Korpoor Film Review

মানবিক আবেদনে মুখর টানটান থ্রিলার, কেমন হল অরিন্দম-কুণালের ‘কর্পূর’?

প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার আগে ঝটপট পড়ে নিন ছবির রিভিউ।

শম্পালী মৌলিক
শম্পালী মৌলিক

শেষ আপডেট: মার্চ ২০, ২০২৬, ১৩:৪০

options
link
মানবিক আবেদনে মুখর টানটান থ্রিলার, কেমন হল অরিন্দম-কুণালের ‘কর্পূর’?
জেনে নিন কেমন হল কুণাল ঘোষ অভিনীত 'কর্পূর'

প্রবল বৃষ্টির রাত। এগারোটা বাজে। তখনও ইউনিভার্সিটির একটি ঘরে বসে কাজ করছেন অধ্যাপক মৌসুমি সেন। সারছেন কিছু জরুরি ফোন। অপেক্ষায় তাঁর ড্রাইভার। ঝড়বাদলের রাতে ফিরতে হবে উত্তরপাড়া। ঠিক তার পরের সিকোয়েন্সেই মৌসুমি সেন নিখোঁজ হয়ে যান। সত্যি ঘটনার ছায়ায় এই ছবি। প্রথম দৃশ্য থেকে দর্শকের মনোযোগ কেড়ে নেয়। অরিন্দম শীল পরিচালিত ‘কর্পূর’ (Korpoor Film Review) রাজনৈতিক থ্রিলার এতদিনে সকলেই জানেন। দীপান্বিতা রায়ের ‘অন্তর্ধানের নেপথ্যে’ উপন্যাস এই ছবির আধার হলেও, সিনেমার প্রয়োজনে চিত্রনাট্যে কিছু বদল আনা হয়েছে।

Advertisement

১৯৯৭ সালে কলকাতা ইউনিভার্সিটির ডেপুটি কন্ট্রোলার অফ এগজামিনেশন মনীষা মুখোপাধ্যায়ের হঠাৎ করে উধাও হয়ে যাওয়ার কাহিনির অনুপ্রেরণায় এই ছবি। চিত্রনাট্যে বাম জমানার ৫০ কোটি টাকার শিক্ষা দুর্নীতি ছাপ ফেলেছে। ধরা হয়েছে ১৯৯৭ ও ২০১৯ সালের প্রেক্ষিত। বাস্তবের সঙ্গে ছবির হুবহু মিল নেই। মৌসুমি সেন কর্পূরের মতো উধাও হয়ে যান। না কি অপহৃত হন? না কি কোথাও পালিয়ে যান? এ বিষয়ে নানা মত থাকলেও, উত্তর খোঁজার যাত্রায় মানবিক আবেদনের কারণে ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক থ্রিলারটি।

Advertisement
Film review of Kunal Ghosh starrer Korpoor
পর্দায় রাজনীতিক শংকর মল্লিকের ভূমিকায় দেখা গিয়েছে কুণাল ঘোষকে। ছবি: ফেসবুক

মৌসুমি সেনের চরিত্রে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। অন্তর্ধানের জট ছাড়াতে ১৯৯৭ সালের ক্লোজড কেস রি-ওপেন হচ্ছে। দু’জন উঠতি সাংবাদিক যার সূত্রধর। রিয়া তামাং (লহমা ভট্টাচার্য) এবং তার সহকর্মী অনুপম রায় (অর্পণ ঘোষাল) নিজেদের উদ্যোগে স্কুলের অন্বেষণে নেমে পড়ে। আর টিয়ারপি-র অমোঘ টানে তাদের সঙ্গত করে নিউজ চ্যানেলের চিফ গৈরিকা (অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়)। দুটো সময়কাল মেলানোর ক্ষেত্রে সম্পাদনার প্রশংসা করতেই হয়। গল্পে রিয়া যে বাড়িতে থাকে তার বাড়িওয়ালা মৌসুমি সেনের মা (রুমকি চট্টোপাধ্যায়)। বৃদ্ধ মহিলা এখনও নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মেয়ের অপেক্ষায়।

Advertisement

এই নিখোঁজ রহস্য উদঘাটনের পথে, দাবার ঘুঁটির জটিল চালের মতো এক-একজনের নাম উঠে আসে। সেই সময়ের এক সাংবাদিকের কাছে ছুটে যায় রিয়া-অনুপম। তাদের পুরনো কেস ঘাঁটতে সবচেয়ে সাহায্য করে কলকাতা পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত গোয়েন্দা রাখহরি গোস্বামী (ব্রাত্য বসু)। যে নাকি অতীতে মৌসুমি সেনের কেসের গভীরে যেতে গিয়েই। উপরমহলের বিরাগভাজন হয়েছিল। রিয়া-অনুপম সাহায্য নেয় তৎকালীন ‘নবজাগরণ’-দলনেতা নিলয় বিশ্বাসের (সাহেব চট্টোপাধ্যায়)। মৌসুমি সেনের মুখে শোনা যায়, ‘বৃহত্তর স্বার্থে জেনেশুনে খারাপ কাজ করতে হয়’-এর মতো সংলাপ। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে রেজাল্টের মার্কস বাড়ানো, ব্যাঙ্ক বিক্রি, নম্বর পিছু পঞ্চাশ হাজার টাকা নেওয়া, এরকম নামা অভিযোগ তার নামে। উঠে আসে শাসকদলের হয়ে, অদৃশ্য ম্যাডামের নির্দেশে তার নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ইতিবৃত্ত।

