গুমনামি বাবাই কি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু? এই বিষয়ে কোনও নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তবে উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদে (বর্তমান অযোধ্যা) নিঃসঙ্গ জীবন কাটানো ‘গুমনামি বাবা’ বা ‘ভগবানজি’কে অনেকে নেতাজিই মনে করেন। তাহলে সত্যিটা আসলে কী? দীর্ঘ গবেষণায় অসংখ্য তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে, গুমনামি বাবার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের বয়ান ঘেঁটে চমকে দেওয়া উত্তর পেয়েছেন দুই লেখক ও গবেষক সৈকত নিয়োগী ও সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালে প্রকাশিত হচ্ছে সেই ধারাবিবরণী— ‘মহামানবের চরণতলে’।
আলাপ হল রামকিশোরের মেজো ছেলে কৃষ্ণ শর্মার সঙ্গে। তিনি শোনালেন, বিশ্বাসের মায়াজালে ধরা দেওয়ার পর সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের পর্দা ঘেরা দরবারে ছিল বিশ্বস্তদের অবাধ যাতায়াত। সেখানে ধর্ম জাতি রাজনীতির কোনও ভেদাভেদ ছিল না। প্রতিটি মানুষকে স্বতন্ত্রভাবে তার ব্যক্তিসত্তার নিরিখে তিনি বিচার করতেন। কাছের মানুষদের মজার ছলে তিনি একটা করে নাম দিতেন। সেই নামেই চলত বার্তালাপ। হিন্দু মুসলিম সমস্ত ধর্মের মানুষ ছিল তার অনুগামীদের মধ্যে। চারণিকের ছদ্মনামে বিপ্লবী সুনীল দাস অজ্ঞাতবাসী সুভাষচন্দ্র প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে জয়শ্রী পত্রিকার সম্পাদকীয়তে তাকে অভিহিত করেন ‘সমাজতান্ত্রিক সন্ন্যাসী’ পরিচয়ে। সুভাষচন্দ্র যে ভারতীয় সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, দেশ আজও সেই স্বপ্নের থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে। কিন্তু সুভাষচন্দ্রের জীবন বিশেষত তার অজ্ঞাত জীবনের কর্মধারা মানুষের সামনে প্রকাশ হলে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে ভারত সেই সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাবে।

আরও পড়ুন:
“মোরারজি দেশাই আতে থে, রাজনারায়ণজি আতে থে! রাত কে অন্ধেরে মে বহুত সারে বড়ে বড়ে নেতা আতে থে!” কৃষ্ণ মিশ্রর এই কথা শুনে আমরা চমকে উঠলাম। জনতা আন্দোলনের আগের কথা। মোরারজি ভাই তখন হয়তো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। তখন তিনি অযোধ্যার উর্দু বাজারে সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের সাক্ষাৎ প্রার্থী হয়ে এসেছিলেন। জনতা আন্দোলনের সময়ে ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে রাজনারায়ণের বিখ্যাত মামলার কথা কে না জানে? শ্যামল বসুর লেখা ‘ কেন এমন হল?’ গ্রন্থে উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি এবং রাজনারায়ণের মামলা প্রসঙ্গে বিস্তারিত পড়েছি। ভারতের সমাজতন্ত্রের ভাবধারাকে জয়প্রকাশ নারায়ণ তার সামাজিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে রাজনীতির পরিসরে নিয়ে আসেন এবং পরিবারতান্ত্রিক কংগ্রেসের বাইরে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এক বিকল্প রাজনৈতিক চিন্তার জন্ম দেন। জয়প্রকাশ নারায়ণও জানতেন সুভাষ চন্দ্রের কথা।
