Raj Chakraborty

ভোটের স্কিপার: বারাকপুর ও রাজ চক্রবর্তী, প্রায় রাজযোটক?

রাজনৈতিক বৃত্তে এসে রাজ চক্রবর্তী পরিচালকের সিনে-মনটাকেই আরেকবার ছড়িয়ে দিতে চান আমজনতার মধ্যে। সাধারণের যে দুঃখ, যে দৈনন্দিন ক্ষোভ ও সমান্তরালে স্বপ্ন, তাঁর ছবির কথা। তিনি কতটা বোঝেন, তাঁর এলাকার সমস্যা?

Advertisement
নিরাপদ কর
নিরাপদ কর

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১৭, ২০২৬, ১৮:৫৮

options
link
ভোটের স্কিপার: বারাকপুর ও রাজ চক্রবর্তী, প্রায় রাজযোটক?
ক্যারিকেচার: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

‘বো ব্যারাকস ফরএভার’ সিনেমাখানা দেখে কেউ যদি মুগ্ধ হয়ে ‘বো বারাকপুর ফরএভার’ নামের একটি ছবি বানিয়ে ফেলেন, জানবেন তিনি রাজ চক্রবর্তী (Raj Chakraborty)। তিনি সিনেমার পরিচালক– এই রাজনীতির তালেগোলেই তাঁকে ‘টিকিট’ জোগাড় করতে হয়েছে। নয়তো তিনি পরিচালক, তাঁকে টিকিট দেবে কার সাধ্যি! ২০২১ সালে বারাকপুর থেকে তিনি সুপারহিট– জয়ী প্রার্থী। বয়স ৫১, তৃণমূলের একান্নবর্তী পরিবারেও দুরন্ত ফিট করে গিয়েছেন। সিনেমা তো বটেই, ওয়েব সিরিজও তিনি বানিয়ে চলেছেন রাজনৈতিক কেরিয়ারের পাশাপাশি। এমনকী, সিনেমার নাম রেখেছিলেন ‘হোক কলরব’।

Advertisement

সকলেরই মনে পড়ার কথা, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনভিপ্রেত ঘটনাকে কেন্দ্র করে শহরের জেগে ওঠা। পথে নামা। কিন্তু সে জায়গা থেকে তিনি ছবি করেননি। ‘হোক কলরব’ শব্দবন্ধকে স্রেফ ব্যবহার করেছেন বলে জানিয়েছেন। আদ্যন্ত রাজনৈতিক, পশ্চিমবঙ্গের ছাত্র-আন্দোলনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে থাকা একটা শব্দ। কিন্তু যে ছবি তিনি তৈরি করেছেন, বললেন তা ‘রাজনৈতিক’ নয়। কেন, কী কারণে অ-রাজনৈতিক? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘রাজনৈতিক ছবি করলে আমি আমার দলের প্রতিই বায়াসড হব। তখন জাস্টিফাই করতে পারব না, কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল। আমি সিনেমা বানানোর জন্য এত পরিশ্রম করেছি। সে ক্ষেত্রে যদি কোনওদিন পলিটিক‌্যাল ছবি করতে চাই, রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে করব।’

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

একজন পরিচালক কি একেবারে রাজনীতিহীন শুষ্ক ছবি তৈরি করতে পারেন? সদ্যপ্রয়াত রাহুলকে নিয়ে তিনি যে ছবি করেছিলেন, ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’– সে ছবি কি একবারে রাজনীতিহীন ছিল? কোনও ইঙ্গিত ছিল না তাতে? রিজওয়ানুরের ঘটনা কি সেই সময়ের আশপাশেই ঘটেনি?

কিন্তু একজন পরিচালক কি একেবারে রাজনীতিহীন শুষ্ক ছবি তৈরি করতে পারেন? হতে পারে, তা দলীয় রাজনীতি কেস না, কিন্তু তাই বলে একেবারে ‘রাজনীতিহীন’ ছবি? তা কি সম্ভব? সদ্যপ্রয়াত রাহুলকে নিয়ে তিনি যে ছবি করেছিলেন, ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’– সে ছবি কি একবারে রাজনীতিহীন ছিল? কোনও ইঙ্গিত ছিল না তাতে? রিজওয়ানুরের ঘটনা কি সেই সময়ের আশপাশেই ঘটেনি? বরং, একজন সৎ পরিচালক হিসেবে, এই ‘বায়াসনেস’ থেকে বেরিয়েই তো পরিচালক রাজ চক্রবর্তীর দেখা পাওয়া উচিত ছিল। যে-রাজ চক্রবর্তী ক্রমাগত আত্মসমালোচনার মধ্যে দিয়েই যাবেন। তা না হয়ে ‘আমি রাজনৈতিক ছবি করি না’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার মতো সহজ কাজ কেন বেছে নিলেন তিনি!

