এই কলকাতাকে তিনি দারুণ চেনেন। সেই ছোট্টবেলা থেকেই। ৪১/১ এ। ঢাকুরিয়ায় থাকতেন তিনি। বাবা থাকতেন বাংলাদেশে, মেয়ে ও মা এখানে। সেই ক্লাস থ্রি-এ পড়া মেয়েটি নিজে এক্কেবারে একা তিন স্টপেজ পেরিয়ে চলে গিয়েছিলেন মামার বাড়ি। ছোটবেলা থেকে তাঁর স্মৃতি এমনই প্রখর। কলকাতার বাড়িঘর এমনই চিনতেন। চাইতেন আর্কিটেক্ট হতে। কিন্তু কালের লিখনে হলেন দুরন্ত অভিনেত্রী। কলকাতা ছেড়ে মুম্বই, বিধু বিনোদ চোপড়ার প্রোডাকশনে কাজ, রাতারাতি দ্রৌপদী চরিত্রে ভারতবিখ্যাত। এমনকী, মৌখিক ইতিহাস বলছে, যেদিন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, সেদিন কলকাতার রাস্তা খাঁ খাঁ করছিল।
২০২২ সালে তিনি সংসদে কেঁদে ভাসিয়েছিলেন। কারণ কী? তৃণমূল সাংসদরা তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি তো ছোট থেকেই ডাকাবুকো, তবুও এই বিপরীত মন্তব্যচর্চায় তিনি এমন নরমসরম হবেন কেন?
প্রচুর ছবি করেছেন। তেড়ে নাম করেছেন। কিন্তু দুম করেই ছবির পর্দা থেকে উধাও তিনি। এমন ডাকাবুকো ভদ্রমহিলা কেন যে সিনেমা ছেড়ে রাজনীতির বৃত্তে ঢুকে পড়লেন! ২০০৭ সাল নাগাদ অঞ্জন দত্তর ‘চলো অঞ্জন’-এ তাঁর সাক্ষাৎকারে অঞ্জন দত্ত যখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘ঈশ্বর তোমার কাছে কী?’ তিনি বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর আমার কাছে বিরাট সাপোর্ট। অন্যায় করতে গেলে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, এমন কেউ। ঈশ্বর আমার কাছে ভরসা। আমার কাছে মনে হয় যেন, এমন কেউ আছেন, যাঁকে আমি ঠকাই না। অন্যায় করি না। কখনও কাউকে অযাচিতভাবে কষ্ট দিইনি। আমার ঈশ্বর আমার কাছে এমন একটা জিনিস, যা আমাকে ঠিক ঠিক পথে চালনা করে যাবে।’ আজকে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে, তিনি বিজেপির প্রার্থী, সোনারপুরে। আমি জানি না, তাঁর ঈশ্বর এই পথ দেখিয়েছেন কিনা। তিনি জানেন, এই দেশে ধর্ষকের গলায় মালা পরিয়ে তাঁর দল জেল থেকে বের করে এনেছিল। অথচ হায়দরাবাদ শহরে পশু চিকিৎসককে ধর্ষণের পর পুড়িয়ে মারার ঘটনায় তিনি বলেছিলেন, ধর্ষকদের প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হোক। তাঁর ঈশ্বর কি সত্যিই এত কনফিউডজ?
তিনি জানেন, নির্বাচন কমিশন কাদের ইন্ধনে আজ সংখ্যালঘুদের ভোটার তালিকা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখছে। যার শেষতম ফল, নন্দীগ্রামে ৯৫ শতাংশ সংখ্যালঘুর নাম বাদ পড়া। যে-দল ক্রমাগত হিংসার কথা বলে চলেছে, যে-দল বাংলা ভাষাভাষীদের বিরুদ্ধে, যে-দল ভেদাভেদ গড়ে তুলে চেষ্টা করছে ভোটে জেতার, যে-দল বৈচিত্রময় ভারতের খাদ্যাভাসে আঘাত করার চেষ্টা করছে, চাইছে বাঙালির পাতে মাছ-মাংসের অবলুপ্তি ঘটুক, তিনি সেই দলে! তাঁর ঈশ্বর সত্যিই কি এতকিছু জানার পরেও তাঁকে সেই দলের হয়ে কথা বলতে বলেছেন?
