রুদ্রনীল ঘোষ (Rudranil Ghosh)। ‘দলে থেকে কাজ করতে পারছিলেন না’-র শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এককালে বাম, তারপর তৃণমূল, বর্তমানে ঠাঁই নিয়েছেন বিজেপিতে। সারাজীবন ধরে বসন্তকাল না-চললে এরকম রংবদল সচরাচর দেখা যায় না। তিনি অবশ্য সমালোচকদের বলতেই পারেন, ‘বুরা না মানো হোলি হ্যায়।’ ব্যাপারটা কতটা হোলি বা দোল কে জানে, কিন্তু হোলিস্টিকভাবে দেখতে গেলে, খটকা লাগে ভারি! বারবার নীতি কিংবা মতের এমন বদল হাওয়ামোরগ ছাড়া আর কোথায়ই বা দেখা যায়? যায় বইকি, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে। ক্ষমতার আমোদগেঁড়েমি পেয়ে বসলে এমনতর রুদ্রলাল, রুদ্রসবুজ, রুদ্রকমলা হওয়া যায়। তবে, অনস্বীকার্য এই যে রুদ্র নীলেই ভালো– তিনি যখন আপাদমস্তক অভিনেতা। তখন বাকি সব ঝেড়ে ফেলে কেবলমাত্র অভিনয় দিয়েই মাত করতে পারেন প্রেক্ষাগৃহ। নিঃসন্দেহেই।
মাত্র মাসকয় আগে অর্নিবাণ ভট্টাচার্যর ‘হুলিগানিজম’-এর অনুষ্ঠানে সনাতন ধর্ম নিয়ে খানিক খোঁটা ছিল, তা দেখে-শুনে তিনি একেবারে রেগে কাঁই! অনির্বাণকে ক্ষমা-টমাও চাইতে বলেন প্রকাশ্য মিডিয়াতে।
তিনি বাংলার সলমান খান। না, গাড়ি চাপা দেননি কাউকে, ‘বিয়িং হিউম্যান’ টি-শার্ট পরে ঘুরে বেড়ান না, সারা শরীরে মাস্লের তাক তৈরি হয়নি, ঐশ্বর্য রাই তাঁর প্রাক্তন প্রেমিকা নন, সে তো তনুশ্রী চক্রবর্তী– কিন্তু খোদ রুদ্রনীল ব্যাচেলার তো বটেই। ঠারেঠোরে এ প্রসঙ্গে বারেবারেই হানা দেয় যে, কবে তিনি বিয়েটা সেরে ফেলছেন! গত বছরের জন্মদিনে সেই দুরাশাতেই রুদ্রনীলকে ফিডিং বোতলে ভরে সুরাপান করানো হয়। একদিকে তিনি শিশু, অন্যদিকে তিনি পঞ্চাশ স্পর্শ করেছিলেন। এহেন দ্বিবিধ, ত্রিবিধ কাণ্ডকারখানা তাঁর জন্মদিনে হবে না তো কারই বা হবে!
রুদ্রনীল কবিতা লেখেন বলে মনে করেন বটে। মনে করেন ছবিও আঁকেন। কেন যে ‘কবিতা’ বলেন সেইসব ছন্দ মেলানো চ্যাং-ব্যাং ছড়াগুলিকে, তিনিই জানেন। এমন অবশ্য রাজনীতির দুয়ারে কম কিছু দেখা যায় না। কিন্তু তিনি তো অসম্ভব ভালো অভিনেতা! বাংলা থিয়েটার করেছেন, অভিনয় করেন, তাঁর কবিতা এমন হতকুচ্ছিত হবেই বা কেন! দীর্ঘদিন বামমনস্ক, তৃণমূলমনস্ক থাকার পরও তিনি পুরনো মূল্যবোধগুলো বাঁশঝাড়ে ফেলে দিয়ে মার্কামারা বিজেপি হয়ে উঠলেন সম্ভবত অভিনেতা বলেই। এখন তাঁকে দেখে কেউ আশাই করতে পারেন না, এককালে তাঁর সেকুলার অতীত ছিল! তাঁর মুখে ‘জয় শ্রীরাম’ তো বটেই, ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দটিও ঢেকুরের মতো বেরিয়ে আসে। এমনকী, এই বাংলায়, সনাতন ধর্মের রক্ষায় তিনি নিবেদিত-প্রাণ– এমনটাও দেখাতে চান। মাত্র মাসকয় আগে অর্নিবাণ ভট্টাচার্যর ‘হুলিগানিজম’-এর অনুষ্ঠানে সনাতন ধর্ম নিয়ে খানিক খোঁটা ছিল, তা দেখে-শুনে তিনি একেবারে রেগে কাঁই! অনির্বাণকে ক্ষমা-টমাও চাইতে বলেন প্রকাশ্য মিডিয়াতে। যাক, এসব তো লেগেই থাকে। বাংলার মানুষও জানতেন– অদূরেই ভোট, এখন একটু ধর্মের ধ্বজা না-তুলে ধরতে পারলে মুশকিল আছে!
