লুঙ্গি পরে ভোট দিতে গেলে বাধাপ্রাপ্ত হন কয়েকজন ‘বৈধ’ ভোটার। এমন নজির বিরল। গ্রামীণ জীবনের উপযোগী পোশাক লুঙ্গি। আবার, এটি ‘শ্রেণিচিহ্ন’-ও। লুঙ্গি পরার দায়ে ভোট দিতে না পারাকে ‘প্রতীকী বহিষ্কার’ ধরা যেতে পারে। গণতন্ত্রের ‘বৈচিত্র’ ও ‘সামাজিক চর্চা’ এই ছোট্ট ঘটনায় ভূলুণ্ঠিত হল। আজ, ভোটের রেজাল্টের দিনে, এর রাজনৈতিক তাৎপর্য নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না! লিখছেন প্রিয়ঙ্কর দাস।
পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় দফার ভোটের দিনে (২৯ এপ্রিল), লুঙ্গি পরে ভোট দিতে যাওয়ায়, কয়েকজন ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়। ‘গণতন্ত্রের উৎসব’ বলে চিহ্নিত ভোটের দিনে, নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের পথে, এই ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরিকে নিছক ‘প্রশাসনিক ভুল’ রূপে দেখলে বোধ করি ভুল হবে। এটি বরং গণতান্ত্রিক চেতনা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধ– এই তিনের জটিল সংকটকে তুলে ধরে। লুঙ্গি– এই পরিধেয়র কারণে– নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বিরত রাখা হল, এটি কেবল নিয়মের অপব্যাখ্যা নয়, এক ধরনের অপ-মনের বহিঃপ্রকাশ, যেখানে ‘গ্রহণযোগ্য নাগরিক’-এর একটি নির্দিষ্ট চেহারা কল্পনা করে নেওয়া হচ্ছে ও তার সাপেক্ষে ‘লুঙ্গি’-কে পরিত্যাজ্য ভাবা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
ভুললে চলবে না, লুঙ্গি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তনের অংশ। ইতিহাসবিদ কে. এন. চৌধুরী গবেষণায় দেখিয়েছেন, ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যের মাধ্যমে আরব, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান ঘটেছিল, তারই পরিণতিতে এই ধরনের পোশাকের বিস্তার। ইন্দোনেশিয়ার সারং থেকে পশ্চিমবঙ্গের লুঙ্গি– সবই এক বৃহত্তর ঐতিহাসিক ধারার অংশ। একইভাবে, বাংলার সমাজ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মার্কিন ঐতিহাসিক রিচার্ড এম. ইটন দেখিয়েছেন– কীভাবে গ্রামীণ জীবনে সহজ, আরামদায়ক এবং আবহাওয়া উপযোগী পোশাক রূপে লুঙ্গি ব্যাপকতা অর্জন করেছিল, গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল। অর্থাৎ, লুঙ্গি এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
লুঙ্গি– এই পরিধেয়র কারণে– নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বিরত রাখা হল, এটি কেবল নিয়মের অপব্যাখ্যা নয়, এক ধরনের অপ-মনের বহিঃপ্রকাশ, যেখানে ‘গ্রহণযোগ্য নাগরিক’-এর একটি নির্দিষ্ট চেহারা কল্পনা করে নেওয়া হচ্ছে ও তার সাপেক্ষে ‘লুঙ্গি’-কে পরিত্যাজ্য ভাবা হচ্ছে।
এটি কোনও বিচ্ছিন্ন বা ‘অগ্রহণযোগ্য’ চিহ্ন নয়। তবুও, এই পোশাককে ঘিরে যে সামাজিক পূর্বাগ্রহ কাজ করে, তা অস্বীকার করা যায় না। সাধারণত শ্রমজীবী ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনধারার সঙ্গে যুক্ত লুঙ্গি। ফলে এটি এক ধরনের ‘শ্রেণিচিহ্ন’-তে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, ভোটকেন্দ্রে লুঙ্গি পরা মানুষকে বাধা দেওয়ার ঘটনা, এক ধরনের ‘প্রতীকী বহিষ্কার’—ও বটে, যেখানে প্রতীকী অর্থে একটি নির্দিষ্ট শ্রমজীবী শ্রেণিকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়।
কেউ কেউ নিরাপত্তার যুক্তি সামনে আনতে পারেন। কিন্তু এই যুক্তি কতখানি যুক্তিযুক্ত? যদি লুঙ্গির ভঁাজে কিছু লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়, তবে প্যান্ট বা শাড়ি বা অন্যান্য পোশাকেও তো একই সম্ভাবনা রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তল্লাশি ব্যবস্থা আছে। তাই সরাসরি প্রবেশাধিকার ‘অস্বীকার করা’ কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি বরং একটি সহজ পথ, যেখানে সন্দেহের ভিত্তিতে নাগরিককে বাদ দেওয়া হয়। তাছাড়া, অদ্যাবধি আমাদের ভোটারের মান্য পোশাকবিধি রচিত হয়নি। এ দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনা করে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন, যার দায়িত্ব অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা। তাদের কোনও নির্দেশিকাতেই পোশাকের ভিত্তিতে ভোটারকে বঞ্চিত করার কথা বলা নেই। ফলে এই ঘটনাটি স্পষ্টতই নিয়মের অপব্যাখ্যা বা ক্ষমতার অপব্যবহার।
