের বিদ্রোহে বিপর্যস্ত সমাজবাদী পার্টির সর্বময় কর্তা মুলায়ম সিং যাদব। যদুবংশে মুষলপর্ব ঠেকাতে তিনি আলোচনার মাধ্যমে ভাই শিবপাল যাদব ও পুত্র অখিলেশের যুদ্ধ থামাতে চান। মুলায়ম চাইছিলেন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ছেলে দেখুক সরকার আর ভাইয়ের হাতে থাক দলের দায়িত্ব। সেই অনুযায়ী ছেলেকে সরিয়ে ভাইকে রাজ্য সভাপতি করার পর মুখ্যমন্ত্রীও পাল্টা আঘাত হানেন। শিবপালের হাত থেকে সব দফতর কেড়ে নিয়ে সরকারের মধ্যে তাঁকে তাৎপর্যহীন করে দেন অখিলেশ। ইঙ্গিতটা স্পষ্ট, সরকারের কাজকর্মে তিনি বাবার হস্তক্ষেপও মেনে নেবেন না।

১২. ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়:
আমেরিকার এক ধনকুবের থেকে হোয়াইট হাউসে উত্তরণের গল্প যে কোনও সিনেমার চিত্রনাট্যকে হার মানাবে৷ এবছরের মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের বিজয়ী প্রার্থী ট্রাম্প ১৯৬৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর পিতার প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেন। ১৯৭১ সালে ট্রাম্প তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন এবং প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে ‘দ্য ট্রাম্প অর্গানাইজেশান’ রাখেন। ট্রাম্প বর্তমানে আমেরিকার রিয়েল এস্টেট ব্যবসার এক তারকা বললেও অত্যুক্তি হবে না। ৮ নভেম্বরের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে তিনি ৩০৬টি ইলেক্টরাল ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে ট্রাম্পের জয়ের পিছনে রুশ হ্যাকারদের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ সিআইএর।

আরও পড়ুন-
যেসব সন্ত্রাসের ঘটনা এবছর বিষ ছড়াল বাতাসে
সর্বশেষ খবর
-
বদলে যাবে সোদপুর ও খড়দহ স্টেশনের নাম! রেলমন্ত্রকে প্রস্তাব মন্ত্রী কল্যাণ চক্রবর্তীর
-
অধিনায়কত্ব খোয়াচ্ছেন সূর্যকুমার, ভারতের নতুন টি-২০ অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ার!
-
এই ৬ আন্তর্জাতিক গন্তব্যে স্থগিত ইন্ডিগোর বিমান পরিষেবা! বড় সিদ্ধান্ত দেশের বৃহত্তম উড়ান সংস্থার
-
প্রয়াত ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান কার্যনির্বাহী কর্তা নারায়ণ বসু
-
শ্লীলতাহানি, তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার স্বরূপ বিশ্বাস, ডিম হাতে থানা ঘেরাও ক্রুদ্ধ জনতার