বাংলার ভক্তিসাধনা বিজেপির উত্তর ভারতীয় গো-বলয়ের সঙ্গে মেলে না। বাংলার ধর্ম কী, তা আমাদের অতীত দেখিয়ে দিয়েছে। দু-একটা দাঙ্গা-টাঙ্গা হয়েছে বইকি, কিন্তু মূলত বঙ্গের ধর্মীয় ইতিহাস বলে, যুক্তসাধনার কথা। তার কেন্দ্রে গিয়ে রুদ্রনীলরা হানা দিলে মুশকিলেই পড়বেন বারবার।
যদিও সবসময় ধর্মের কলকাঠি নাড়তে পারেননি তিনি। চুঁচুড়ার সিমলেপুল এলাকার এক ঐতিহ্যবাহী শীতলা মন্দিরে বাৎসরিক পুজোর দিনে তিনি হাজির হয়েছিলেন কয়েকজন বিজেপির স্থানীয় নেতা-সহ। পুজো সমাপ্তির পর, কী নিদারুণ চিন্তায় যে ‘জয় শ্রীরাম’ বলে স্লোগান দিতে আরম্ভ করেছিলেন মন্দির চত্বরে, কে জানে! স্থানীয়দের প্রবল আপত্তি ওঠে প্রথমে, অতঃপর ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দেওয়া হয় রুদ্রনীলের উদ্দেশে। একটু রুদ্র আচরণ বটে এটি, কিন্তু বাংলার সেই প্রাচীন প্রবাদ: ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়! স্থানীয় এক মহিলা এসে সাফ জানিয়েছিলেন সেবারে: ‘এখানে মা শীতলা স্লোগান চলবে। জয় শ্রীরামের স্লোগান দেবেন না।’ অতএব, এমন বাঘা স্কিপারেরও মুখ চুন!
রুদ্রনীল আসলে ভুল কিছু করেননি। তিনি আসলে সনাতনী ধর্মের লোক। যেখানে মন্দির সেখানেই ধর্ম— কে না জানে এই সারকথা। কিন্তু যেখানে মন্দির সেখানেই তো ‘জয় শ্রীরাম বা বিজেপি নয়। বাংলার নিজস্ব মন্দির রয়েছে। বাংলার নিজস্ব কৃষ্টি রয়েছে। বাংলার ভক্তিসাধনা বিজেপির উত্তর ভারতীয় গো-বলয়ের সঙ্গে মেলে না। বাংলার ধর্ম কী, তা আমাদের অতীত দেখিয়ে দিয়েছে। দু’-একটা দাঙ্গা-টাঙ্গা হয়েছে বইকি, কিন্তু মূলত বঙ্গের ধর্মীয় ইতিহাস বলে যুক্তসাধনার কথা। তার কেন্দ্রে গিয়ে রুদ্রনীলরা হানা দিলে মুশকিলেই পড়বেন বারবার।
হার-জিত পরের কথা, বাংলা সিনেমায় বড়পর্দায় তাঁর মতো অভিনেতা স্রেফ রাজনীতির কারণে হারিয়ে গেলে, বাংলা সিনেমার ক্ষতি– এটা বোধহয় ঘোর শত্রুও স্বীকার করবেন।
এবারে বিজেপির প্রার্থী হয়ে রুদ্রনীল দাঁড়াচ্ছেন হাওড়া, শিবপুর থেকে। শিবপুরের সংস্কৃতি ও কৃষ্টি এখন সনাতন ধর্মের পক্ষে, নাকি হিন্দু-মুসলমান যুক্তসাধনার পক্ষে– দেখা যাক। হার-জিত পরের কথা, বাংলা সিনেমায় বড়পর্দায় তাঁর মতো অভিনেতা স্রেফ রাজনীতির কারণে হারিয়ে গেলে, বাংলা সিনেমার ক্ষতি– এটা বোধহয় ঘোর শত্রুও স্বীকার করবেন।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
বিশ্বজয়ের ৩ মাসের মধ্যে অধিনায়কত্ব যাচ্ছে সূর্যকুমারের, নেতৃত্বের দৌড়ে আপাতত ৩
-
দিল্লির পর বিহার, বিধ্বংসী আগুন হাসপাতালে, ঝলসে মৃত অন্তত ৪
-
কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা প্রত্যাহার হুমায়ুনের, অধীর, নওশাদের উদাহরণ তুলে আদালতে যাচ্ছেন এজেইউপি নেতা
-
সাতসকালে শওকত মোল্লার বাড়িতে এনআইএ হানা, তল্লাশির আগেই ‘পলাতক’ তৃণমূল নেতা
-
৪ জুন ২০২৬: মীন রাশির আজকের দিন
নিবেদিত