এ বিষয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের কাছে এটা খুব স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছে। মহানিষ্ক্রমণের আগে সুভাষচন্দ্র দেশের অভ্যন্তরে এক বেনামী গোপন সংস্থা তৈরি করেছিলেন। উপযুক্ত সময় দেশের ভিতর বিদ্রোহ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত সেই সংস্থার নাম মার্কিন ইন্টালিয়ান্স অফিস অফ স্টাডিজ সার্ভিস রেখেছিল এম অর্গানাইজেশন। এই সংগঠনের প্রধান নেতাদের মধ্যে জয়প্রকাশ নারায়ণ, সম্পূর্ণানন্দ, লীলা রায়, ডক্টর রাম মনোহর লোহিয়া প্রমুখের নাম রয়েছে। ১৯৪১ সালে সুভাষ চন্দ্রের অন্তর্ধানের পরে অনিল রায় এবং লীলা রায়, এই বিপ্লবী দম্পতি এসেছিলেন উত্তর প্রদেশে।

অনিল রায়ের বিপ্লবী গুপ্ত সংগঠন শ্রীসংঘের জন্য জাতীয় স্তরে যোগসূত্র স্থাপনই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। সেই সূত্র ধরে বেনারস বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলে তারা প্রচুর বক্তৃতা সভা এবং ছাত্রসমাবেশ ঘটিয়েছিলেন। এই সময়ে বেনারস বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সম্পূর্ণানন্দ। দেশত্যাগের পূর্বে সুভাষচন্দ্র ছাত্রদের মধ্যে এই জাগরণ ঘটানোর নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন অনিল রায়কে। ব্রিটিশ intelligence-এর নথিতে এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত সংবাদ রয়েছে। ভাইসরয় এতটাই আতঙ্কিত হন যে তাঁদেরকে দ্রুত বাংলার ভিতরে নজর বন্দি করার জন্য নির্দেশ পাঠান ছোট লাটকে। সেই মতো বেঙ্গল ক্রিমিনাল ল আমেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট জারি করে এই দম্পতিকে দ্রুত বাংলায় প্রত্যাবর্তন এবং বাংলার বাইরে তাদের পরিভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। সুতরাং সহজেই অনুমেয় জয়শ্রী পত্রিকার এই গ্রুপের সঙ্গে উত্তরপ্রদেশের যোগসূত্র ঐতিহাসিক ভাবে কথাটা প্রতিষ্ঠিত।
ছয়ের দশক থেকে ভগবানের সেখানে অবস্থান এবং জয়শ্রী পত্রিকার গ্রুপের পক্ষে তার সন্ধান পাওয়া কি খুব কষ্ট কল্পনা? বিশেষত চারের দশকের অশান্ত সময়ে অনিল রায় তার স্ত্রী সংঘের অন্যতম শাখা যখন গড়ে তুলেছিলেন বেনারসের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে। ক্রমে সেই সংগঠনের বিস্তার উত্তরপ্রদেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। দেশনেত্রী লীলা রায়ের এই প্রয়াসের সঙ্গে যুক্ত ছিল কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি। সেই পার্টিরই নেতৃত্বে ছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ, সম্পূর্ণানন্দের মতো ব্যক্তিত্ব। তাই যারা ভগবানজির সঙ্গে জাতীয় স্তরের এই সমস্ত নেতাদের যোগসূত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলবে তারা যেন ইতিহাসের পাতা উলটে ঐতিহাসিক সত্যটা অবলোকন করেন।
এমন একটা ঘিঞ্জি এলাকায় যে সুভাষচন্দ্র থাকতে পারে গুপ্তচরদের কল্পনাতেও আসবে না।
এরপর অরুণ মিশ্রাজি আমাদের নিয়ে চললেন উর্দু বাজারের সেই ঐতিহাসিক ঘরটার দিকে। ভাঙাচোরা রাস্তা, কোথাও মাটি খুবলে উঠেছে। সেই মহল্লাটা অত্যন্ত পুরনো। জনবসতি বেশি। ভাঙাচোরা এমন অনেক বাড়ি যার দরজা-জানলা হাট করে খোলা। যেন হঠাৎই কেউ এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। এরকম বেশ কিছু বাড়ি, গাছপালা পিছনে ফেলে আমরা দ্রুত এগিয়ে চললাম ভগবানজির সেই ঘরটার দিকে। কিন্তু ঘর কোথায়? এটা কি ঘর? চাকলা উঠা দেওয়াল, আশেপাশে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা খেলে বেড়াচ্ছে, বালি মাটি ইতস্তত পড়ে রয়েছে, রাস্তার মধ্যেখানে অনেক গর্ত খোঁড়া। অরুণ মিশ্র বললেন, তখন নাকি এই এলাকাটা এরকমই ছিল। হয়তো আরও বেশি ঘিঞ্জি ছিল। সরকারের নানা রকম জনমুখী পরিকল্পনা থেকে ব্রাত্য, উন্নয়নের চেতনা থেকে বিমুখ এই অঞ্চল। কেন?
