Advertisement
Advertisement
FIFA World Cup 2026

রাতজাগায় ইতি, বিশ্বকাপ শেষে উমার অপেক্ষায় বাঙালি

মেসি-রোনাল্ডো-নেইমার শত্রুতা মুছে আবার চেনা ছন্দের জীবনে, নতুন করে প্রহর গোনা শুরু।

অরিঞ্জয় বোস
অরিঞ্জয় বোস

শেষ আপডেট: জুলাই ২০, ২০২৬, ১৫:০২

link
অরিঞ্জয় বোস
অরিঞ্জয় বোস

শেষ আপডেট: জুলাই ২০, ২০২৬, ১৫:০২

options
link
রাতজাগায় ইতি, বিশ্বকাপ শেষে উমার অপেক্ষায় বাঙালি zoom
ছবি কৌশিক দত্ত।
Advertisement

বাঙালি চিরকালই রাত জাগতে ভালোবাসে। জাতি আত্মবিস্মৃতি নিয়ে বাঁচালেও, সে রাতে তারা দেখতে ভালোবাসে। সে লেখে। সে ভাবে। সে আন্দোলন করে। প্রতিবাদ করে। ঠাকুর দেখে। অ্যালার্ম ছাড়া ভোরে উঠে ফুটবল উপাসনাও করে। এ জাতি সমর্থক নয়। ফ্যান নয়। বাঙালিরা আসলে ফুটবল পূজারি।

ভারত বিশ্বমঞ্চে ফুটবল খেলে না। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে তার স্থান প্রায় তলানিতে। নামতে নামতে ১৩৮-এ এসে ঠেকেছে। তবুও আমরা বিশ্বাস করি, একদিন তো দেখব, একদিন তো গাইব জনগণমন। এই বিশ্বাস নিয়েই তো এতবছর ধরে বাঙালি বেঁচেছে।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

আমরা ভারতীয়। কেউ মেদিনীপুরের। কেউ বাঁকুড়ার। কেউ থাকি কলকাতায়। কেউ ফরাক্কায়। কিন্তু চারবছর অন্তর আমরা কেউ ব্রাজিল। কেউ পর্তুগাল। উপাসনা করি মেসির।  পুজো করি রোনাল্ডোর। শিক্ষা নিই জীবনের। জীবনবোধের পাঠশালাই বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026)। হারতে শেখায়, জিততে শেখায়। অন্যের জয়ে নিজের আনন্দ খুঁজতে শেখায়। অন্যের পরাজয় আমাদেরও চোখে জল আসে। বাগানের সব ফুল উজাড় করে শত কোটি বাঙালি রাত জাগে। তাদের ‘ঈশ্বর’-এর পায়ে বাগানের সব ফুল উজাড় করে তুলে আনে, খালি একটু প্রসাদী ফুলের আশায়।

Spain football team won the FIFA World Cup 2026

বাঙালির বিশ্ব ফুটবলে মূলত দু’টি ভাগ। একপক্ষ ব্রাজিল, অপরপক্ষ আর্জেন্টিনা। আড়াআড়ি এই বিভাজন আটের দশক থেকেই। মানে পেলেকে ছাপিয়ে মারাদোনার আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে। পেলে যদি ফুটবল সম্রাট হন, তাহলে বদরাগী, বদমেজাজি অথচ বাঁ পায়ে জাদু দেখানো ফুটবলের অধিকারী দিয়েগো মারাদোনা ‘ঈশ্বর’-এর বরপুত্র।

