৩১ আষাঢ়  ১৪২৬  মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০১৯ 

Menu Logo বিলেতে বিশ্বযুদ্ধ মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার
বিলেতে বিশ্বযুদ্ধ

৩১ আষাঢ়  ১৪২৬  মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০১৯ 

BREAKING NEWS

শুভজিৎ মণ্ডল: স্বাধীনতাত্তর ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের যদি তালিকা তৈরি করা হয়, তাহলে সবার উপরের সারিতেই নাম থাকবে অটল বিহারী বাজপেয়ীর। ১২ বারের সাংসদ, ১০ বার লোকসভায়, ২ বার রাজ্যসভায়। অর্থাৎ ৫০ বছরেরও বেশি সময় তিনি কাটিয়েছেন সংসদীয় রাজনীতিতে। ১৯৫৭ সালে প্রথমবার যখন সাংসদ নির্বাচিত হন, তখনও তাঁর দল সেভাবে গুরুত্ব পায়নি জাতীয় রাজনীতিতে। অদূর ভবিষ্যতে তা পাবে বলেও মনে করতে পারছিলেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ভারতের মতো উদারনৈতিক দেশে জনসংঘের মতো গোড়া হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ক্ষমতায় আসতে পারে তা কল্পনাতীত ছিল অনেকেরই। তবু সংসদের নিম্নকক্ষে বাজপেয়ীর প্রথম ভাষণের পরই তাঁর পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। পণ্ডিত নেহেরু সেদিনই বলে দিয়েছিলেন, “এ ছেলে একদিন প্রধানমন্ত্রী হবে।”

[বাজপেয়ীর ‘মৃত্যু’তে শোকজ্ঞাপন! সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষমা চাইলেন তথাগত রায়]

প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসতে অবশ্য অটলজির সময় লেগে যায় ৪০ বছর। দীর্ঘ চার দশকের বিরোধী রাজনীতিতে শুধুমাত্র গণতন্ত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন তাই নয়, কনিষ্ঠ সাংসদদের কাছে রীতিমতো উদাহরণ হিসেবে পেশ করেছিলেন নিজেকে। শুধুমাত্র বিরোধিতা নয়, সরকারের ভাল কাজের প্রশংসা করেও যে বিরোধিতা করা যায় শিখিয়েছিলেন ভারতীয় রাজনীতির পিতামহ। তাই হয়তো একাত্তরের পর তৎকালীন বিরোধী নেতা বাজপেয়ী উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর। ইন্দিরাকে দেবী দুর্গার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন কিনা তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকতে পারে কিন্তু শাসকের জন্যও যে যোগ্য সম্মান তাঁর মনে ছিল তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশও থাকতে পারেনা।

যখন প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর কুরসিতে বসলেন, সে আসনও ছিল কণ্টকময়। জানা ছিল, সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করা যাবে না, অকংগ্রেসি সরকারের জন্য দেশ তখনও প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু মাত্র ১৩ দিনের জন্যও প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেছিলেন বাজপেয়ী। না কুরসি বা ক্ষমতার লোভে নয়, দেশকে বোঝাতে চেয়েছিলেন কংগ্রেসেরও বিকল্প রয়েছে, আমজনতার কাছে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন তাঁর এবং তাঁর দলের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য আর দর্শন। আজকের বিজেপি যে মহিরুহে পরিণত হয়েছে তাঁর মূল কারিগর কিন্তু অটলই। একটি গোঁড়া হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের আদলে তৈরি দলকে জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করা, তথা উদারপন্থী ভারতবাসীর মনে জায়গা তৈরি করে বিজেপিকে সর্বজনবিদিত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরার কৃতিত্বের সিংহভাগই কিন্তু তাঁর প্রাপ্য। আজকের বিজেপি নেতাদের যতই ক্ষমতার দম্ভে বাজপেয়ী-বিস্মৃতি ঘটুক, আসলে যে তারা অটলজির পোঁতা মহিরূহের ফল ভোগ করছেন সেকথা হয়তো মনে করিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে।

[৪ রাজ্যে বিধানসভার সঙ্গেই লোকসভা ভোট, ইঙ্গিত নির্বাচন কমিশনের]

অটলের সাহসিকতা নিয়ে কারও কোনও প্রশ্ন থাকতে পারে না। আমেরিকার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পোখরানের পরমাণু পরীক্ষার মতো সিদ্ধান্ত। রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে প্রথম হিন্দিতে বক্তব্য রাখা। কিম্বা রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে চিরশত্রু পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা হিসেবে লাহোর পর্যন্ত বাস পরিষেবা চালু করা, এসবই তাঁর সাহসিকতার প্রতীক। তাঁর সাহসিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি কখনও, তবে অনেকে প্রশ্ন তোলেন নিজের সিদ্ধান্তে নাকি অটল থাকতে পারতেন না বাজপেয়ী।

রাজনীতির পথচলা শুরু কমিউনিস্ট হিসেবে, কিন্তু শীঘ্রই আরএসএস ভাবধারায় উজ্জীবিত হয়ে যোগ দেন আরএসএস-এ। বিশ্বাস করতেন হিন্দু জাতীয়তাবাদে। হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণাতেও বিশ্বাস করতেন বলেই জানান ঘনিষ্ঠ জনেরা। কিন্তু হিন্দুরাষ্ট্র মানেই মুসলিম-নিধন এই তত্ত্বে কোনওদিনই বিশ্বাস করেননি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। আর সেকারণেই হয়তো গোধরা কাণ্ডের পর সেসময়ের গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে প্রকাশ্যে রাজধর্মের পাঠ পড়িয়েছিলেন। গোধরার পর মোদিকে দল থেকে বহিঃষ্কারের সিদ্ধান্তও একপ্রকার পাকা করে ফেলেছিলেন, শেষ পর্যন্ত অবশ্য তা বাস্তবায়িত হয়নি। অনেকে তাঁর সিদ্ধান্তে অটল না থাকতে পারার ব্যর্থতাকে কাঠগড়ায় তুলেছেন তারপর। সেদিন যদি, সত্যি সত্যি মোদিকে দল থেকে তাড়িয়ে দিতেন, বা বাজপেয়ীর দেওয়া রাজধর্মের পাঠ সেদিন সত্যি সত্যি মজ্জাগত হতো বিজেপি নেতাকর্মীদের। তাহলে আজকের ভারতে হয়তো গোরক্ষকদের দাদাগিরি, কিংবা ধর্মের নামে হানাহানির এই চিত্রটা চোখে পড়ত না। আজ যখন গোটা দেশে একের পর এক গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে, উন্নয়নের নামে প্রচারের ভড়ং চলছে দেশজুড়ে, রাজধর্মের পাঠ পড়ানোর মতো একজন শিক্ষক আজকের ভারতে প্রয়োজন আছে বৈকি।

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং