অভিমানী, ঠোঁটকাটা, ঠাট্টাপ্রিয়। কু-কথায় পঞ্চমুখ। বঙ্গ-বিজেপির ‘ভাইরাল’ ঘোষ। তাঁর আত্মবিশ্বাসে একফোঁটা জল নেই। যেমন আদতে, গরুর দুধে নেই একফোঁটা সোনা। গতবারের নির্বাচন হোক বা এবার– ভোট (West Bengal Assembly Election) ঘোষণার পর থেকেই তাঁর মতো ‘মুখে মারিতং জগৎ’ আর কে আছে! কে সি নাগের স্টাইলে বললে, গোটা বিজেপির বাংলার ঘাঁটি গাড়ার যে-বিশ্বাস, তার যোগফলকে ১০০ দিয়ে গুণ করলে দিলীপ ঘোষের (Dilip Ghosh) আত্মবিশ্বাসের ৪৮ তলা হাইরাইজ দেখা যায়। আত্মবিশ্বাস বেজায় দরকারি, কিন্তু কতটা আত্মবিশ্বাসী হতে নেই, তা দিলীপ ঘোষের কাছে বরাবর শিখে নেওয়া উচিত। ‘কল্পনা’ এমন এক বাংলা শব্দ যা দিলীপ ঘোষের কাছে এসে ‘কষ্টকল্পনা’য় পরিণত হয়। যদিও ভোটের বাজারে এরকম কষ্টকল্পনাপ্রবণ রাজনৈতিক নেতা না-থাকলে, বিরোধী শিবির কি ছেঁড়া কাঁথায় স্রেফ ঘুমবে? লাখ টাকার স্বপ্নও তো দেখতে হবে!
তৃণমূলের প্রতি তাঁর বিদ্বেষ, নীতিগত বিরোধ থাকতেই পারে– কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, এহেন ভাষা-বিপর্যয় দেখা যাবে। হয়তো দিলীপ ঘোষ, বা দিলীপ ঘোষেরা বিশ্বাস করেন– এটিই একমাত্র পথ। মফস্সলের পুরনো সেই অমোঘ বক্রোক্তি: ‘হাত থাকতে মুখে কেন’– এই-ই হয়তো তাঁদের বঙ্গবিজয়ের একমাত্র পথ। এমনকী, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ করা উচিত, প্রেস মিটে বলেছিলেন তিনি!
দিলীপ ঘোষ সাতসকালে জগিং করেন। স্বাস্থ্যচর্চায় মন দিয়েছেন অনেক দিনই। কারণ কখন যে তিনি দলের লোক, আর কখন যে দলের পাত্তা পাবেন না– চ্যাটজিপিটি-ও জানে না। ফলে ‘জগিং’ ব্যাপারটা ধারাবাহিক রেখেছেন। কিন্তু আমজনতার স্বাস্থ্যের ব্যাপারে, সে যত সিরিয়াস কেসই হোক না কেন, তিনি মোটে আমল দেন না। ২০২০ সালের আশপাশে কৃষ্ণনগরের রাস্তায় ১০০ জনের এক ‘বিরাট’ জনসভা হচ্ছে বলে, অ্যাম্বুলেন্স দেখেও তিনি পথ ছাড়তে অনুরোধ করেননি অনুগামীদের। ফলে, লোকে বাঁচুক-মরুক, বিজেপির জনসভায় বহু কষ্টে ১০০ লোক জোগাড় করা গিয়েছে, তা যেন নড়চড় না-হয়। এহেন জনক্ষুধার্থ মানুষ সদ্য প্রধানমন্ত্রীর বিগ্রেড পালার পর মাইক-ক্যামেরার সামনেই বলে উঠেছেন: ‘ক্যালাব’। স্পষ্ট করেই একথা বলেছেন তৃণমূল কর্মীদের উদ্দেশ করে। এবং ধুয়োও দিয়েছেন– আমজনতা শুরু করুন, আমরা সামনে আছি। নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসবে, প্রচার থেকে শুরু করে ভোটের দিনগুলোয় পশ্চিমবঙ্গে যদি রক্ত ঝরে, হিংসা-খুনোখুনির পরিবেশ তৈরি হয়, তার নেপথ্যে এই উসকানির কোনও ভূমিকা নেই? তৃণমূলের প্রতি তাঁর বিদ্বেষ, নীতিগত বিরোধ থাকতেই পারে– কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, এহেন ভাষা-বিপর্যয় দেখা যাবে। হয়তো দিলীপ ঘোষ, বা দিলীপ ঘোষেরা বিশ্বাস করেন– এটিই একমাত্র পথ। মফস্সলের পুরনো সেই অমোঘ বক্রোক্তি: ‘হাত থাকতে মুখে কেন’– এই-ই হয়তো তাঁদের বঙ্গবিজয়ের একমাত্র পথ। এমনকী, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ করা উচিত, প্রেস মিটে বলেছিলেন তিনি! কারণ যাদবপুর নাকি ‘অ্যান্টি-ন্যাশনালিস্ট’দের ঘাঁটি!