১৯৮৬ সাল থেকে যে বিভাজনের শুরু। তা আরও শত্রুতার রূপ নিল রোমারিও, রোনাল্ডো, রোনাল্ডিনহোদের পরই লিওনেল মেসির ফুটবল-জাদুতে। আর সেই যুদ্ধের আবহের মধ্যেই যখন ব্রাজিল হেরে যায় বা আর্জেন্টিনা পিছিয়ে পড়ে তখন বাঙালি কখনও ফ্রান্স, কখনও স্পেন, কখনও ইংল্যান্ডের সমর্থক। এমনকী এই বিশ্বকাপে দেখা গেল ব্রাজিল হেরে যাওয়ার পর সমর্থকরা আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে কেপ ভার্দে, মিশর, সুইজারল্যান্ডকেও সমর্থন করছেন। ফুটবলের প্রতি বাঙালির কতটা অনুরাগ, কতটা ইনভলভমেন্ট শুধু এই আবেগ থেকেই বোঝা যায়। আর সেই কারণেই ময়দান মার্কেটে হলুদ-সবুজ, অথবা আকাশি-সাদা জার্সির পাশেই জায়গা করে নেয় ইংল্যান্ডের সাদা, ফ্রান্সের নীল অথবা পর্তুগালের মেরুন জার্সি। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার তারকাদের এই ‘মনোপলি’ ভেঙেছে অনেকেরই হাতে। ফ্রান্সের জিদান থেকে পর্তুগালের রোনাল্ডো। কত নাম বলব। এবার তো সেই মহাতারকার মিছিলে ঢুকে পড়েছে দুই বিস্ময় তরুণ। এক, দৈত্যকায় হালান্ড। দুই, কবিতার ছন্দের মতো বাঁ পায়ের ফুটবলের মালিক রোগা-পাতলা চেহারার ইয়ামাল। বাঙালি তাদের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছে তার ফুটবল সত্তাকে। এই কপি যখন লিখছি, তখন গোটা বিশ্বের মতো কলকাতা থেকে মফঃস্বল গ্রামবাংলা মেসি-ইয়ামালে দু’ভাগ।

Lionel Messi's Argentina lost to Spain in FIFA World Cup 2026 Final

রাতজাগা অবশ্য বাঙালির স্বভাব। আর সেটা যদি হয় খেলার জন্য তাহলে তো কথাই নেই। ১৯৮৩ ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়ের রাত থেকেই কি বাঙালির প্রথম রাতজাগা? হতে পারে। কিন্তু ফুটবল হোক বা ক্রিকেট দেখা রাতেই বেশি মোহময়। পরের দিন অফিস আছে। ঢুলতে ঢুলতে মেট্রো ধরা। ছাত্রদের স্কুল-কলেজে যাওয়া আছে– তবুও অস্থির মন নিয়ে জেগে থাকা। তেমনই পরিবেশ তৈরি হয়েছিল গত দেড়মাস ধরে। আমেরিকায় বিশ্বকাপ। সোজা হিসাবে ১২ ঘণ্টা সময়ের এদিক-ওদিক। স্বাভাবিকভাবই ওদের যখন দিন, আমাদের তখন মাঝরাত। ওদের যখন বিকেল, তখন আমাদের ভোর। খেলা দেখতে গেলে ঘুমের সিস্টেমটাই বদলে ফেলতে ফেলতে হবে। তাতে অবশ্য কিছু যায় আসেনি। বাঙালির রুটিন ছিল যতক্ষণ ফুটবল, ততক্ষণ দু’চোখ এক নয়। অবশেষে সেই সময়ের ইতি আজ রাত থেকেই।

সোমবার থেকে বাঙালির আবার মেসি-ইয়ামালময় জীবন সেই গতে বাঁধা ছন্দে। দশটা-পাঁচটার অফিস। বসের হুঙ্কার। রাজনৈতিক গালগপ্পো, নেতা-মন্ত্রীদের ভাষণ, সংসারের ঝামেলা। রোনাল্ডো-এমবাপেকে নিয়ে মগ্ন বাঙালি আবার আলু-পটলের বাজারদর নিয়ে আলোচনা করবে। কিন্তু শুধু আমরা সবাই আবার দেখিয়ে দিলাম বাঙালির রক্তে, হৃদয়ে, মননে, চেতনায় ফুটবল। সব খেলার সেরা। তবু কিছু তো আক্ষেপ রয়ে যায়। দেড় লক্ষ বাসিন্দার কুরাসাও অথবা সাড়ে পাঁচ লক্ষের লোকের দেশ কেপ ভার্দেও বিশ্বফুটবল খেলে, আর দেড়শো কোটির দেশ রাতের পর রাত জেগে তাদের সমর্থন জোগায় নিজের দেশের পতাকাটা খুঁজে না পেয়েও।

এবার রাতজাগা শেষে নতুন রাতজাগার অপেক্ষা। আশ্বিনের শারদপ্রাতে কখন উমা ফিরবেন তাঁর বাপের বাড়ি। আবার সেজে উঠবে আমাদের পাড়া, গ্রাম, শহর। ব‌্যস্ত জীবনে আবার বহিবে আনন্দধারা। সপরিবারে দুর্গার আগমনে বাঙালি আবার পার্বণে মেতে উঠবে। আবার দৈনিক কচকচানি ছেড়ে বাঙালি বলবে, ‘উৎসবে ফিরুন’।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.