আসানসোল, কঠিন গড়, আসান নয়। হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন অগ্নিমিত্রা পল (Agnimitra Paul)। পালবংশের কেউ নন, তবে বিজেপির পালে হাওয়া লাগিয়েছেন। আসানসোলের মেয়ে, দাঁড়িয়েছেন আসানসোল দক্ষিণ কেন্দ্রে। কিন্তু নিজের এলাকাতেই প্রচারে বেরিয়ে তিনি মানুষের দেখা পাচ্ছেন না। আজব কাণ্ড! তিনি তো অগ্নিমিত্রা পল, নামকরা ফ্যাশন ডিজাইনার। ২০২৬ সালের শুরুতেই বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ শাখার ভাইস প্রেসিডেন্ট– এমন ঠাঁটওয়ালা পদাধিকার নিয়েও মানুষের দরজা-জানলা বন্ধ কেন!
জানা গিয়েছে, সেদিন যে-এলাকায় যাতায়াত করছিলেন অগ্নিমিত্রা, সেখানকার বেশিরভাগ মানুষই ‘দিন আনি দিন খাই’ কাজের সঙ্গে যুক্ত। পাথর খাদান বা ইটভাটার কাজে বেরিয়ে পড়েন ভোরবেলাতেই। বিজেপি প্রার্থীর প্রচারের জন্য তাঁরা ছুটি নেবেন না, সেই তো স্বাভাবিক। যদিও বিজেপির তরফ থেকে পালটা যুক্তি যে, তৃণমূলের সন্ত্রাসের কারণে বিজেপি সমর্থকরা বাইরে বেরতে পারছেন না। যদিও শুধু একদিনই না, নানা দিন নানা বিপাকে পড়েছেন তিনি। কখনও শুনেছেন ‘গো ব্যাক’ স্লোগান, কখনও-বা মাথা ঠান্ডা রাখতে না-পেরে যানজটের মধ্যে ট্রাফিক পুলিশকেই ধমক দিয়েছেন। সব জায়গা থেকে তিনি অবশ্য কটু ব্যবহার পাননি। ডামরা এলাকায় মানুষজন তাঁকে দেখেই মিষ্টির প্যাকেট হাতে দৌড়ে গিয়েছেন। বিধায়ক তিনি, মিষ্টিমুখ করাতে আপত্তি কী! যদিও জানা যায়, প্রথমবার বিধায়ককে দেখতে পেয়েই আমমানুষেরা দৌড়ে তাঁকে মিষ্টি খাওয়াতে এসেছিলেন। কিন্তু অগ্নিমিত্রা সম্ভবত উচ্ছে-করোলা-নিমপাতাই ভালোবাসেন বেশি, কিংবা কঠোর ডায়েটে বিশ্বাসী। মিষ্টি তিনি খাননি।
আরও পড়ুন:
এই রামনবমীতেই, আসানসোল দক্ষিণে বিজেপির মিছিলে উপস্থিত ছিলেন অগ্নিমিত্রা। স্রেফ ‘উপস্থিত ছিলেন’, বলা ভুল, হাতে এইয়া বড় ত্রিশূলও ছিল। সেখানকারই এক অনুষ্ঠানে তিনি বলে বসলেন, ‘আপনারা ঠিক করুন কী চান। দেড় হাজার টাকার লক্ষ্মী ভাণ্ডার নাকি মা-বোনেরা নিজেদের শাঁখা-পলা?’ অগ্নিমিত্রা পালকে জিজ্ঞাসা: দুটো একসঙ্গে চাওয়ায় ক্ষতি কি?