হয়তো দিলীপ ঘোষ, বা দিলীপ ঘোষেরা বিশ্বাস করেন– এটিই একমাত্র পথ। মফস্সলের পুরনো সেই অমোঘ বক্রোক্তি: ‘হাত থাকতে মুখে কেন’– এই-ই হয়তো তাঁদের বঙ্গবিজয়ের একমাত্র পথ।
যদিও বিজেপির (BJP) কাছে এ অতি-স্বাভাবিক ব্যাপার। কয়েক বছর আগে দিল্লির অর্থ-প্রতিমন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর প্রকাশ্য জনসভায় স্লোগান দিয়েছিলেন: ‘দেশ কি গদ্দারো কো, গোলি মারো সালো কো’। বাংলায় দিলীপ ঘোষও বললেন, ‘ঠুকব’! সেই যে জীবননান্দ বলেছিলেন, ‘এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা সত্য; তবু শেষ সত্য নয়।’ শেষ সত্যের প্রতি কে-ই বা ছুটছে। সেই সুচেতনা দিলীপ ঘোষদের (Dilip Ghosh) কে-ই বা হোম ডেলিভারি করে পাঠাবে! রাস্তায় এই প্রাক্-নির্বাচন পর্বে বিজেপির বহু পোস্টার পড়েছে বটে। সেখানে একথাও লেখা যে, বাংলায় বিজেপি সরকার এলে নারীরা সুরক্ষিত থাকবে। কিন্তু উলটে সেখানে প্রশ্ন করার কোনও উপায় নেই যে, দিলীপ ঘোষ থাকার পরও? কেন?
কয়েক বছর আগে দিল্লির অর্থ-প্রতিমন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর প্রকাশ্য জনসভায় স্লোগান দিয়েছিলেন: ‘দেশ কি গদ্দারো কো, গোলি মারো সালো কো’। বাংলায় দিলীপ ঘোষও বললেন, ‘ঠুকব’!
২০২০ সালের আরেকটি ঘটনার উল্লেখ করি। ‘সিএএ’ নিয়ে তখন হাওয়া সরগরম। খাস কলকাতার পাটুলিতে বিজেপির সিএএ অভিনন্দন যাত্রার প্রতিবাদে একটি মেয়ে, একলাই প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তরুণীর ওপর বিজেপি সমর্থকরা চড়াও হয়েছিলেন তো বটেই, পোস্টারও ছিঁড়ে দিয়েছিলেন। অথচ এ দেশে ‘গণতন্ত্র’ এখনও রয়েছে বলেই জানা যায়। দিলীপ ঘোষ এরপর সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছিলেন, ‘তাঁর হাত থেকে শুধু প্ল্যাকার্ড কেড়ে নিয়েই যে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এটাই চোদ্দো পুরুষের ভাগ্য। চোদ্দো পুরুষের ভাগ্য যে আমাদের লোকরা তাঁকে অন্য কিছু করেনি। এঁরা আমাদের কর্মীদের মাঝে আসে কেন? খবর করার জন্য নাকি শহিদ করার জন্য? শহরে সার্কাস দেখানোর অনেক জায়গা আছে। অনেক হয়েছে, আর সহ্য করা যায় না।’ হে পাঠক, ‘অন্য কিছু করেনি’ বলতে কী বলতে চেয়েছিলেন দিলীপ ঘোষ? নারীর মর্যাদা এহেন মহা-পুরুষদের হাতে সুরক্ষিত থাকবে?
