সালটা ছিল ১৯৭০। ২২ ফেব্রুয়ারি রবিবার, বাংলার ১৩৭৬ সালের ১০ ফাল্গুন। চণ্ডীমাতা ফিল্মসের কর্ণধার সত্যনারায়ণ খাঁয়ের বড় ছেলে দিলীপ কুমার খাঁ ও স্ত্রী মৃদুলা খাঁ-এর বউভাতের অনুষ্ঠান। জগৎবল্লভপুরের গোহালপোতায় সত্যনারায়ণবাবুর বাড়িতে তা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আর সেখানেই স্বয়ং মহানায়ক-সাক্ষাৎ নববধূর! বউভাতের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার। সেখানেই মৃদুলা দেবীর সঙ্গে প্রথম সামনাসামনি দেখা তাঁর। কার্যত যেন স্বপ্নের দিন মৃদুলা খাঁয়ের। তারপর থেকে মৃদুলা দেবীর বার দশেক দেখা হয়েছে উত্তম কুমারের সঙ্গে। জড়িয়ে রয়েছে নানা টুকরো টুকরো স্মৃতি।
মৃদুলা দেবী জানান, ‘‘বাড়ির তিনতলার আমাকে বসানো হয়েছিল। আমি সেখানেই নববধূর সাজে ছিলাম। হঠাৎই সুপ্রিয়া দেবী আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। হাতে একটা দামি বেনারসি। আমার হাতে তুলে দেন সেটি। বলেন, দাদা পাঠিয়েছেন। উনি শ্বশুরমশাইকে বললেন যে দাদা উঠতে পারবেন না উনি সদর বাড়ি দোতালায় বসে আছেন। আমাকে শ্বশুরমশাই নিচে আসতে বললেন। আমি নেমে এলাম সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে। ওঁকে প্রথম দেখলাম। দেখে তো অবাক হয়ে গেছি! আমি তো জানি না কাকে দেখানোর জন্য আমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সুপ্রিয়া দেবীকে চিনতে পারিনি, উনি এত মেকআপ করেছিলেন। হঠাৎ ঘরে গিয়ে দেখে উত্তম কুমার দাঁড়িয়ে আছেন। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরেছিলেন। ডান হাত কোমরে দিয়ে বাঁ হাতে কুঁচি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে মুচকি হাসি। ওঁর সঙ্গে চার-পাঁচজন লোক ছিলেন। আর কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আর শ্বশুরমশাই ছিলেন। সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে তাঁর কাছে ঢুকলাম। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চিন্তা করছি মুখের দিকে চেয়ে এই মুখটা তো আমি ‘শিল্পী’ সিনেমায় দেখেছি।”
আরও পড়ুন:
মৃদুলাদেবীর কথায়, ‘‘আমার মনে পড়ল, সেই ছবিতে এই উত্তম কুমার অভিনয় করেছিলেন। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা উত্তম কুমারকে দেখছি আর চিন্তা করছি যে সেই ছবির মানুষ আর এই মানুষ এক তো? আমি তো তখনও জানতাম না যে উনিই উত্তম কুমার। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখছি কয়েক মিনিট। বিস্মিত হয়ে গেছি। আবেগ আপ্লুত হয়ে গেছি। এতটাই মনের কল্পনায় বিভোর হয়ে গেছি যে শ্বশুরমশাই বললেন, ওঁকে প্রণাম করো। তারপর প্রণাম করতে গেলাম। একটু মাথা নিচু করেছিলাম। তারপর উত্তম কুমার বলেন, প্রণাম না করতে। কোনওদিন ভাবতে পারিনি, এই মানুষটাকে সামনে আমি দেখব। ঘরেতেও কেউ আলোচনা করেনি যে উত্তম কুমার আসবেন। তাহলে তো মন থেকে প্রস্তুত হয়ে যেতাম। প্রথম দেখলাম তাঁকে, একেবারে অজান্তেই। এরপর একাধিকবার দেখা হয়েছে। মোটামুটি ১০ বার উত্তম কুমারকে দেখেছি।”

এরপর হঠাৎই ১৯৭৫ সালে উত্তম কুমার মৃদুলা দেবীদের বাড়িতে এসে হাজির। মৃদুলা দেবী বলেন, ‘‘আমার মেয়ের জন্মের আগে ৯ মাসের সাধের দিনে সকাল ন’টার সময় উনি হঠাৎ এসে হাজির নিজের গাড়িতে চেপে। সঙ্গে ছিলেন অসীম সরকার। আমি জানতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসি। এবারেও এসে দুটি সুন্দর দামি টাঙ্গাইল শাড়ি দিলেন এবং অসীম সরকার একটি শাড়ি দিলেন। তারপর শ্বশুর মশাই ওঁদের উপরে নিয়ে গিয়ে চার জল খাওয়ালেন, পরে ওঁরা চলে গেলেন। ৭৬ সালে মে মাসে দেওরের বিয়ে হয়, তখনও উনি এসেছিলেন। তখনও জা-কে একটি বেনারসি দিয়েছিলেন।” তিনি আরও জানান, ‘‘আমাকে বিয়েতে দেওয়া বেনারসি শাড়ি এবং পরে টাঙ্গাইল শাড়ি সব আমি তুলে রেখেছি স্মৃতি হিসাবে। মেয়ের ভাতের দিনে একটি সোনার হার দিয়েছিলেন। সেটিও আমি সযত্নে তুলে রেখেছি।”
