Purulia

‘লক্ষ্মী এল ঘরে’, আনন্দে নাচ প্রপিতামহীর! মাইক বাজিয়ে কন্যারত্নকে ঘরে আনল পরিবার

গোটা গ্রামে মিষ্টি বিলি, কন্যাসন্তানের জন্মে অন্য ছবি দেখল পুরুলিয়ার পুঞ্চায়।

সুমিত বিশ্বাস
সুমিত বিশ্বাস

শেষ আপডেট: আগস্ট ৯, ২০২৬, ২১:২০

options
link
‘লক্ষ্মী এল ঘরে’, আনন্দে নাচ প্রপিতামহীর! মাইক বাজিয়ে কন্যারত্নকে ঘরে আনল পরিবার
কন্যারত্ন ঘরে আসায় দারুণ খুশি, নাচ প্রপিতামহীর। পুরুলিয়ার পুঞ্চায়, নিজস্ব ছবি

কন্যাসন্তান জন্মালে কোথাও কোথাও তুমুল অশান্তি, কোথাও সেই অশান্তি আরও কয়েকধাপ বেড়ে গৃহবধূকে ঘরে না আনার মতো ঘটনার নজির কম নয়। কন্যাভ্রূণ হত্যা কিংবা সদ্যোজাত মেয়েকে খুন করার ঘটনাও কম ঘটে না এদেশে। আজকের এআই যুগেও প্রদীপের নিচে এসব জমাট বাঁধা অন্ধকার কেটে যায়নি, আধুনিক মানুষ হিসেবে এ আমাদেরই বড় কলঙ্ক! কিন্তু এসবের উলটো ছবিটাই আজ দেখল পুরুলিয়ার পুঞ্চার অজ পাড়া গাঁ। পরিবারে চতুর্থ প্রজন্মের কন্যাসন্তানকে ‘ঘরের লক্ষ্মী’ বলে মহা সমারোহে তার ‘গৃহপ্রবেশ’ করল পরিবার। গাড়ি সাজিয়ে, ঢাক-ঢোল, ব্যান্ডপার্টি, মাইক বাজিয়ে, মিষ্টি বিলি করে সেই মেয়েকে স্বাগত জানালেন প্রপিতামহী। শুধু তাই নয়, নাতির ঘরে পুতি হওয়ার আনন্দে তিনি নিজেও নাচলেন!

Advertisement

শনিবার পুঞ্চার ভূতাম গ্রামে ওই নবজাতিকা ফুলে সাজানো দুধ সাদা গাড়ি থেকে নামতেই শুরু হয় উলুধ্বনি। সেই সঙ্গে বেজে ওঠে শঙ্খ। প্রদীপ জ্বালিয়ে আরতি করে কন্যাসন্তানকে বরণ করে ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। শনিবার থেকে ওই উৎসব রবিবারও চলছে। এদিনও ওই সদ্যোজাতর বাড়িতে বাজছে গান। চলছে মিষ্টিমুখ। পুঞ্চা ব্লকের ওই ভূতাম গ্রামের বাসিন্দা শুভজিৎ সহিস তাঁর সন্তানসম্ভবা স্ত্রী অনিতা সহিসকে ভর্তি করেছিলেন পুঞ্চা ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। গত বুধবার সেখানেই কন্যাসন্তানের জন্ম দেন অনিতা দেবী। তখন থেকেই খুশির জোয়ার ওই পরিবারে। প্রপিতামহী অর্থাৎ বড় মা শান্তি সহিসের কোনও মেয়ে নেই। তিন ছেলে।

Advertisement
ফুলে সাজানো দুধ সাদা গাড়িতে নবজাতিকাকে আনা হল ঘরে, পুরুলিয়ার পুঞ্চার ভূতাম গ্রামে, নিজস্ব ছবি

তবে ছেলেদের মেয়ে থাকলেও নাতনির সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর মেয়ে হোক এটাই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে আসছিলেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘আমার তিন ছেলে। কোনও মেয়ে নেই। তবে ছেলেদের মেয়ে আছে। নাতনির স্ত্রী সন্তানসম্ভবা হওয়ায় আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল যেন লক্ষ্মী ঘরে আসে। ঈশ্বর সেই কথা শুনে নেওয়ায় আমার প্রপৌত্রীকে আনতে আমরা এমন আয়োজন করলাম। কী যে আনন্দ হচ্ছে বলে বোঝাতে পারব না। তাই আমি নিজে হাসপাতালে গিয়েছিলাম নবজাতিকাকে আনতে। খুব নেচেছি। এখনও নাচতে ইচ্ছে করছে।” পুঞ্চা ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে ওই কন্যা সন্তানকে গাড়িতে চাপানোর পরেই শুরু হয়ে যায় মিষ্টি বিলি।

Advertisement

প্রায় ৯ কিলোমিটার গ্রামীণ পথ, যেখানে আসতে সময় লাগে ২০ মিনিট। কিন্তু ঢাক-ঢোল, ব্যান্ডপার্টি, মাইক বাজিয়ে শোভাযাত্রায় ফুটফুটে কন্যা সন্তানকে ঘরে আনতে এক ঘন্টা লেগে যায়। প্রথমে সুসজ্জিত ব্যান্ড পার্টি। তারপর টোটোর ছাদে বাঁধা তিনটি মাইক। কন্যাসন্তানের জন্ম দেওয়া অনিতা সহিস বলেন, ‘‘আমাদের সমাজে এখনও ছেলেমেয়ের ভেদাভেদ রয়েছে। ছেলে হলে যা খুশি হয়। তা মেয়ের ক্ষেত্রে হয় না। নিজে মেয়ে হয়ে বুঝতে পারি। কিন্তু আমার মেয়ের ক্ষেত্রে শ্বশুরবাড়ি যা করল কোনওদিন ভুলব না। এত ভালো লাগছে, এত খুশি হচ্ছে। সকলকে এটাই বলব, আমার মেয়েকে আশীর্বাদ করুন ও যেন অনেক বড় হতে পারে।”

অনিতা সহিসের ফুটফুটে কন্যাসন্তান, নিজস্ব ছবি

এমন আনন্দের আবহে ওই নবজাতিকার নাম কী রাখা হবে তা যেন ঠিক করতে পারছে না পরিবার। ওই শিশু কন্যার বাবা শুভজিৎ সহিস বলেন, ‘‘ঠাকুমার নাচ এখনও চলছে। আমরা এত আনন্দিত মেয়ের নাম ঠিক করতে পারছি না। আমরা এই দায়িত্ব ঠাকুমার হাতেই সঁপেছি।” নাতনিকে পেয়ে খুশি ঊষা সহিস বলেন, ‘‘শাশুড়ি আমাদের মেয়ের মতোই দেখেছেন। ঘরে লক্ষ্মী আসার আনন্দে ওঁর যে আয়োজন এই সমাজকেও একটা আলাদা বার্তা দেবে।”

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.