সব প্রশ্নের কি উত্তর হয়? সব প্রশ্ন উত্তর পাওয়ার আশা করাও উচিত নয়। একটা বড় গোয়াল ঘরের মতো ঘর, ঠিক হল-ঘর বলা চলে না। চূড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর, অমসৃণ মেঝে। হাঁটুর উচ্চতায় ছোট ছোট দেয়াল তুলে বড় ঘরকে ছোট ছোট খুপরিতে ভাঙা হয়েছে। এক একটা খুপড়ি একেকটা পরিবারের বসত। পিছন দিকটায় ছাদ না থাকা একটা উঠোন। উঠোন সংলগ্ন শেষ খুপড়িটায় থাকতেন সুভাষবাবু। এখানেও যথারীতি একটা পুরো কাপড়ের পর্দা দিয়ে ঘেরা থাকত। ওইটুকু জায়গায় নিজের যাবতীয় জিনিসপত্র বই পত্র নিয়ে থাকতেন। আলো নেই তেমন। অধিকাংশই উঠোন থেকে আসা সূর্যের আলো ভরসা। পাখা চালাতেন না, শব্দ হলে যদি উৎসুক কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে আসে। একদিক দিয়ে সুরক্ষার ব্যবস্থায়ী হিসেবে জায়গাটা দারুন।

এমন একটা ঘিঞ্জি এলাকায় যে সুভাষচন্দ্র থাকতে পারে গুপ্তচরদের কল্পনাতেও আসবে না। তার উপর উর্দু মহল্লায় এই অঞ্চলটিতে উত্তরপ্রদেশের দূরদূরান্তের বিভিন্ন গ্রাম থেকে বহু মানুষ এসে আশ্রয় নিত আবার চলে যেত। নিজে সম্পর্কে ছাড়া অন্যদের বিষয়ে এই পরিযায়ী ধরনের মানুষদের উৎসাহ চিরকালই কম। আমরা হল ঘরে প্রবেশ করতেই একগাদা কচিকাঁচা ছেলে মেয়ে আমাদের ঘিরে ধরল। ভেতরে এক একটা খুপড়ি থেকে ঘর-ঘর শব্দে পাখা চলার আওয়াজ আসছে। ছোট ছোট টেবিল ফ্যান। ভগবানজির খুপড়িটা দেখতেই চোখে জল চলে এলো। ভারতের স্বাধীনতার কাণ্ডারী স্বতন্ত্র ভারতে তবে এখানে আশ্রয় পেলেন? আমরা কত ছোট ছোট বিষয়ে রাগ অভিমান করি। কিন্তু ওই জায়গাটা দেখলে, মনে হয় কিসের রাগ, কিসের অভিমান? যে দেশে সুভাষচন্দ্রের মতো রাষ্ট্র নির্মাতা এমন জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয় সে দেশে আমরা তো নিতান্ত তুচ্ছ।
বাড়িটার পিছনদিকে একটা দরজা আছে, ছোট গুপ্ত দরজা বলা চলে। ভগবানের সঙ্গে যারা দেখা করতে আসতেন তারা এই পথটাই ব্যবহার করতেন।
উঠোনে একটা টিউবোয়েল বসানো রয়েছে। হল ঘরে অন্তত ১৫ টা খুপড়ি। এতগুলো মানুষের জন্য মাত্র একটা টিউবোবেল আর একটা বাথরুম। অরুণবাবু জানালেন জায়গাটা একদম আগের মতই আছে। কোনরকম পরিবর্তন করা হয়নি। মানুষগুলিকে দেখলে বোঝা যায় পরিবর্তন কী তারা হয়তো স্বপ্নেও দেখতে চাইনি কখনও। সত্যিই যোগ্য জায়গা বেছে নিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র। উপরে ছাদের অংশটা খোলা, তাই তাঁর আশঙ্কা হত উপর দিক দিয়ে যদি কোনও ইন্ট্রুডার অতি উৎসাহে প্রবেশ করে। ফোনটা রামকিশোর যথাসম্ভব পাহারা দেয়ার ব্যবস্থা রেখেছিলেন। নরক যন্ত্রণা বাইরে কোথাও নয়, ইহলোকে এই পৃথিবীতে এই রকম স্থানে লাভ করা যায়। বাড়িটার পিছনদিকে একটা দরজা আছে, ছোট গুপ্ত দরজা বলা চলে। ভগবানের সঙ্গে যারা দেখা করতে আসতেন তারা এই পথটাই ব্যবহার করতেন। দরজার দিকটা এমন অবস্থা সেদিক দিয়ে খুলে বেরানোর মত ধৃষ্টতা করলাম না। বাড়িটা থেকে বেরিয়ে দেখি পেছন দিকটায় গরু চড়ে বেড়াচ্ছে। অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে আমরা প্রত্যাবর্তনের জন্য পা বাড়ালাম।

“ আমরা কি করব বলুন, তিনি নিজেই এই জায়গাটা বেছেছিলেন। তিনি কি মনে করেছিলেন তিনিই জানেন। আমরা তো শুধুমাত্র তার আদেশ পালন করেছি।” পরে কলকাতায় ফিরে ছুটেছিলাম দমদম পার্কে ডাক্তার পবিত্র মোহন রায়ের বাড়ি। আজাদ হিন্দ সার্ভিসে নেতাজির গুপ্তচর ডাক্তার রায় যেতেন উর্দু বাজারে। ডাক্তার রায়ের পুত্র রণেনবাবুকে জায়গাটার ছবি, ভিডিও সব দেখাতেই তার চোখ ছল ছল করে উঠল। “ বুঝতে পারছি। বাবা এমনই বর্ণনা দিয়েছিলেন।”
সর্বশেষ খবর
-
জনবিন্যাসের ভারসাম্যই আসল! SIR বিতর্কের মধ্যেও দেশজুড়ে NRC চাইছে আরএসএস
-
দিনকয়েক আগেই কলকাতায় আসা! রাতের অন্ধকারে হঠাৎ ফের বাংলাদেশে ফেরার চেষ্টা, সীমান্তে পা রাখতেই…
-
কলকাতায় পৌঁছেই মাঠে নেমে পড়ল ফোরলানের উরুগুয়ে, আজ আসছে ব্রাজিল
-
লাইনে শাবল ফেলে দুর্ঘটনার ছক! রুখে দিয়ে পুরস্কৃত দুই রেলকর্মী
-
তোলাবাজি অতীত, পাণ্ডবেশ্বরে ১ হাজার কোটির বিনিয়োগ! ‘প্রচুর কর্মসংস্থান হবে’, জানালেন বিধায়ক