এর আগে ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘হার মানা হার’ সিনেমার শুটিংয়ে উত্তম কুমার জগৎবল্লভপুরে সত্যনারায়ণ বাবুর বাড়িতে এসেছিলেন। সেখানে মৃদুলাদেবী উত্তম কুমারকে দেখেন। এছাড়া ‘সন্ন্যাসী রাজা’, ‘বনপলাশীর পদাবলী’, ‘প্রতিশোধ’, ‘প্রতিদান’ সিনেমাতেও উত্তম কুমারকে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। শেষ দেখা হয়েছে ‘প্রতিশোধ’ ছবিতে। ১৯৮০ সাল নাগাদ মৃদুলাদেবী শ্বশুরমশাই সত্যনারায়ণ বাবুর মৃত্যুর পরে মহানায়ক তাঁদের বাড়িতে যান। তিনি যে ঘরে ঘুমাতেন, সেই ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে উনি শোকাহত হয়ে গিয়েছিলেন। সেই শেষ দেখা উত্তম কুমারের সঙ্গে।
স্মৃতির ভাঁড়ার অফুরান মৃদুলাদেবীর। আর জানান, ‘‘উনি রাতে রুটি খেতেন এবং কচি মুরগির ঝোল খেতেন। আমি প্রথম দিন মশলা দিয়ে করে ফেলেছিলাম। সুপ্রিয়া দেবী নিজে হাতে আমাকে শিখিয়ে দেন, খুব কম মশলা দিয়ে কীভাবে উত্তম কুমারের জন্য রান্না করতে হয়। তারপর থেকে আমি উত্তম কুমারের জন্য সেই ভাবেই রান্না করতাম। দিনের বেলাতেও উনি রুটি খেতেন, সেই রুটি আমি তৈরি করে দিতাম। পাশাপাশি ঠাকুর মাছ ভাজা বা মাছের ঝোল দিতেন সেগুলো তিনি খেতেন।” মোট কথা উত্তম কুমারের জন্য নিজে হাতে রান্না করে দিয়েছেন মৃদুলা দেবী। সেই স্মৃতি বলতে বলতে আনন্দে গলা বসে এলো মৃদুলা দেবীর। বললেন, ‘‘উত্তম কুমার আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে আছেন, পাশে শ্বশুর মশাই। কতবার এমন দৃশ্যের সাক্ষী থেকেছি। শুটিংয়ের সময় ঘর কার্যত যেন বিয়েবাড়ির মত আনন্দময় হয়ে থাকত। ৩০-৩৫ জনের রান্নাবান্না খাওয়া দাওয়া হই-হুল্লোড় কত আনন্দ হতো। রান্নাবান্না অবশ্য রান্নার লোক করতেন। উত্তম কুমার কাচের গ্লাসে চা খেতেন। সকালে কাচের গ্লাসে করে চা দিতাম। শ্বশুর মশাইকে এবং উত্তম কুমারকে। সেই কাচের গ্লাস ও আমি সযত্নে তুলে রেখেছি। মাঝে মাঝে হরলিক্স খেতেন উত্তম কুমার। উনি দ্রুত শুটিং শেষ করে ফেলতে পারতেন এবং তারপর এখানে এসে শুয়ে থাকতেন কামরায়।”
শুটিং এর সময় যে কেটলিতে চা হতো, সেই বড় কেটলি কেউ এখনও মৃদুলাদেবী সযত্নে তুলে রেখেছেন স্মৃতি হিসেবে। অবসর পেলেই সেসব পুরনো কথা মনে করে আনন্দ পান। সেসব স্মৃতি ভোলা যায় না। তাঁর শ্বশুর মশাই মারা গিয়েছেন ৫৫ বছর বয়সে আর উত্তম কুমার ৫৪ বছরে। এত তাড়াতাড়ি সব শেষ হয়ে যাবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি বলে জানান মৃদুলাদেবী।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
দুষ্টু মেসেজে আলাপ, ঘনিষ্ঠতা বাড়তেই ছাত্রের সঙ্গে উদ্দাম যৌনতা, ব্রেকআপের পর এ কী হল শিক্ষিকার!
-
রাত্রিবাস করেছিলেন মহানায়ক, ‘উত্তম’ স্মৃতি আগলে আজও নতু গ্রামের জমিদার বাড়ি
-
পুরভোটে স্ট্র্যাটেজি বদল সিপিএমের! জোট নিয়ে নিচুতলার কর্মীদের ‘স্বাধীনতা’ দিল আলিমুদ্দিন
-
নদী না ডাস্টবিন! তীরে আবর্জনার পাহাড়, একা হাতে পরিষ্কার তরুণের, ছবি দেখে কুর্নিশ নেটপাড়ার
-
বন্যাকে থোড়াই কেয়ার, গির্জার ভিতর কোমর জলেই বিয়ে বর-কনের! ভাইরাল ভিডিও