সাধারণত শ্রমজীবী ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনধারার সঙ্গে যুক্ত লুঙ্গি। ফলে এটি এক ধরনের ‘শ্রেণিচিহ্ন’-তে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, ভোটকেন্দ্রে লুঙ্গি পরা মানুষকে বাধা দেওয়ার ঘটনা, এক ধরনের ‘প্রতীকী বহিষ্কার’—ও বটে।
সমাজতাত্ত্বিক পিয়ের বোর্দো ‘কালচারাল ক্যাপিটাল’ ধারণায় দেখিয়েছিলেন– সমাজে কিছু রুচি, পোশাক, বা আচরণকে ‘উচ্চতর’ বলে গণ্য করা হয়, যা ক্ষমতার কাঠামোকে বজায় রাখে। লুঙ্গির ক্ষেত্রে সেই সাংস্কৃতিক মূলধনের অভাবই তাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ করে তুলেছে। আবার, কানাডীয় সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যান (১৯২২-১৯৮২) ‘প্রেজেনটেশন অফ সেল্ফ’ তত্ত্বে বলেন, সামাজিক মঞ্চে মানুষকে নির্দিষ্ট ‘গ্রহণযোগ্য’ চেহারা বজায় রাখতে হয়, নতুবা তাকে ‘প্রান্তিক’ করা হয়। ভোটকেন্দ্রে এই ঘটনাটি যেন সেই তত্ত্বের বাস্তব প্রতিফলন। অন্যদিকে, মিশেল ফুকোর দৃষ্টিতে এটি এক ধরনের ‘মাইক্রো পাওয়ার’-এর প্রয়োগ, যেখানে ক্ষুদ্র স্তরে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মানুষের শরীর ও আচরণকে বশীভূত করার প্রয়াস চলে। বলা বাহুল্য, এই ধরনের ঘটনা যদি বারবার ঘটে, তাহলে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। এটি প্রান্তিক মানুষের মধ্যে ভয় ও অনাস্থা তৈরি করবে, ভোটদানে নিরুৎসাহ সৃষ্টি করবে এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে সংকুচিত করবে। সবচেয়ে বড় কথা, এটি এমন একটি বার্তা দেবে যে, গণতন্ত্রে অংশগ্রহণের জন্যও একটি নির্দিষ্ট ‘গ্রহণযোগ্য চেহারা’ দরকার, যা গণতন্ত্রের মূল চেতনার পরিপন্থী।
গণতন্ত্রের শক্তি তার বৈচিত্রে। সেই বৈচিত্রের মধ্যে রয়েছে ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, এবং অবশ্যই পোশাক। লুঙ্গি পরে ভোট দিতে যাওয়া এ দেশের গ্রামীণ জীবনাচরণের সঙ্গে সংলিপ্ত বাস্তবতার প্রতিফলন। তা অস্বীকার করার অর্থ গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা। এই প্রেক্ষিতে প্রশাসনের করণীয় স্পষ্ট।
লুঙ্গি পরে ভোট দিতে যাওয়া কয়েকজন মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়ার এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি বড় সত্য উন্মোচিত করল– গণতন্ত্র কেবল ‘আইনের কাঠামো’ নয়, এটি একটি ‘সামাজিক চর্চা’। সেই চর্চা তখনই সফল হয়, যখন তা মানুষের বাস্তব জীবনকে সম্মান করে। আর, সেই সম্মানের সূচনা হয় খুব সাধারণ জায়গা থেকে– মানুষের পোশাক, ধর্মপরিচয় ও সামাজিক মর্যাদাকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে।
তথ্যঋণ
কীর্তিনারায়ণ চৌধুরী ‘ট্রেড অ্যান্ড সিভিলাইজেশন ইন দ্য ইন্ডিয়ান নেশন:
অ্যান ইকনমিক হিস্ট্রি ফ্রম দ্য রাইজ অফ ইসলাম
টু ১৭৫০’
রিচার্ড এম. ইটন ‘দ্য রাইস অফ ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার ১২০৪-১৭৬০’
পিয়ের বোর্দো ‘আউটলাইন অফ আ থিওরি
অফ প্র্যাকটিস’
মিশেল ফুকো ‘ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ’
আরভিং গফম্যান ‘দ্য প্রেজেন্টেশন অফ সেলফ ইন এভ্রিডে লাইফ’
(মতামত নিজস্ব)
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
‘পার্লামেন্টে বসে নজর কাড়তে লিপস্টিক পরি না’, দিল্লি থেকে ফিরেই মাঠের কাজে সাংসদ, কাকে বিঁধলেন?
-
ইয়ামাল নামতেই বিধ্বংসী স্প্যানিশ আর্মাডা, সৌদিকে গোলের বন্যায় ভাসিয়ে বিশ্বকাপে প্রথম জয় স্পেনের
-
মেয়ে পরকীয়ায় জড়িয়েছে মানতে নারাজ মা! জামাইয়ের নালিশের প্রতিবাদ করায় শুরু হাতাহাতি, তারপর…
-
রয়েছে সোনালী খেঁকশিয়াল থেকে ভল্লুক, এবার কনজারভেশন রিজার্ভের তকমা পাচ্ছে কোটশিলা-ঝালদা বনাঞ্চল!
-
কাপের দাপুটে ব্যাটিং, টি-২০ বিশ্বকাপে প্রোটিয়াদের কাছে হেরে সেমির দৌড়ে অঙ্ক জটিল ভারতের