রূপা গাঙ্গুলি বলেছেন, ‘তৃণমূলের একটাই পোস্ট, বাকি সব ল্যাম্পপোস্ট’। ওঁর বিপরীতে পাল্টা জবাব দেন সোনারপুরের তৃণমূল প্রার্থী লাভলী মৈত্র। বলেন, ‘উনি যা বলেছেন তা ওঁর এবং ওঁর দলের সংস্কৃতি। আমি ব্যক্তিগত আক্রমণে বিশ্বাসী নই।’
২০২২ সালে তিনি সংসদে কেঁদে ভাসিয়েছিলেন। কারণ কী? তৃণমূল সাংসদরা তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি তো ছোট থেকেই ডাকাবুকো, তবুও এই বিপরীত মন্তব্যচর্চায় তিনি এমন নরমসরম হবেন কেন? রাজনৈতিক মহলে ক্রন্দন যদিও নতুন কিছু নয়। তা যে, শুধুই জনগণের চোখ টানতে, তা নয়। কিন্তু তিনি কী বলেছেন রাজ্যসভায়? বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের এই পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে আমার মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে। আমরা কেউ পাথরের তৈরি নই। এখানে মানুষের বেঁচে থাকা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বাংলা ভারতেরই অংশ। এখানকার মানুষেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। বাংলায় জন্মগ্রহণ করা অপরাধ নয়।’ অতঃপর তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘আমরা পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবি জানাচ্ছি। বাংলায় গণহত্যা চলছে। মানুষ রাজ্য ছেড়ে পালাচ্ছেন। বাচ্চা এবং মহিলারাও সুরক্ষিত নন।’ এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই পশ্চিমবঙ্গে নানা সময় বিবিধ গুবলেট ঘটেছে। সেসব খুব সুবিধেরও নয়। কিন্তু রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের এই রাষ্ট্রপতি শাসন চালু করার আকুতি-কাকুতি-মিনতি কেন, কোন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য, তা তো যে কোনও গ্রেম্যাটার মানবের বোঝা উচিত।
বাংলা বাজারে দু’রকমের পোস্ট খুব বিখ্যাত। এক, ফেসবুক পোস্ট। দুই, ল্যাম্পপোস্ট। মমতাশঙ্কর এক বছর আগেই মেয়েদের শাড়ি পরা ও ল্যাম্পপোস্টকে মিলিয়ে দিয়ে তীব্র আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। সেই থেকেই বঙ্গে বোধহয় ল্যাম্পপোস্ট ট্রেন্ডিং বিষয়। মমতাশঙ্করের পর রূপা গাঙ্গুলি (Roopa Ganguly)। তিনি অবশ্য মেয়েদের নিয়ে কোনও অযাচিত মন্তব্য করেননি। তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য তৃণমূল কংগ্রেস। বলেছেন, ‘তৃণমূলের একটাই পোস্ট, বাকি সব ল্যাম্পপোস্ট’। ওঁর বিপরীতে পাল্টা জবাব দেন সোনারপুরের তৃণমূল প্রার্থী লাভলী মৈত্র। বলেন, ‘উনি যা বলেছেন তা ওঁর এবং ওঁর দলের সংস্কৃতি। আমি ব্যক্তিগত আক্রমণে বিশ্বাসী নই।’
আর জি কর তদন্তের সময়ের একটা মন্তব্য দিয়ে শেষ করি রূপা গাঙ্গুলিকে নিয়ে এই পর্ব। তিনি মিডিয়ায় বলেছিলেন, ‘বাঙাল ভাষায় বলব, উলটে প্যাঁদাও।’ বাঙাল ভাষা? তাঁর বাবা যে দেশে কাজ করতেন। তাঁর ঠাকুরমা যে ভাষায় কথা বলতেন। আজকের বিজেপির বয়ানে হিংসা তো শুধু পাকিস্তানের প্রতিই নয়, বাংলাদেশের প্রতি, বাংলাভাষার প্রতিও।
স্কিপার রূপা এইসব কি ভেবে দেখেছেন, না ছেড়ে দিয়েছেন ঈশ্বরের উপর?
নিবেদিত


