নিশীথ প্রামাণিক (Nisith Pramanik)। আসন্ন নির্বাচনে তিনি কোচবিহারের মাথাভাঙায় দাঁড়িয়েছেন প্রার্থী হিসেবে। কে না জানে, এই নির্বাচনে বিজেপির অন্যতম অস্ত্র নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল। তাতে কী ঘটল? ৯১ লক্ষ মানুষ বাদ পড়লেন। হ্যাঁ, কিছু মানুষ অবশ্যই প্রয়াত, সে কারণেই এই বাদ পড়া। কিন্তু ৯১ লক্ষ! বাদ পড়ার ৩৪.২ শতাংশই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। এই ভোটে আরও বেশি করে বিজেপি উঁচিয়ে রয়েছে ধর্মীয় ভেদাভেদের ধারালো ছুরিটিকে। এবং ক্রমাগত এমনই প্রচার চলেছে যে, পাড়ায় পাড়ায় রোহিঙ্গা, পাড়ায় পাড়ায় অনুপ্রবেশকারী, অধিকাংশই বাংলাদেশি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তৈরি করে তোলা হয়েছিল এই ক্ষোভ যে, তিনি বাংলাদেশিদের এই বঙ্গে জায়গা দিয়ে চলেছেন। আরও স্পষ্ট করে বললে, মুসলমান বাংলাদেশিদের। বিজেপির পক্ষে দুঃখের খবর এই যে, এসআইআর-এর ফলে এমন কোনও রোহিঙ্গা, অনুপ্রবেশকারীদের দেখা যায়নি। সাধারণ মানুষের প্রবল সমস্যা হয়েছে বইকি! ৯ তারিখ লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয়ের সমস্ত কাগজপত্র-সহ প্রয়াত হয়েছেন এক বৃদ্ধ, এই পশ্চিমবঙ্গেই।
বারেবারেই বেফাঁস মন্তব্য করে চর্চায় থেকেছেন তিনি। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলিকে ‘মিনি বাংলাদেশ’ বলে কটাক্ষ করলেন তিনি চলতি বছরের শুরুতেই। এবং এ-ও বলেন যে, বিজেপিকে ভোট না দিলে সুকটাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দারা আগামী দিনে অশান্তি করবে! কোতয়ালি থানায় তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর-ও হয় বটে।
আরও পড়ুন:
নিশীথ প্রামাণিক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এ কথাগুলোকে কি অবান্তর বলে মনে হচ্ছে? তাহলে এইবেলা বলে রাখি, ২০২১ সালে তৎকালীন অসম প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি তথা রাজ্যসভার সাংসদ রিপুন বোরা প্রধানমন্ত্রীকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। যে-চিঠিতে তিনি দাবি করেছিলেন নিশীথ প্রামাণিক (Nisith Pramanik) এখানকার ভুয়া ভোটার, আসলে তিনি বাংলাদেশি। সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন রিপোর্ট তুলে তিনি দেখিয়েছিলেন নিশীথ আসলে বাংলাদেশের পলাশবাড়ির হরিনাথপুরের বাসিন্দা। কম্পিউটার কোর্স করার অছিলায় ভারতে এসেছিলেন। তারপর এখানেই থেকে যান। প্রথমে তৃণমূলে এবং পরে বিজেপিতে যোগ দিয়ে রাতারাতি সাংসদ হন। এমনকী, রিপুন বোরা এ-ও বলেন যে, কোচবিহারে দেখানো নিশীথের পরিচয়পত্রটি আসলে জাল! পাঠক, আপনাদের হয়তো মনে পড়বে– ব্রাত্য বসুও রিপুন বোরার এই চিঠিটি টুইট করেছিলেন। এরপর গঙ্গা দিয়ে যথেচ্ছ জল বয়েছে বটে, কিন্তু কে না জানে, রাজনীতি এক ধরনের ওয়াশিং মেশিন– ফলে সব অপরাধই ধুয়েমুছে সাফ!
