Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২০ জুলাই ২০২৬
Sundarbans

সুন্দরবনে বাড়ছে স্কুলছুট, স্বপ্ন ছারখার বহু পরিবারের

সুন্দরবনের ছাত্রছাত্রীরা মেধায় পিছিয়ে নয়। অনেক সময় তারা সুযোগে পিছিয়ে। তাদের সমস্যা বুঝতে হবে।

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জুলাই ১৯, ২০২৬, ২০:১৪

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জুলাই ১৯, ২০২৬, ২০:১৪

options
link
সুন্দরবনে বাড়ছে স্কুলছুট, স্বপ্ন ছারখার বহু পরিবারের zoom
সুন্দরবনে বাড়ছে স্কুলছুট। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement

সুন্দরবনে স্কুলছুটের সমস্যা যেন বাড়ছে ক্রমাগত। আর একজন স্কুলছুট মানেই তাকে ঘিরে একটি পরিবারের স্বপ্ন ছারখার হয়ে যায়। এই বিষয়ে কলম ধরলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগরের ফুলবাড়ি শীতলা হাইস্কুলের শিক্ষক ভোলানাথ দাস।

সুন্দরবনের শিক্ষার কথা উঠলেই আমরা সাধারণত নদী, দুর্যোগ, দূরত্ব, স্কুলভবন, শিক্ষকসংখ্যা কিংবা পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু এই সব আলোচনার আড়ালে একটি নীরব সংকট রয়ে যায় – স্কুলছুট। আমার দীর্ঘদিনের শিক্ষকতা ও বিদ্যালয় পরিচালনার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সুন্দরবনের মতো অঞ্চলে স্কুলছুট কখনও শুধু পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা নয়, এটি অনেক সময় একটি শিশুর স্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস এবং সামাজিক উত্তরণের পথ থেমে যাওয়ার গল্প। ভারতের সরকারি শিক্ষা-তথ্যব্যবস্থা ইউডিআইএসই প্লাসের ২০২৩-২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় স্তরে উচ্চশিক্ষা স্তরে স্কুলছুটের সংখ্যা প্রায় ১৪.১ শতাংশ। অর্থাৎ উচ্চশ্রেণিতে পৌঁছনোর সময় এখনও অনেক ছাত্রছাত্রী শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সরে যাচ্ছে। ইউডিআইএসই প্লাস হল স্কুল শিক্ষামন্ত্রকের অধীন স্কুলশিক্ষা সংক্রান্ত অফিসিয়াল ডেটা সিস্টেম, যেখানে স্বীকৃত স্কুলগুলি প্রতি বছর শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পরিকাঠামো সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করে। এই ডেটা ব্লক, জেলা, রাজ্য এবং জাতীয় স্তরেও গণ্য।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

সুন্দরবনের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও গভীর, কারণ এখানে শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদী, যাতায়াত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবারের জীবিকা, দারিদ্র্য, অল্প বয়সে কাজের চাপ এবং অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক মানসিকতা। স্কুলছুট শুরু হয় অনেক আগে। আমার নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, একজন ছাত্র বা ছাত্রী হঠাৎ করে একদিন স্কুল ছাড়ে না। তার আগে কিছু ছোট ছোট সংকেত দেখা যায়। প্রথমে সে অনিয়মিত হতে শুরু করে। তারপর ক্লাসে মনোযোগ কমে যায়। বই-খাতা ঠিকমতো আনে না। পরীক্ষার আগে ভয় পায়। বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যায়। অনেক সময় শিক্ষক ডাকলে চোখ নামিয়ে থাকে। এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলিকে যদি স্কুল গুরুত্ব না দেয়, তাহলে একদিন দেখা যায় ছাত্রটি আর ফিরছে না। নামডাকার খাতায় তখন শুধু একটি নাম কমে যায়। কিন্তু বাস্তবে কমে যায় একটি সম্ভাবনা।

School

একজন প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে স্কুলছুট আরও বেশি ক্ষতিকর। কারণ সে শুধু নিজের জন্য পড়ছে না। সে আসলে তার পরিবারের সামাজিক অবস্থান বদলানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে। সেই ছাত্র যদি স্কুল ছেড়ে দেয়, তাহলে অনেক সময় একটি পরিবারের ভবিষ্যৎও আবার পুরনো সীমাবদ্ধতায় আটকে যায়। সুন্দরবনে স্কুলছুটের কারণ শুধু পড়াশোনার দুর্বলতা নয়। অনেক সময় আমরা খুব সহজে বলে দিই, “ও পড়াশোনায় মন দিচ্ছে না।” কিন্তু বাস্তবটা এত সহজ নয়। সুন্দরবনের বহু পরিবারের আয় অনিয়মিত। কেউ মৎস্যজীবী, কেউ কৃষিশ্রমিক, কেউ দিনমজুর, কেউ অস্থায়ী কাজে যুক্ত। পরিবারের আর্থিক চাপ বাড়লে ছাত্রদের উপর দায়িত্ব এসে পড়ে। কেউ বাবার কাজে সাহায্য করে, কেউ বাজারে বা দোকানে কাজ নেয়, কেউ আবার মৌসুমি কাজে যুক্ত হয়ে পড়ে। মেয়েদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও সংবেদনশীল। পারিবারিক কাজের চাপ, নিরাপত্তার প্রশ্ন, সামাজিক সংকোচ, অল্প বয়সে বিয়ের চাপ, ঋতুস্রাবজনিত সমস্যা – এসব স্কুলছুটের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই স্কুলছুটকে শুধুমাত্র পড়াশোনায় ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে আর্থ সামাজিক কঠিন পরিস্থিতির প্রতিফলন।