আরও পড়ুন:
তবে অগ্নিমিত্রা যে ধরনের চিন্তাচর্চা করেন, তাতে যে কোনও সুবুদ্ধির মানুষই দরজা-জানলা লাগিয়ে কানে ইয়ারফোন গুঁজে বসে থাকবেন। কারণ ধর্মীয় মেরুকরণের অস্ত্র নিয়েই বারবার তিনি হিন্দুদের মনে এফোঁড়ওফোঁড় করে দিতে চান। এই রামনবমীতেই, আসানসোল দক্ষিণে বিজেপির মিছিলে উপস্থিত ছিলেন অগ্নিমিত্রা। স্রেফ ‘উপস্থিত ছিলেন’, বলা ভুল, হাতে এইয়া বড় ত্রিশূলও ছিল। সেখানকারই এক অনুষ্ঠানে তিনি বলে বসলেন, ‘আপনারা ঠিক করুন কী চান। দেড় হাজার টাকার লক্ষ্মী ভাণ্ডার নাকি মা-বোনেরা নিজেদের শাঁখা-পলা?’ অগ্নিমিত্রা পালকে জিজ্ঞাসা: দু’টো একসঙ্গে চাওয়ায় ক্ষতি কি? সে যেই-ই সরকারে আসুক? আর হিন্দুদের অস্তিত্ব সংকটে– এই কথা মগজে ঢোকাতে অন্যান্য প্রদেশে বিজেপি যতটা সফল হয়েছে, এখনও পর্যন্ত বাংলায় তা ঘটেনি। কারণ বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস ঘৃণার ইতিহাস নয়। একসঙ্গে থাকার ইতিহাস। বাংলার রবীন্দ্রনাথ থাকলে, নজরুলও আছেন। সেই ইতিহাসেই বারবার ঘা মারার চেষ্টা করে পশ্চিমবঙ্গকে আরও পশ্চিমে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস কতদূর সফল হবে, তা অবশ্য বিচার করবেন মানুষেরা, বিচার করবে ভোটবাক্স।
এর আগে, খাস বিধানসভায় পর্যন্ত অগ্নিমিত্রা নিজের আশ্চর্য বুঝভম্বুল দার্শনিকতায় বলেছিলেন, ‘মাদ্রাসায় জঙ্গি তৈরি হচ্ছে।’ তখন অবশ্য উলটো তরফে তাঁকে শুনতে হয়েছিল: ‘আবদুল কালাম তবে ক্রিমিনাল?’ এই প্রশ্নের সদুত্তর যদিও অগ্নিমিত্রা কেন, কোনও বিজেপি প্রার্থীর কাছেই পাওয়া যাবে না। অনেকে হয়তো এই মন্তব্যের দায় এড়িয়ে যাবেন! কিন্তু অগ্নিমিত্রা যে সহিংস, সে নিয়ে তো সন্দেহ নেই কোনও। আদালত চত্বরে তিনি সপাটে বিপক্ষকে শাসাতে পারেন: ‘মারের বদলা মার, আদর নয়’। এমনকী, যোগী আদিত্যনাথের ব্যাকরণ মেনে তিনি পশ্চিমবঙ্গেও বুলডোজার দিয়ে ঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার ফন্দি দিয়েছিলেন আবাস যোজনার দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে। দুর্নীতি বলতে মনে পড়ল: নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ পৌঁছেছিল যে, কোটি টাকার সম্পত্তি লুকিয়ে তিনি ভোটের লড়াইতে নামছেন!
আসানসোলে অগ্নিমিত্রা ক্যারাম বোর্ডের উদ্বোধন করেছিলেন। তৃণমূলের ঠোঁটকাটা দেবাংশু ফেসবুকে লিখেছিলেন: ‘ক্যারাম বোর্ডের উদ্বোধন করলেন আসানসোল দক্ষিণের বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পল। ২০২৬-এ ভোটে জিতলে চাইনিজ চেকার, রুমাল চোরের রুমাল এমনকী লুডোরও উদ্বোধন করবেন আশা করি।’
গত কয়েক বছর ধরেই ‘ভারতমাতা’ নামক আবেগের পুনর্জাগরণ ঘটেছে। অবন ঠাকুরের ‘ভারতমাতা’ এবং বঙ্কিমচন্দ্রর ‘বন্দে মাতরম্’ মাছ-ভাতে বাঙালির থেকে প্রায় বাজেয়াপ্ত করেছে বিজেপি। কলকাতার নানা রাস্তায় হাঁটলে এখন ভারতমাতার ওই বিখ্যাত ছবি, বঙ্কিমচন্দ্র এবং পদ্মফুলকে জুড়ে বিচিত্র কর্মকাণ্ডের হোর্ডিং দেখতে পাওয়া যায়। এই মাদার্স ডে-তে তো অগ্নিমিত্রা ভারতমাতার পুজো করেছিলেন বিজেপির সাংগঠনিক কার্যালয়ে! তিনি অবশ্য এমন বহু কাণ্ডই ঘটান যা বিশ্বাসের অতীত! আসানসোলে তিনি একবার ক্যারাম বোর্ডের উদ্বোধন করেছিলেন। তখন তৃণমূলের ঠোঁটকাটা দেবাংশু ফেসবুকে লিখেছিলেন: ‘ক্যারাম বোর্ডের উদ্বোধন করলেন আসানসোল দক্ষিণের বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পল। ২০২৬-এ ভোটে জিতলে চাইনিজ চেকার, রুমাল চোরের রুমাল এমনকী লুডোরও উদ্বোধন করবেন আশা করি।’
পুজোর মরশুম বাড়তি আয়ের জন্য একবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, চা-মুড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। তাতে অগ্নিমিত্রা পল-সহ বিজেপির অনেকেই বিধানসভার বাইরে চা-মুড়ি বিক্রি করে অভিনব প্রতিবাদ করেছিলেন। আগ বাড়িয়ে ট্যাক্সিওয়ালাদের হাতে চায়ের কাপ তুলে দিচ্ছেন– প্রতিবাদ প্রক্রিয়া ছাড়াও এহেন মুহূর্ত তৈরি করা অভিজ্ঞতার জারণে সুখস্মৃতি হয়ে উঠবে নিশ্চয়ই।
অগ্নিমিত্রা লড়ুন। পারলে ডিজাইন বদলে দিন আসানসোলের। আর মনে রাখুন, সত্যিকারের একজন স্কিপারের কাছে ‘জনগণ’ বললে, তাঁর কোনও ধর্ম ভেসে ওঠে না।
নিবেদিত


