ঢেউ। দূর থেকে আসে, ছুঁয়ে চলে যায়। এ যেন সমুদ্রেরই ইচ্ছে। তীরে দাঁড়িয়ে থাকা একলা মানুষের হাত-পা, একবার ছুঁয়ে দেখা। সেই মানুষটি কী করে? আনন্দে, আহ্লাদে হাত বাড়ায়, দাঁড়িয়ে থাকে বিনম্র হয়ে। কলকাতায় কোনও সমুদ্র নেই। এককালে গড়গড়িয়ে ট্রাম চলত যখন অনেক, তখন মাঝে মাঝে শব্দবিভ্রম হত– মনে হত সমুদ্রের গর্জন। কিন্তু আজও সমুদ্র তৈরি হয়। তৈরি হয় ঢেউ। ছুঁয়ে যায়। এই সমুদ্র– জনসমুদ্দুর। এই ঢেউ মানুষের। কীভাবে তা তৈরি হয়? যখনই রাস্তার মাঝখান ধরে হেঁটে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)।
আরও পড়ুন:
এই পশ্চিমবঙ্গেই– কলকাতায়, মফস্সলে, গ্রামে– এখনও, যখন তিনি হেঁটে যান, নীল-সাদা শাড়ি, হাওয়াই চটি, হাতে স্মার্ট ওয়াচ– জনস্রোত এসে তাঁর হাত ছুঁয়ে দেয় ঠিক। আশপাশে দেহরক্ষী, সেসব নিজেই উপেক্ষা করে দীর্ঘ জনমিছিল তিনি ছুঁতে ছুঁতে যাবেন। শুধু যাওয়া-আসা, স্রোতে ভাসা। বালিকাবেলার আনন্দ যেন। কত যেন বয়স তাঁর? ৭১? ধুস! এখন মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন বলে জনমানুষের থেকে দূরত্বে থাকবেন? সেই যুবতীবয়সে যখন থেকে রাজনীতির বিশ্বে এসেছেন, কখনও তো মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখার কথা ভাবেননি তিনি। তাহলে আজ কেন? এই মানুষই তো তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এই অগণন হাতের আঙুল, ভোট দেওয়ার সময় স্মরণ করে ঠিক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আছেন, তাই পশ্চিমবঙ্গ এখনও সাম্প্রদায়িক হয়ে পড়েনি। যে-যার মতো জীবন নিয়ে, নিজের ধর্মাচরণ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক-সেদিক। জীবনের সারকথা তো এই। দিনগুলো যেন রক্তাক্ত না হয়ে পড়ে বাঙালির, বাংলা ভাষা বললে কেউ যেন অপমান না করে, ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে না দেয়। এইটুকুই তো চাওয়া বাঙালির। নিজের মাটির কাছে, নিজের মায়ের ভাষায় যেন থাকা যায়।
বামেদের গদি উপড়ে ফেলে, তিনি কালীঘাটের ছোট্ট ঘর ছেড়ে ঝাঁ-চকচকে ফ্ল্যাটে চলে যাওয়ার কথা ভাবেননি। তাঁর বেড়ে ওঠার লড়াই, তাঁর যন্ত্রণাময় একাকিত্ব যে-দেওয়াল দেখেছিল, পরিচর্যা করেছিল যে-এলাকার হাওয়াবাতাস, তিনি তাকে ছেড়ে যেতে পারেননি। এই না-ছেড়ে যেতে পারাই, তাঁকে আর দশজন রাজনৈতিক নেতার থেকে আলাদা করে রেখেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কতটা বাঙালি? বামেদের গদি উপড়ে ফেলে, তিনি কালীঘাটের ছোট্ট ঘর ছেড়ে ঝাঁ-চকচকে ফ্ল্যাটে চলে যাওয়ার কথা ভাবেননি। তাঁর বেড়ে ওঠার লড়াই, তাঁর যন্ত্রণাময় একাকিত্ব যে-দেওয়াল দেখেছিল, পরিচর্যা করেছিল যে-এলাকার হাওয়াবাতাস, তিনি তাকে ছেড়ে যেতে পারেননি। এই না-ছেড়ে যেতে পারাই, তাঁকে আর দশজন রাজনৈতিক নেতার থেকে আলাদা করে রেখেছে। তিনি আদ্যন্ত সেন্টিমেন্টাল বাঙালিই, সে নিয়ে বোধহয় তাঁরও কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু কেনই বা হবেন না এমন? বাঙালি কি শুধুই বদলে বদলে যাবে? নিজের যা যা ছিল, সবই গোল্লায় পাঠিয়ে ক্রমশ অন্যরকম হয়ে পড়বে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাঙালি হিসেবে সেই বাঙালিদের মধ্যেই পড়েন, যিনি তাঁর শিকড়কে এক্কেবারে বিস্মৃত হতে দেননি। বড়রাস্তার মোড়ে পুলিশি প্রহরা ও ব্যারিকেড ছাড়া তাঁর পাড়াটিও তো বিস্তর বদলে যায়নি। তাঁকে কি তবে ‘উচ্চাশাহীন’ বলব? না, তাঁর উচ্চাশা বাংলা ও বাঙালির প্রতি। প্রতিনিয়তই। আখের গোছাতে তিনি আসেননি।