Kunal-Ghosh
বিনোদিনী থিয়েটারে প্রথম শো-তে টিম ‘কর্পূর’। ছবি: কুণাল ঘোষের ফেসবুক

বলা যায়, লাল পার্টি তাকে ব্যবহার করেছিল, না কি সে-ই কালপ্রিট- প্রশ্নগুলো সামনে আসে। উঠে আসে মৌসুমির বৈবাহিক জীবনের সমস্যা আর মানসিক টানাপোড়েন। ছবি এগোলে দেখা যায় লাল দলের দুই নেতা নিলয় বিশ্বাস ও শংকর মল্লিকের (কুণাল ঘোষ) ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। শাসকদলের ঘনিষ্ঠ মৌসুমি শুধুই ডেপুটি কন্ট্রোলার অফ এগজামিনেশন নয়, আক্ষরিক অর্থেই হয়ে ওঠে এইউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক। সঙ্গে তার দুই শাগরেদ ড্রাইভার রতন আর আপ্তসহায়ক বনমালী। ক্ষমতার অতি-নিকটে থাকতে থাকতে একসময় ক্ষমতাই মৌসুমিকে গ্রাস করে। প্রথমার্ধে গল্পের ভিত তৈরির দিকে জোর দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধে ছবির গল্প গতি পায়। একটা অন্তর্ধান ঢাকতে কীভাবে একটার পর একটা খুন হয়ে যায় দেখতে হয়। এই পর্বে পার্টির রাজ্য সম্পাদকের চরিয়ে শংকর মল্লিকের আবির্ভাব। প্রথম দৃশ্যেই তার সংলাপ ‘মানুষের ভরসা যদি জিততে হয়, প্রথমে তাদের মনে ভয় ঢোকাতে হবে।’ ধুরন্ধর রাজনীতিক শংকর মল্লিককে ধারণ করেছেন কুণাল ঘোষ। বাড়ির দুর্গাপুজোয় তাঁর মুখে ‘আমি মহিষাসুর’ প্রকৃত অর্থেই সমীহ জাগায়।

এই চক্রে শংকর আর মৌসুমির যোগাযোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখাই ভালো। ছবির শেষে এমন কিছু টুইস্ট আছে যা একেবারে অপ্রত্যাশিত। বাস্তবে মনীষা অন্তর্ধানের যে কটি তত্ত্ব আছে, সেগুলো ছুঁয়েও, সিনেমার প্রয়োজনে যে কাল্পনিক কাহিনি নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে মানবিক স্পর্শ রয়েছে। শুধুই দুর্নীতির সন্ধান নয়। ভালোবাসা, প্রতিশোধ, প্রেম, সম্পর্কের ভাঙাগড়ার দিকগুলো মন ছুঁয়ে যায়। তবে প্রথমার্ধ অতিরিক্ত সংলাপের ভারে মন্থর। দ্বিতীয়ার্ধ তুলনায় গতিশীল। রথীজিৎ ভট্টচার্যের মিউজিক ছবির মেজাজের সঙ্গে সুপ্রযুক্ত। অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়ের ক্যামেরার কাজ ভালো।

এবার আসা যাক অভিনয় প্রসঙ্গে। অবলীলায় অন্যায় কাজ করতে করতে একসময় অন্তর্দ্বন্দে ভেঙে পড়া মৌসুমির ভূমিকায় ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর অভিনয় বহুদিন মনে থাকবে। নিয়ন্ত্রিত অথচ জোরালো অভিনয়ে ছাপ রেখে যান তিনি। রাখহরির চরিত্রে ব্রাত্য বসু উর্দিহীন পুলিশের হতাশা এবং অতীত ইতিহাস, মাত্র কয়েকটি বাক্য আর অভিব্যক্তিতেই তুলে আনেন। ধর্মকর্ম নিয়ে সে থাকে এখন কিন্তু প্রশ্নর তার বুদ্ধির অ্যান্টেনা। রহস্যসন্ধানী দুই তরুণ-তরুণীর সঙ্গে রাখহরির বন্ডিং চমৎকার লাগে প্রতার অভিনয় গুণে।

শংকর মল্লিকের চরিত্রে বাম নেতার ছায়া থাকলেও, কুণাল ঘোষ স্বতন্ত্র ভঙ্গিতে চরিত্রটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। সিনেমায় প্রথম আবির্ভাবে তিনি চমকে দিলেন। তবে তাঁর এন্ট্রি আরও আগে হবেই। য হতেই পারত। তাঁর বিপ্রতীপে আকর্ষণীয় লেখেছে রাজনীতিক নিলয়ের ভূমিকায় সাহেব চট্টোপাধ্যায়কে। সুন্দর অথচ শয়তান। ঋতুপর্ণা আর সাহেবের মুখোমুখি দৃশ্যগুলো পর্দায় বিশেষ তরঙ্গ ভোলে। মৌসুমির স্বামীর চরিত্রে স্বল্প পরিসরে বেশ ভালো অরিন্দম শীল।

অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় নিউজ এডিটরের চরিত্রে মানানসই। অজস্র চরিত্র ছবিতে দর্শকের একটু গুলিয়ে যেতে পারে, তবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মন জয় করল দুই নবীনের উপস্থিতি লহমা ভট্টাচার্য এবং অর্পণ ঘোষাল। খুব গুরুত্বপূর্ণ লহমার চরিত্রটি। চিত্রনাট্য যত এগিয়েছে, লহমা প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে চরিত্রটি ধরে ফেলেছেন। ভালো লাগে অর্পণের স্মার্ট ঝরঝরে অভিনয়। বিষয়গত কারণে অরিন্দম শীলের এই ছবি নিয়ে দর্শকের কৌতূহল রয়েছে। সব মিলিয়ে এই নির্বাচনের আবহে ধুরন্ধর নেতারা যখন অভিনেতা, এই ছবি উবে যাবে না এটুকু নিশ্চিত।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.