Advertisement

এই প্রচারের আবহকে তিনি মনে করেন টি-টোয়েন্টি ম্যাচের মতো। ক্রমাগত স্লেজিং চলে। এ-পক্ষ ও-পক্ষকে বাকবিতণ্ডায় ধুয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। সাক্ষী মিডিয়া। তবে অনেক ক্ষেত্রে ভাষার যে ব্যবহার, তা সম্ভবত কুকথার সমান্তরালে চলে আসে। অপশব্দ ঢুকে পড়ে। রাজ বলেছেন, তিনি মার্জিত। বোঝাই যায়, তিনি ‘প্রলয়’ সিরিজের ডাকাবুকো শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের মতো কোনওমতেই নন। তবু, কখনওসখনও মনে হয় রিল-রিয়েলের এই ফারাক যদি আইনি পথে চুকেবুকে যায়, তাহলে মন্দ হয় না। যত জাঁদরেল অপরাধীই থাকুক না কেন, রাজ-ম্যাজিকে ধরাশায়ী হত!

এই টুকরো-টাকরা কাণ্ড থেকে সরে রাজ চক্রবর্তী শিল্প-সাহিত্যের পাশেই রয়েছেন। সংরক্ষণের ব্যাপারে বাঙালি যে ঘোরতর ভুলোমনা, তিনি জানেন নির্ঘাত। বিভূতিভূষণের যে বাড়িটি ছিল বারাকপুরে, বিভূতিভূষণের মৃত্যুর পর তৈরি করেছিলেন তাঁর স্ত্রী রমা বন্দ্যোপাধ্যায়– সে-বাড়ির পাশেই উঠেছিল শপিং মল। এবং সেই কারণে পুরনো জরাজীর্ণ সাহিত্যিকের বাড়িতে ধরেছিল ফাটল। সেসময় সাহিত্যিকের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বারাকপুরের বিধায়ক। এ ঘটনা নিশ্চয়ই বারাকপুরবাসীরা মনে রেখে দেবেন।

যে-পরিসর থেকে উঠে এসেছেন রাজ, তা একেবারেই মধ্যবিত্তের দালান। পরিচালনা করলেন একের পর এক ছবি। যে-ছবি জনসাধারণের, যে-ছবি জনপ্রিয়তার মুখ দেখল। ছবির চরিত্ররাও, আশি-নব্বইয়ের বাংলা-হিন্দি সিনেমার মতো বিত্তশালী বনাম গরিব মানুষের দ্বন্দ্বমুখরতার নয়। তাঁর ছবির চরিত্র, তুলনায় ক্যাবলা, মধ্যবিত্ত– কিন্তু স্বপ্নে বিভোর। টুকরো স্মৃতির কাজল সেই সমস্ত ছবির চোখে।

মনে থাকবে, রাজ চক্রবর্তীর সহৃদয়তার কথাও। টুইটারে এক মহিলা তাঁর কাছে আরজি জানিয়েছিলেন, ‘একটা কাজ দেবেন?’ সাধারণত, সেলেব্রিটিরা বেশিরভাগই আমজনতার মন্তব্যে বিশেষ রা কাড়েন না। কিন্তু রাজ চক্রবর্তী ব্যতিক্রম। তিনি প্রত্যুত্তরে দিয়ে সমাধানের ব্যবস্থা করেছিলেন তখন।

যে-পরিসর থেকে উঠে এসেছেন রাজ, তা একেবারেই মধ্যবিত্তের দালান। সেই টুকরো ভূমিতেই তাঁর স্বপ্ন দেখা। কলকাতায় কাজ করতে আসা। বন্ধুদের সঙ্গে একজোট হয়ে থাকা। তারপর কলকাতাই তাঁর স্বপ্নকে বহন করল। বহন করে নিয়ে গেল বাংলাভাষা। মেগা-টেগা সরিয়ে তিনি পরিচালনা করলেন একের পর এক ছবি। যে-ছবি জনসাধারণের, যে-ছবি জনপ্রিয়তার মুখ দেখল। ছবির চরিত্ররাও, আশি-নব্বইয়ের বাংলা-হিন্দি সিনেমার মতো বিত্তশালী বনাম গরিব মানুষের দ্বন্দ্বমুখরতার নয়। তাঁর ছবির চরিত্র, তুলনায় ক্যাবলা, মধ্যবিত্ত– কিন্তু স্বপ্নে বিভোর। টুকরো স্মৃতির কাজল সেই সমস্ত ছবির চোখে।

রাজনৈতিক বৃত্তে এসে রাজ চক্রবর্তী হয়তো সেই মনটাকেই আরেকবার ছড়িয়ে দিতে চান আমজনতার মধ্যে। সাধারণের যে দুঃখ, যে দৈনন্দিন ক্ষোভ, তাঁর বোঝা উচিত। যে-রাজ চক্রবর্তী এখন যথেষ্টই বিত্তশালী, তিনি কিন্তু প্রথমবার পরিচালনার টাকায় কেনা বাইক এখনও বাতিল-জঞ্জালের খাতায় ফেলে দেননি। শিকড় এখনও শক্ত রয়েছে। স্কিপার– যিনি আমআদমির ঘাম-রক্ত বুঝে নিতে চাইবেন, তাঁর এই রকম হুবহু শিকড়েরই তো দরকার।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.