এই না-বদলে যাওয়া চেহারাটাই আসলে লড়াই করে এই বদলে যাওয়া পৃথিবীতে। যে-বিজেপি, ক্রমে, বদলে ফেলতে চাইছে এই ভারতের বৈচিত্র, রামধনুপ্রায় হৃদয়, খাদ্য-ভাষা-বস্ত্রর বিভিন্নতা– তার প্রত্যুত্তরে নিজস্ব পরিধান, নিজের ভাষা, নিজের খাদ্যে অটুট থাকলেই লড়াই সফল হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই লড়াইয়ের ময়দানে একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে। এই বাংলার নিজস্ব রুচি তাঁর অভিজ্ঞতায় জারিত। নিজের জীবন ও যাপন দিয়ে তিনি দেখিয়ে দিচ্ছেন বারেবারেই, বাঙালি আসলে কীরকমভাবে বাঁচে। কাকে বলা আটপৌরে বাঙালিয়ানা! এই বাঙালিয়ানার জেরেই তিনি বহু মানুষের স্রোতে ভেসে যেতে পারেন শুধু নয়, বহু মানুষের মন চিনতে-বুঝতে পারেন। মানুষের অপমানও চিনতে পারেন, এই শিকড়ের প্রতি টান থেকেই। এসআইআর-এর পদ্ধতির অনৈতিকতার বিরুদ্ধে যেভাবে তিনি লড়েছেন, যেভাবে বিজেপির ‘রোহিঙ্গা’, ‘বাংলাদেশি’ গোছের ভুয়ো তত্ত্বের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন, তাতে স্পষ্ট হয়েছে এ বঙ্গে ঘৃণার রাজনীতিকে তিনি প্রবেশ করতে দেননি।
একজন মুখ্যমন্ত্রী, যিনি পশ্চিমবঙ্গের মতো জনবহুল রাজ্যে নিজের দায়িত্ব সেরে ছবি আঁকছেন, কবিতা লিখছেন, গদ্যপ্রবন্ধ লিখছেন, তিনি বাঙালির ক্রিয়েটিভ অস্তিত্বের একটা একক হয়েই দাঁড়িয়েছেন। যে কোনও বাঙালির সঙ্গে এখানেই মিলেমিশে যেতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সত্তা।
আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্রেফ পথে নামেন না, স্রেফ জনসংযোগ করেন না, স্রেফ কয়েকটা জনউন্নয়নমূলক কাজ করে না, তিনি তা করেন, যা আর পাঁচজন আমবাঙালিও করে বা করার চেষ্টা করে। তা, কৃষ্টির সঙ্গে জুড়ে থাকা। শিল্প-সাহিত্য-গদ্য এই সমস্তর প্রতি তাঁর যে প্যাশন, তাঁর প্রভাব কি রাজনৈতিক লড়াইয়ে নেই? আলবাত আছে! একজন বাঙালির আত্মপরিচয়ের মধ্যেই মিশে আছে শিল্পের এই সমস্ত শাখার প্রতি টান। একজন মুখ্যমন্ত্রী, যিনি পশ্চিমবঙ্গের মতো জনবহুল রাজ্যে নিজের দায়িত্ব সেরে ছবি আঁকছেন, কবিতা লিখছেন, গদ্যপ্রবন্ধ লিখছেন, তিনি বাঙালির ক্রিয়েটিভ অস্তিত্বের একটা একক হয়েই দাঁড়িয়েছেন। যে কোনও বাঙালির সঙ্গে এখানেই মিলেমিশে যেতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সত্তা।
এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গড় ভবানীপুর। বিপরীতে শুভেন্দু অধিকারী। জোর টক্কর? গতবার নন্দীগ্রামের স্মৃতি উসকিয়ে এক সাংবাদিক সায়নী ঘোষকে জিজ্ঞেস করেছেন, ‘এবার কী হবে? মমতা জিতবেন?’ সায়নী বলেছেন, ‘ভবানীপুরে তো লোডশেডিং হবে না।’
সায়নীর চমৎকার প্রত্যুত্তর সরিয়ে আপাতত বলা যাক– বাঙালি সেই স্কিপারকেই চায়, যিনি আদ্যোপান্ত ‘বাঙালি’। স্রেফ বাংলা মাধ্যমে পড়া, বাংলার কথা বলা ‘বাঙালি’ নয়। যে বাঙালির মধ্যে বাংলা ও বাঙালির প্রতি আবশ্যক ও অনাবশ্যক ভালোবাসা রয়ে গিয়েছে। যা অনেকদূর পর্যন্ত যুক্তিযুক্ত, কখনও সখনও যুক্তিহীনও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাঙালির স্মৃতিসত্তায় এমনই এক স্কিপার।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
ধর্ষণ করে নলি কেটে খুন! বিহারে চরম পরিণতি বাংলার মহিলার, আক্রান্ত আরও ১
-
অনলাইনে ঠান্ডা পানীয়ের সঙ্গে আরশোলা! কড়া পদক্ষেপ ‘অগ্নিশর্মা’ শ্বেতা তিওয়ারির
-
হাই কোর্টে ধাক্কা টুলুর! খারিজ রক্ষাকবচের আর্জি, ‘মেঘের আড়ালে সব দেখছেন’, বললেন বিচারপতি
-
তৃণমূল আমলে ঘরছাড়া! গলসির বিজেপি কর্মীর সঙ্গে দেখা করে বিধায়কের দাবি, ভয় আউট, ভরসা ইন
-
২১ আগস্ট বরলক্ষ্মী পুজো, অর্থকষ্ট দূর করতে জানুন ব্রত পালনের সঠিক নিয়ম