আমি বিশ্বাস করি, সুন্দরবনের স্কুলগুলির সবচেয়ে বড় কাজগুলির একটি হলো “খোঁজ নেওয়ার সংস্কৃতি” তৈরি করা। কোনও ছাত্র তিন-চার দিন অনুপস্থিত থাকলে শুধু খাতায় কলমে অনুপস্থিত করে রাখলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তার বাড়িতে ফোন করা, অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলা, প্রয়োজন হলে বাড়ি বাড়ি যেতে হবে – এই ছোট উদ্যোগগুলো অনেক সময় বড় পরিবর্তন আনে। আমার নিজের বিদ্যালয়-জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অনেক ছাত্রছাত্রী শুধু এই কারণে ফিরে এসেছে যে স্কুল থেকে কেউ তাদের খোঁজ নিয়েছে। তারা অনুভব করেছে, “আমি না গেলে স্কুলে কেউ আমার কথা ভাবে।” এই অনুভূতিটাই স্কুলছুট রোখার সবচেয়ে মানবিক ভিত্তি। শিক্ষক যদি ছাত্রকে শুধু রোল নম্বর হিসেবে দেখেন, স্কুলছুট বাড়বে। শিক্ষক যদি ছাত্রকে মানুষ হিসেবে দেখেন, স্কুলছুট কমবে।

Baby

সুন্দরবনের শিক্ষার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে মেয়েদের পড়াশোনার উপর। একজন মেয়ে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে গেলে তার আত্মবিশ্বাস, স্বাস্থ্য-সচেতনতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ জীবনের সম্ভাবনা বাড়ে। শুধু তাই নয়, শিক্ষিত মেয়েরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা নেয়। তাই ছাত্রীদের স্কুলছুট রোধে স্কুলস্তরে কাউন্সেলিং, নিরাপদ পরিবেশ, শৌচ স্বাস্থ্যসচেতনতা, কেরিয়ার সচেতনতা নিয়ে পরিবারকে নিয়মিত বোঝানো খুব জরুরি। মেয়েদের শিক্ষা কেবল একটি ব্যক্তি বিশেষ সাফল্যের গল্প নয়। এটি সমাজের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি।

স্কুলছুট কমানোর আরেকটি বড় উপায় হল শিক্ষাকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা। অনেক ছাত্র ভাবে, “এই পড়াশোনার কাজে কী হবে?” এই প্রশ্নের উত্তর না দিলে তারা ধীরে ধীরে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারায়। সুন্দরবনের ছাত্রদের জন্য শিক্ষার সঙ্গে স্থানীয়দের যুক্ত করা দরকার। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, বন, মৎস্যজীবন, পর্যটন, ডিজিটাল স্বাক্ষরতা, বৃত্তিমূলক শিক্ষা, অর্থনৈতিক সচেতনতা, পরিবেশ শিক্ষার বিষয়ে শ্রেণিকক্ষে আলোচনার অংশ হতে পারে। এতে ছাত্ররা বুঝবে, শিক্ষা শুধু পরীক্ষার জন্য নয়; শিক্ষা জীবনের জন্য।

জাতীয় তথ্যেও দেখা যাচ্ছে স্কুলছুটের সমস্যা উচ্চশিক্ষা স্তরে বেশি প্রকট। ইউডিআইএসই প্লাস ২০২৩-২৪ বিশ্লেষণে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুট প্রায় ১৪.১ শতাংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যা প্রাথমিক স্তরের তুলনায় অনেক বেশি। এই স্তরই সবচেয়ে জটিল। কারণ এই সময়েই ছাত্রছাত্রীরা শৈশব থেকে কৈশোরে পা দেয়, পরিবারের চাপ, কেরিয়ার নিয়ে সন্দিহান হয়ে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক চাপের মুখোমুখি হয়। সুন্দরবনের মতো অঞ্চলে তাই অষ্টম শ্রেণি থেকে দশম এবং দশম থেকে একাদশ শ্রেণির সময় বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। শুধু ভর্তি হলেই হবে না, সে নিয়মিত স্কুলে আসছে কিনা, পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত আছে কি না, পরিবার তাকে সমর্থন করছে কিনা – এসব দেখতে হবে।

সুন্দরবনে স্কুলছুট রুখতে কোনও একদিনের অনুষ্ঠান নয়। এটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রতিটি স্কুলে রোজকার উপস্থিতিতে নজর রেখে তালিকা তৈরি করতে হবে। অনুপস্থিত পড়ুয়াদের বাড়িতে যেতে হবে। অভিভাবকদের কাউন্সেলিং করতে হবে। কেরিয়ার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। সর্বোপরি শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বেশি আনন্দময় করতে তুলতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, বিদ্যালয়, শিক্ষক, অভিভাবক, পঞ্চায়েত, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সমাজ – সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ স্কুলছুট রোধে শুধু স্কুলের কাজ নয়। এটি সামাজিক দায়বদ্ধতা।

সুন্দরবনের ছাত্রছাত্রীরা মেধায় পিছিয়ে নয়। অনেক সময় তারা সুযোগে পিছিয়ে। তাদের সমস্যা বুঝতে হবে, তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে, এবং তাদের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার বিশ্বাস, একটি স্কুলছুট পড়ুয়াতে স্কুলে ফিরিয়ে আনা মানে শুধু একজন ছাত্রকে শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা নয় – একটি পরিবারকে আবার আশার পথে ফিরিয়ে আনা। সুন্দরবনের শিক্ষা নিয়ে সত্যিই যদি আমরা ভাবতে চাই, তাহলে স্কুলছুট রোখার কার্যক্রম সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে। কারণ একটি শিশুকে ধরে রাখা মানে সুন্দরবনের ভবিষ্যৎকে ধরে রাখা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.