২০২২-এ একটি উসকানিমূলক উক্তি করেছিলেন নিশীথ প্রামাণিক ও তাঁর দলভুক্ত বরেন্দ্র চন্দ্র বর্মন। তাঁরা একযোগে বলেছিলেন, কোচবিহারের মুক্তি চাই। উত্তরবঙ্গকে আলাদা রাজ্য হিসেবে বিবেচিত করা হোক। এসবের মূল উদ্দেশ্য তো উত্তরবঙ্গের মুক্তি কিংবা কোচবিহারের উন্নয়ন, তা নয়। মূল কথা: তৃণমূল সরকারের প্রতি লোক খেপিয়ে তোলা এবং নিজেদের উদ্দেশ্যসাধন করা। বারেবারেই বেফাঁস মন্তব্য করে চর্চায় থেকেছেন তিনি। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলিকে ‘মিনি বাংলাদেশ’ বলে কটাক্ষ করলেন তিনি চলতি বছরের শুরুতেই। এবং এ-ও বলেন যে, বিজেপিকে ভোট না দিলে সুকটাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দারা আগামী দিনে অশান্তি করবে! কোতয়ালি থানায় তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর-ও হয় বটে। কিন্তু ওই পর্যন্তই, কেন্দ্রীয় দলের একজন নেতা, যিনি ঘন ঘন সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করে চলেছেন, তাঁর প্রতি সে অর্থে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। স্পষ্টতই এই অপরাধ শাস্তিযোগ্য! অন্তত যতদিন সংবিধানে কোপ পড়ছে না।
কোচবিহারের মাথাভাঙায় নিশীথ প্রামাণিক আগ বাড়িয়ে তৃণমূলের সমালোচনা করতে গিয়ে বলেছেন: ‘কোনও উন্নয়নমূলক কাজ হয়নি। কাজের নামে শুধু টাকা লুট হয়েছে।’ এ বাক্য তো যে কোনও বিরোধীপক্ষেরই বলা উচিত। কিন্তু সত্যিটা হল নিশীথ প্রামাণিকই গত পাঁচ বছর ধরে এই এলাকার বিধায়ক ছিলেন।
মানুষ যদিও ক্ষোভ ওগড়াচ্ছেন। এসআইআরের সময় কোচবিহারেরই একটি ঘটনাই তাঁর প্রমাণ। বেশ কিছু মানুষ একজোট হয়ে নিশীথ প্রামাণিকের ছবিতে কালি লাগিয়ে হাজির হয়েছিলেন বিএলও-র কাছে। কী কারণ? দিনহাটার মানুষদের প্রতি নিশীথের বক্তব্যে ‘মিনি পাকিস্তান’ বুলিটি উঠে এসেছিল তো বটেই, তিনি বলেছিলেন, দিনহাটার মানুষদের ৩০টা করে বাচ্চা! নিশীথ খুব স্বাভাবিভাবেই বিজেপির এজেন্ডা মেনে এই বক্তব্যগুলি রাখছিলেন।
আজ শেষ করি, মজার এক কিস্সা দিয়ে। কোচবিহারের মাথাভাঙায়, যেখানে নির্বাচনী লড়াই মূলত তৃণমূল-বিজেপির মধ্যে, সেখানে নিশীথ প্রামাণিক আগ বাড়িয়ে তৃণমূলের সমালোচনা করতে গিয়ে বলেছেন: ‘কোনও উন্নয়নমূলক কাজ হয়নি। কাজের নামে শুধু টাকা লুট হয়েছে।’ এ বাক্য তো যে কোনও বিরোধীপক্ষেরই বলা উচিত। কিন্তু সত্যিটা হল নিশীথ প্রামাণিকই গত পাঁচ বছর ধরে এই এলাকার বিধায়ক ছিলেন। তবে? আত্মঘাতী গোলের জন্য তিনি কি এখন পস্তাচ্ছেন? ’২৪ সালের ভোটে নিশীথ প্রামাণিকের বিরুদ্ধে এই অভিযোগও ছিল যে, তিনি কেন্দ্রীয় বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করছেন! এমন ভুলোমন নিয়ে তিনি মানুষের জন্য কাজ করবেন? কোচবিহার, গোটা উত্তরবঙ্গকেই মুক্তি দেবেন! এমন ভুলোমনা স্কিপারের জন্য ব্রেনোলিয়ার বিক্রি কি বাড়বে? আপনি ভাবুন, আমিও ভাবছি।
নিবেদিত