দিলীপ ঘোষ এরপর সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছিলেন, ‘তাঁর হাত থেকে শুধু প্ল্যাকার্ড কেড়ে নিয়েই যে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এটাই চোদ্দো পুরুষের ভাগ্য। চোদ্দো পুরুষের ভাগ্য যে আমাদের লোকরা তাঁকে অন্য কিছু করেনি। এঁরা আমাদের কর্মীদের মাঝে আসে কেন? খবর করার জন্য নাকি শহিদ করার জন্য? শহরে সার্কাস দেখানোর অনেক জায়গা আছে। অনেক হয়েছে, আর সহ্য করা যায় না।
খাদ্যরুচি নিয়েও দিলীপ ঘোষ অবশ্য খড়্গহস্ত! কেন আমমানুষে গরু খাবে– এ নিয়ে তার বেজায় আপত্তি! জানিয়েছিলেন, ‘যারা গরু খায় তারা কুকুরের মাংসও খাক। যে কোনও খাবার খেয়েই তারা সুস্থ থাকবে। খেলে বাড়িতে খাক, রাস্তায় কেন?’ এটা সত্যিই দুঃখজনক যে, আমাদের দেশে রাস্তায় অনেকেই খান। বাইরের স্ট্রিটফুড থেকে খোলা রাস্তায় যাঁরা বসবাস করেন, তাঁরাও বাধ্য হন রাস্তাতেই খেতে। রাস্তায় খাওয়া অনুচিত দুটো কারণে। এক, ‘হাইজিন’ নামক শব্দটা ইদানিং কানে এত গেড়ে বসেছে, ‘স্বাস্থ্যই সম্পদ’ গোছের ধারণা একেবারে কর্ণকুহরে ঘা মেরেছে। আর দ্বিতীয়টি, অবশ্যই এদেশে অনেকেই খেতে পান না, যাঁরা রাস্তাতেই থাকেন। তাঁদের খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে গেলে রাস্তায় খাওয়া নিয়ে কোনও মিশমিশে আপত্তি থাকতে পারে না। কিন্তু এসবের জন্য না, রাস্তায় গরু খেলে দিলীপ ঘোষের ‘ভাবাবেগ’ নামক বস্তুটিতে ব্যথানিরোধক স্প্রে করতে হয়। কারণ তিনি গরুকে মা ভাবেন। বিদেশি গরুকে ‘আন্টি’। বুক ফুলিয়ে জানিয়েছিলেন গরুর প্রস্রাব খান। জানিয়েছিলেন গরুর দুধে সোনা পর্যন্ত আছে। সূর্যালোক থেকে কীসব কাণ্ড করে খোদ গোমাতাই সোনা তৈরি করেন। কত ক্যারাট তিনি জানাননি। কেনই-বা গরুর দুধের সোনা থেকে বাপি লাহিড়ীর মতো অন্তত কয়েকখানা সোনার চেন তৈরি করে নিলেন না! তাঁর দল বঙ্গে ফেল করার পর অন্তত দ্বিতীয় পেশা হিসেবে ‘ঘোষ জুয়েলার্স’ গড়তে পারতেন! দুচ্ছাই। এমন সোনার কেরিয়ার ছেড়ে তিনি নিতান্তই ‘ঠুকব’ আর ‘ক্যালাব’তে মেতে রইলেন!
দীর্ঘকাল ব্রহ্মচারী থাকার পর, অবশেষে সংসার পেতেছেন– এ খবরে দিলীপ ঘোষের ঘোর শত্রুও বোধহয় খুশিই হয়েছিলেন। এমনকী, সদ্য ফুরনো ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রী তাঁর কাছে সদ্যবিবাহের দরুন মিষ্টির বায়না করেছেন।
বলা চলে, দিলীপ ঘোষ মনে করেন সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে… না, আঙুল বেঁকানোয় তিনি বিশ্বাসী না, ঘিয়ের শিশিই আছড়ে ভেঙে ফেলবেন। এহেন মাস্তানি তাঁর আছে বটে, কিন্তু তাতে ঘি-র ব্যবহার হয় না। কুকথায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠে তিনি বারবার মিডিয়ায় ভেসে উঠবেন বটে, উদাহরণ অজস্র, কিন্তু আসল কাজ কী হবে? তিনি এমন স্কিপার, যিনি পার পেতে চান কথার দোদোমায়! তবে তীর নিজের গায়ে লাগলে, তিনিও শালীনতার পক্ষে ভোট দেন। অনির্বাণ ভট্টাচার্যর হুলিগানিজমের গানে ‘রেগে যাবে দিলীপ ঘোষ’ শুনে, তিনি খানিক চটেইছিলেন! দীর্ঘকাল ব্রহ্মচারী থাকার পর, অবশেষে সংসার পেতেছেন– এ খবরে দিলীপ ঘোষের ঘোর শত্রুও বোধহয় খুশিই হয়েছিলেন। এমনকী, সদ্য ফুরনো ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রী তাঁর কাছে সদ্যবিবাহের দরুন মিষ্টির বায়না করেছেন।
তিনি এমন স্কিপার, যিনি পার পেতে চান কথার দোদোমায়! তবে তীর নিজের গায়ে লাগলে, তিনিও শালীনতার পক্ষে ভোট দেন। অনির্বাণ ভট্টাচার্যর হুলিগানিজমের গানে ‘রেগে যাবে দিলীপ ঘোষ’ শুনে, তিনি খানিক চটেইছিলেন!
ঘোষবাবু জানিয়েছেন, কলকাতার রসগোল্লা-সহ তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সস্ত্রীক দেখা করে আসবেন। তাঁর সংসার জীবনের সাফল্য কামনা করি। সাতসকালে জগিং এবং স্বেচ্ছায় যদি গোমূত্র পান করে সুস্থ থাকেন, থাকুন। দীর্ঘজীবী হোন। গরুর দুধের সোনা দিয়ে ‘ঘোষ জুয়েলার্স’ পত্তন করে, বেজায় নাম করুন। কিন্তু কু-কথার কপিরাইট নেওয়া এহেন ঘোষবাবুর ভোটের ভবিষ্যৎ কী? দেশি-মা কিংবা বিদেশি-আন্টির আশীর্বাদে দেখাই যাক না। দেড়মাস পর রেজাল্ট হাতেনাতে!
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
বিশ্বজয়ের ৩ মাসের মধ্যে অধিনায়কত্ব যাচ্ছে সূর্যকুমারের, নেতৃত্বের দৌড়ে আপাতত ৩
-
দিল্লির পর বিহার, বিধ্বংসী আগুন হাসপাতালে, ঝলসে মৃত অন্তত ৪
-
কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা প্রত্যাহার হুমায়ুনের, অধীর, নওশাদের উদাহরণ তুলে আদালতে যাচ্ছেন এজেইউপি নেতা
-
সাতসকালে শওকত মোল্লার বাড়িতে এনআইএ হানা, তল্লাশির আগেই ‘পলাতক’ তৃণমূল নেতা
-
৪ জুন ২০২৬: মীন রাশির আজকের দিন
নিবেদিত


